ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

বিদেশ যাত্রার ‘অশুভ’ প্রতিযোগিতা, হারিয়ে যায় সব

বেলাল রিজভী, মাদারীপুর
প্রকাশিত: ১৮:৪৪, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বিদেশ যাত্রার ‘অশুভ’ প্রতিযোগিতা, হারিয়ে যায় সব
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

* যেভাবে টাকা নেয় দালাল চক্র
* সম্প্রতি আটজন নিহত
* আলোচনায় যেসব দালাল
* যেভাবে করা হয় নির্যাতন
* যা বলছে প্রশাসন

পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে ‘অশুভ’ প্রতিযোগিতায় নাম লেখাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানের হাজারো তরুণ-যুবক। কিন্তু এ প্রতিযোগিতায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের ঝরে পড়তে হচ্ছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা নিয়ম-কানুন কঠিন মনে করে তারা দালাল চক্রকে বেছে নিচ্ছেন। তাদের খপ্পরে পড়ে অনেকে নিজের জীবন পর্যন্ত হারাচ্ছেন। এর মাধ্যমে ঐসব যুবকের পরিবারও ভেঙে পড়ছে। তারপরও এই ‘অশুভ’ প্রতিযোগিতা থামছে না। বিশেষ করে মাদারীপুর জেলায় এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় নৌকা ডুবে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার পাঁচ যুবক মারা গেছেন।

সরেজমিন বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার পাঁচখোলা গ্রাম থেকে গত ছয় মাসে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন ৭০ জন যুবক। ঐ গ্রামের হায়দার মোড়ল আগে মাছ ধরে ও কৃষি শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কয়েক বছর আগেও অভাবের সংসার ছিল তার। ধারদেনা করে ছেলেকে লিবিয়া দিয়ে পাঠান ইতালিতে। একই গ্রামের জালাল খানের ছেলে সুমন। কয়েক বছর আগে তিনিও ভ্যান চালাতেন। সম্প্রতি ইউরোপের দেশ ইতালি গিয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন সুমন। তাদের দেখে অনেকেই এ প্রতিযোগিতায় নামছেন। বেছে নিচ্ছেন ভয়ংকর পথ। অবৈধ পথে পাড়ি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ সফল হচ্ছেন। কেউ বিদেশে পৌঁছালেও তেমন কাজ পাচ্ছেন না। আবার অনেকে হারাচ্ছেন প্রাণ। কেউ মানবপাচার চক্রের হাতে পড়ে খোয়াচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

Advertisement

পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে ‘অশুভ’ প্রতিযোগিতায় নাম লেখাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানের হাজারো তরুণ-যুবক। সরকারি নিয়ম-কানুন কঠিন মনে করে তারা দালাল চক্রকে বেছে নিচ্ছেন। তাদের খপ্পরে পড়ে অনেকে নিজের জীবন পর্যন্ত হারাচ্ছেন। তারপরও এই ‘অশুভ’ প্রতিযোগিতা থামছে না।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাষাবাদ করে জীবন যুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়তে হয় এ অঞ্চলের মানুষকে। উচ্চশিক্ষা ও পর্যাপ্ত শিল্পখাত না থাকায় ভাগ্যের চাকা ঘোরে না দক্ষিণাঞ্চলের এই জনপদের মানুষের। অধিকাংশ প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়েই কর্মজীবন শুরু করে দেন। সন্তানের বয়স মাত্র ১৮ বছর হলেও বিদেশ যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দেন অভিভাবকরাও। জমিজমা বিক্রি করে সন্তানকে বিদেশ পাঠাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তারা। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগায় মানবপাচার চক্র। গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ইউরোপের দেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে হাতিয়ে নেয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এ অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এই চক্রের সদস্যরা। স্থানীয়দের কাছে তারা দালাল নামে পরিচিত। 

