ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

ক্ষুধার্তদের মুখে হাসি ফোটায় ‘ব্যাক বেঞ্চার মেজবান’

তবিবর রহমান, যশোর
প্রকাশিত: ১৫:২৮, ২ মার্চ ২০২৪
ক্ষুধার্তদের মুখে হাসি ফোটায় ‘ব্যাক বেঞ্চার মেজবান’
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

যশোর শহরের বাণিজ্যিক এলাকা রবীন্দ্রনাথ সড়কের (আরএন রোড) নান্নু চৌধুরি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট মার্কেট। এই মার্কেটের নিচ তলায় গোটা বিশেক দোকান। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সব দোকানই বন্ধ থাকে। এমন সময়ে নীল টি-শার্ট আর গলায় আইডি কার্ড পরিহিত দুই যুবক এসে মার্কেটের সামনে গেটে ব্যানার টানালেন। তাতে লেখা, ‘ব্যাক বেঞ্চার মেজবান’। 

মার্কেটের ভেতরে কয়েকজন মেঝে ঝাড়ু দিলেন। এরপর বসার জন্য মেঝেতে বিছানো হলো চট (পাটি)। এর মধ্যে দু-একজন করে ছিন্নমূল, রিকশা, ইজিবাইক চালক, শ্রমজীবীসহ দরিদ্র মানুষ আসতে থাকে সেখানে। একটু দূর থেকে কয়েক হাঁড়ি রান্না করা খাবার নিয়ে এলেন আরো কয়েক যুবক। সঙ্গে আনলেন প্লেট, গ্লাস আর পানির জগ। এর মধ্যে বিভিন্ন বয়সী চার শতাধিক মানুষে ভরে যায় ঐ এলাকা।

শুরু হয় খাবার পরিবেশন। তৃপ্তি ভরে খিচুড়ি-মাংস খেয়ে মানুষেরা চলে যায়। এ জন্য কাউকে কোনো টাকা দিতে হলো না। দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার দুপুরে এ খাবারের ব্যবস্থা করেন যশোরের এসএসসি ১৯৯৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংগঠন  ‘ব্যাক বেঞ্চার’। ‘খাবার আছে যতক্ষণ, পরিবেশন করা হবে ততক্ষণ’-এমন স্লোগান নিয়ে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট থেকে সংগঠনটি নিয়মিত প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার দুপুরে মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করেন।

প্রথম দিকে ৬০ থেকে ৭০ জন মানুষ এই মেজবানে অংশ নিলেও এখন সেটি চার শতাধিক মানুষ দাঁড়িয়েছেন। যা প্রতি মাসে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সংগঠনটি এসব মানুষের খাবার দেওয়ার পাশাপাশি শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, রক্তদান, সামাজিকভাবে সচেতনামূলক কর্মকাণ্ড করে আসছেন। করোনাকালেও সংগঠনটি অক্সিজেন সেবা, খাদ্য সামগ্রী বিতরণের মধ্যে দিয়ে মানুষের পাশে ছিলেন।

শুক্রবার দুপুরে রবীন্দ্রনাথ সড়কের (আরএন) যে মার্কেটে খাবার দেওয়া হচ্ছে; সেই মার্কেটের সামনে অর্ধশতাধিক ইজিবাইক রিকশা সড়কে পাশে দাঁড়ানো। এসব যানের চালকরা সবাই হাত মুখ ধুয়ে পাটিতে বসে খেতে বসেছেন। এদের সঙ্গে হতদরিদ্র পথচারীরাও রয়েছেন। সংগঠনের সদস্যরা কেউ প্লেটে তাদের মুরগির মাংস ও খিচুড়ি পরিবেশন করছে। কেউ বা গ্লাসে পানি দিচ্ছেন। সবাই ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে কিনা কয়েকজনকে আবার তদারকিও করতে দেখা গেছে।

সেখানে খেতে আসা শংকরপুর বস্তিতে থাকা প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক রুহুল আমিন বলেন, ‘শহরে ভিক্ষা করি। গত বছর একজনের মাধ্যমে জানতে পারি এখানে প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার ভালো মন্দ খেতে দেয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভিক্ষা করে দুপুরে এখানে এসে ভালোমন্দ খাই।’ 

গহরজান বিবি নামে আরেক ভিক্ষুক বলেন, ‘বাড়িতে মন ভরে খেতে পারিনে। আজ মন ভরে খেয়ে গেলাম। দোয়া করি আমরা এটা প্রতি মাসে না; প্রতি সপ্তাহে যেন এমনভাবে খেতে পারি।’ 

ক্ষুধার্তদের খাবার পরিবেশন করছেন এক যুবকরিকশাচালক হাবিবুর রহমান জানান, ‘দরিদ্র মানুষ, তাই ভালো খাবার সব সময় খেতে পারেন না। সব সময় পাওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। এই সংগঠন মাসে একবার এমন আয়োজন করে ভালো লাগে।’

সুলতান নামে এক ব্যক্তি জানান, শহরে এসেছিলেন একটা কাজে। এখানে আসার পর দেখলেন, বিনামূল্যে খাওয়ানো হচ্ছে। তাই তিনি খেয়ে নিলেন। 

মেজবানে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, দরিদ্র মানুষ তৃপ্তির সঙ্গে খায়। এটি দেখতে তার খুব ভালো লাগে। তাই তিনি সময় পেলে চলে আসেন এখানে।

সংগঠন  ‘ব্যাক বেঞ্চার’সদস্য সংখ্যা ১৯ জন। সদস্যরা কেউ চাকরিজীবী কেউ বা ব্যবসায়ী। এই সদস্যদের চাদার টাকা দিয়ে প্রথমে নিজেদের উদ্যোগে অসহায়দেও মাঝে একবেলার খাবারের আয়োজন শুরু করা হয়। পরে অনেক ভালো মনের মানুষ এতে শরিক হচ্ছেন। এ ছাড়া অনেক দানশীল ব্যক্তির সহযোগিতায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সংগঠনটির সভাপতি জাকিউল ইসলাম পিন্টু বলেন, ‘আমরা ভালো আছি, আমরা এই নীতিতে বিশ্বাসী না। আমরা চাই যারা এই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ, হতদরিদ্র তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই ভালো থাকতে চাই। সেই নীতি থেকেই আমরা গত বছর থেকে এই খাবারের আয়োজন করে আসছি। প্রথমে ৬০-৭০ জন খাবার খেতে আসলেও এখন সেটি চার শতাধিক মানুষে পৌঁছেছে। নিজেরা চাঁদা ছাড়াও বিভিন্ন দানশীল মানুষ এখানে সহযোগিতা করছেন। 

সংগঠনটির উপদেষ্টা লেনিন আনোয়ার বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসেই বিভিন্ন আইটেমে খাবার দিয়ে থাকি। খাবার হিসেবে ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি ও মুরগির মাংস দেওয়া হয়। কখনো খিচুড়ি মাংসও দেওয়া হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য মাসে একবার নয়; প্রতি শুক্রবার আমাদের খাবার পরিবেশনের। ছোটভাবে আমরা শুরু করেছি; যদি সমাজের বিত্তবানরা আমাদের এই কাজে এগিয়ে আসেন তাহলে সেই লক্ষে আমরা পৌঁছে যাবো। পাশাপাশি সমাজের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সবাই নিজ নিজ এলাকা থেকে এভাবে এগিয়ে আসলে সমাজের এই হত দরিদ্ররা ভালো থাকবে।’

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!