ঘটনা-১:
রাজৈর উপজেলার মামুন শেখ। বেকার সময় পার করছিলেন। তার গ্রামের অনেকেই প্রবাসী। আর্থিকভাবে তারা বেশ সচ্ছলও। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে মামুনও ইউরোপে পাড়ি জমাতে চান। যোগাযোগ করেন মোশারফ কাজী নামে এক দালালের সঙ্গে। তিনি পার্শ্ববর্তী গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাঘদী ইউনিয়নের সুন্দরদী গ্রামের বাদশা কাজীর ছেলে। অবৈধ পথে বিভিন্নজনকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেয়ার আশ্বাস দেন মোশারফ। প্রলোভন দেখিয়ে সবার কাছ থেকে নেন ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এরপর অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালি পাঠানোর সময় ঘটে দুর্ঘটনা। 

এরকম এক ঘটনায় সম্প্রতি প্রাণ হারান মামুন শেখ। এ যাত্রায় প্রাণ হারান মোট ৮ বাংলাদেশি। যাদের পাঁচজনের বাড়িই মাদারীপুরে। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই আবার বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন লিবিয়ার বিভিন্ন বন্দি শিবিরে। সেই বন্দি শিবিরের জীবন আরো ভয়াবহ। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার জীবন মন্ডল। ২০২২ সালে তিনি লিবিয়া যান। দেড় বছর সেখানে ছিলেন তিনি। এই দেড় বছরে লিবিয়া থেকে নৌপথে চারবার ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ধরা পড়ে যান প্রতিবারই। ধরা পড়ার পরের দিনগুলো ছিল বিভীষিকাময়।

অবৈধ পথে বিভিন্নজনকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেয়ার আশ্বাস দেন। প্রলোভন দেখিয়ে সবার কাছ থেকে নেন ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এরপর অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালি পাঠানোর সময় ঘটে দুর্ঘটনা। 

জীবনের বাবা নিরঞ্জন মণ্ডল বলেন, ধরা খাওয়ার পর জীবনকে স্থানীয় দালাল চক্র এক ঘরে বন্দি করে রাখে। সেখানে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। পানিও দেওয়া হতো না। উল্টো মারধর করা হতো। দীর্ঘদিন গোসল না করায় জীবনের শরীরে ঘা হয়ে গেছে। নৌপথ পাড়ি দেওয়ার সময় বাংলাদেশের দালালরাই লিবিয়ার ঐ চক্রকে জানিয়ে দিয়ে ধরিয়ে দিতো। পরে আমাদের কাছ থেকে আরো টাকা নিয়ে ওরাই আবার ছাড়িয়ে দিতো। জীবনকে দেড় বছরে তিনবার ধরিয়ে দিয়েছে তারা। শেষে তারা মাফিয়ার কাছে ধরিয়ে দেয় জীবনকে। দালালদের মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকা দিয়ে তাকে ছাড়ানো হয়েছে। 

তিনি বলেন, লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যেতে তিন ধাপে দালাল চক্রকে টাকা দিয়েছি। শুরুতে নগদ ৫ লাখ টাকা দিয়েছি। লিবিয়া পৌঁছানোর পর নৌপথে ইউরোপ যেতে ব্যাংকের মাধ্যমে সাড়ে ১১ লাখ দেওয়া হয়। তারপরও ইউরোপে যেতে পারেনি সে। মাফিয়ার হাতে ধরা খাওয়ার পর আবার ১৩ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে এনে পরে জীবনকে ইতালি পাঠানো হয়।

জীবনের বাবা নিরঞ্জন মণ্ডল বলেন, ছেলেকে এক দালাল আরেক দালালের কাছে বেচে দেয়। নৌপথে যাওয়ার সময় তিনবার আটকে দেয়। ছেলে অনেকদিন জেল খেটেছে। মাফিয়া ধরার পর জীবনের ৩-৪ মাস খবরও ছিল না। পরে অনেক টাকা খরচ করে ছেলেকে দেশে আনি। কিন্তু টাকা আর ফেরত পাইনি। কয়েক মাস আগে সেই দালাল মারা গেছে।

এক দালাল আরেক দালালের কাছে বেচে দেয়। নৌপথে যাওয়ার সময় তিনবার আটকে দেয়। অনেকদিন জেল খেটেছে। মাফিয়া ধরার পর ৩-৪ মাস খবরও ছিল না।

যেভাবে টাকা নেয় দালাল চক্র:
লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মাদারীপুরের সক্রিয় দালাল চক্র। এসব দালাল চক্র মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করে। গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে তারা। ইতালি, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে তারা জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে মানুষ তাদের জমিজমা বিক্রি করে দিচ্ছে। ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা নিয়ে দালালরা বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে লিবিয়া পাঠায়। এরপর সেখান থেকে নৌপথে ইউরোপের দেশ ইতালি পাঠানোর কথা বলে। এর মধ্যেই বিদেশগামীদের বিপত্তিতে পড়তে হয়। নৌপথে পাড়ি দিতে গিয়ে স্থানীয় মাফিয়া চক্রের খপ্পরে পড়ে তারা। 

ভুক্তভোগী অনেক পরিবার জানায়, কৌশলে আরো টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য মাফিয়া চক্রের কাছে ধরিয়ে দেয় দেশি দালাল চক্র। মাফিয়ারা তাদের লিবিয়ার বিভিন্ন টর্চার সেলে নিয়ে বন্দি করে রাখে। সেখানে তাদের শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এছাড়া পানি ও খাবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঐ টর্চার সেল থেকে ছাড়ানোর জন্য পরিবারের সঙ্গে ফের যোগাযোগ করে দালাল চক্র। এরপর ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের ছাড়িয়ে আনা হয়। এভাবে ফের নৌপথ দিয়ে পাড়ি দিতে গিয়ে একাধিবার মাফিয়া চক্রের খপ্পরে পড়তে হয় ভুক্তভোগীদের। বিনিময়ে লাখ লাখ টাকা খোয়াতে হয়। অনেক পরিবার আছে, যারা প্রশাসন ও সাংবাদিকদের কাছে এ নিয়ে মুখ খুলতে চায় না। কারণ, তথ্য ফাঁস করে দিলে মাফিয়ারা তাদের সন্তানদের মেরে ফেলবে।

ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা নিয়ে দালালরা বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে লিবিয়া পাঠায়। এরপর সেখান থেকে নৌপথে ইউরোপের দেশ ইতালি পাঠানোর কথা বলে। এর মধ্যেই বিদেশগামীদের বিপত্তিতে পড়তে হয়। নৌপথে পাড়ি দিতে গিয়ে স্থানীয় মাফিয়া চক্রের খপ্পরে পড়ে তারা। 

সম্প্রতি নিহত ৮ জনের ৫ জনই মাদারীপুরের বাসিন্দা:
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানায়, গত ২ মাস আগে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম স্বরমঙ্গল গ্রামের ইউসুফ আলী শেখের ছেলে মামুন শেখ, সেনদিয়া গ্রামের সুনীল বৈরাগীর ছেলে সজল বৈরাগী, কবিরাজপুর ইউনিয়নের কিশোরদিয়া গ্রামের তোঁতা খলিফার ছেলে কায়সার খলিফা ও বাজিতপুর ইউনিয়নের কোদালিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান কাজীর ছেলে সজীব কাজীসহ বেশ কয়েকজন যুবক ইতালির উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়। গত ১৪ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে ৩২ জন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ৫২ জনকে তোলা হয়। তাদের নিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার ভূমধ্যসাগরে নৌকার তলা ফেটে যায়। এতে মামুন, সজল, কায়সার, সজীবসহ ৮ জন মারা যায়। 

নিহত সজীব কাজীর বাবা মিজানুর রহমান কাজী বলেন, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাঘদী ইউনিয়নের গজনিয়া গ্রামের রহিম দালালের সঙ্গে ১৪ লাখ টাকা চুক্তি হয়। রহিমের ভাই কামাল আমার কাছ থেকে নগদ ১২ লাখ নিয়ে আমার ছেলেকে লিবিয়া পাঠায়। পরে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালি পাঠানোর সময় ঘটে দুর্ঘটনা। আমার সজীব চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুইদিন পর মারা যায়।

নিহত কায়সার খলিফার স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, রাজৈরের পাইকপাড়া ইউনিয়নের দামেড়চর গ্রামের অবুঝ মাতুব্বর প্রথমে সাড়ে ৮ লাখ টাকা চুক্তিতে আমার স্বামীকে লিবিয়া নেয়। পরে বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তুলে দেওয়ার কথা বলে আরো সাড়ে ৪ লাখ টাকা নেয়। কিন্তু ছোট একটি নৌকায় পাঠালে দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে আমার স্বামী মারা যান। সব কিছু বিক্রি করে এবং সুদে টাকা এনে স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর স্বপ্ন দেখেছিলাম, এখন আমার সবই শেষ হয়ে গেল। আমার দুই মেয়ে নিয়ে কীভাবে বাঁচব জানি না।

গত ১৪ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে ৩২ জন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ৫২ জনকে তোলা হয়। তাদের নিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার ভূমধ্যসাগরে নৌকার তলা ফেটে যায়। এতে মামুন, সজল, কায়সার, সজীবসহ ৮ জন মারা যায়। 

নিখোঁজ নয়ন বিশ্বাসের ভাই আকাশ বিশ্বাস বলেন, আমার ভাই ঢাকার এক দালালের মাধ্যমে লিবিয়া গিয়েছিল। পরে এ দুর্ঘটনার খবর শুনি।

নিহত মামুন শেখের বড় ভাই সজীব শেখ বলেন, মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাঘদী ইউনিয়নের সুন্দরদী গ্রামের বাদশা কাজীর ছেলে মোশারফ কাজী প্রলোভন দেখিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে নেয়। পরে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালি পাঠানোর সময় দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত সজল বৈরাগীর বাবা সুনীল বৈরাগী বলেন, আমি গরিব মানুষ। টাকার লোভে ছেলেকে ইতালি পাঠাতে চেয়েছিলাম। জমিজমা বিক্রি করে দালালকে টাকা দিই। এখন আমার সবই শেষ হয়ে গেল।

এসব ঘটনার মূলহোতা দালাল মোশারফ কাজী দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়া বসবাস করছেন। তার ছেলে যুবরাজও গ্রাম থেকে ইতালি পাঠানোর জন্য যুবকদের সংগ্রহ করতেন বলেও জানা গেছে।

এসব ঘটনার মূলহোতা দালাল মোশারফ কাজী দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়া বসবাস করছেন। তার ছেলে যুবরাজও গ্রাম থেকে ইতালি পাঠানোর জন্য যুবকদের সংগ্রহ করতেন বলেও জানা গেছে।

আলোচনায় যেসব দালাল:
জানা গেছে, দালালদের অধিকাংশই ঢাকা শহরে বসবাস করে। এক একটি মোবাইল সংযোগ ২০-২৫ দিনের বেশি তারা ব্যবহার করে না। মাদারীপুরে এই দালালদের একাধিক চক্র সক্রিয়। এর মধ্যে রয়েছে মাদারীপুর সদর উপজেলার বড়াইলবাড়ী গ্রামের জামাল খাঁ, মাদারীপুর শহরের ডিসি ব্রিজ এলাকার রাশেদ খান ও টুলু খান। তাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের তুলাতলা। শ্রীনাথদি বাজিতপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর হাওলাদার, ধুরাইল ইউনিয়নের চাছার গ্রামের ইউসুফ খান জাহিদ, গাছবাড়িয়া গ্রামের নাসির শিকদার, রাজৈর উপজেলার বদরপাশা গ্রামের জুলহাস তালুকদার, হোসেনপুরের জাকির হোসেন, টেকেরহাটের লিয়াকত মেম্বার, কদমবাড়ীর রবিউল ওরফে রবি, শাখারপাড় গ্রামের কামরুল মোল্লা, এমরান মোল্লা, আমগ্রাম ইউনিয়নের কৃষ্ণার মোড় এলাকার শামীম ফকির, সম্রাট ফকির, শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের শহিদুল মাতুব্বর ও সিরাজ মাতুব্বর দালাল হিসেবে সক্রিয়।

এসব দালালের গডফাডার হচ্ছে লিবিয়ায় অবস্থানরত মাফিয়া শরীফ ও আশরাফ। শরীফের শ্বশুর বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলা শিরখাড়া ও আশরাফের শ্বশুর বাড়ি খোয়াজপুর এলাকায়। এই সূত্রে তাদের শক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে মাদারীপুরে। এ চক্রের সঙ্গে রয়েছে বেশকিছু নারী দালালও। তারা কমিশনে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিদেশগামী যুবকদের সংগ্রহ করে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লিবিয়ায় আটকে রেখে যে নির্যাতন করা হয়, এর দেশীয় মূলহোতা কুমিল্লার বাসিন্দা মাফিয়া নামে পরিচিত শরীফ। মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের নতুন মাঠ গ্রামের সাকা মাতুব্বরের মেয়ে সুমিকে বিয়ে করেন শরীফ। সুমিসহ একাধিক দালাল মাদারীপুর সদর, শিবচর, কালকিনি, ডাসার, রাজৈর ও পাশের জেলা গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে লোক সংগ্রহ করে লিবিয়ায় পাঠায়। লিবিয়ায় যারা নির্যাতন করে, তাদেরই একজন আজিজুল ইসলাম নির্ঝর। তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের চরনাচনা গ্রামের আবুল কালাম হাওলাদারের ছেলে। তিনি লিবিয়ায় পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জোয়ারা ক্যাম্পের মাফিয়া শরীফ হোসেনের সহযোগী। তার দায়িত্ব বন্দিদের নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা।

দালালের গডফাডার হচ্ছে লিবিয়ায় অবস্থানরত মাফিয়া শরীফ ও আশরাফ। শরীফের শ্বশুর বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলা শিড়খাড়া ও আশরাফের শ্বশুর বাড়ি খোয়াজপুর এলাকায়। এই সূত্রে তাদের শক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে মাদারীপুরে। এ চক্রের সঙ্গে রয়েছে বেশকিছু নারী দালালও। তারা কমিশনে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিদেশগামী যুবকদের সংগ্রহ করে।

যেভাবে নির্যাতন করা হয়:
ভুক্তভোগীদের প্রথমে লোহার আঁড়ার সঙ্গে ঝুলানো হয়। এরপর প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। নির্যাতন করার জন্য নির্ঝরকে প্রতি ঘণ্টায় ৩০ হাজার টাকা দিতেন শরীফ। মুক্তিপণের টাকার জন্য নির্ঝর ছাড় দেননি তার এলাকাসহ আশপাশের সাত-আটজন যুবককেও। তারা হলেন- ছিলারচর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর মোড়ল কান্দির নুরুল হক মোড়লের ছেলে নাসিম মোড়ল, রেজাউল মোড়লের ছেলে রানা ইসলাম, মুজ্জাফার মোড়লের ছেলে শাহ আলম মোড়ল, রহিম মোড়লের ছেলে শফিকুল, আমিন উদ্দীন হাওলাদারের ছেলে সরোয়ার হাওলাদারসহ বেশ কয়েকজন।

সদর উপজেলার হোসনাবাদ গ্রামের ভুক্তভোগী রাকিব ফরাজী বলেন, শরীফের ক্যাম্পে নির্ঝর আমাকে মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলেছিল। জ্ঞান ফেরার পর আবারও মেরেছে। মারার ফলে আমার চোখে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছিল। ক্যাম্পে থাকার দুই মাসের মধ্যে নির্ঝরের নির্যাতনে ২ যুবক মারা গেছে। আরেক ভুক্তভোগী ডাসার উপজেলার গোপালপুর গ্রামের বনি আমিন। তাকে মুক্তিপণের জন্য কয়েক দফায় নির্যাতন চালানো হয়। পরে শরীফের স্ত্রী সুমির এজেন্ট ব্যাংকিং নম্বরে ২০ লাখ টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, নির্ঝর এতটাই নির্দয় যে, কাউকেই সে ছাড়ে না। বাপ-চাচার বয়সীদেরও টাকার জন্য প্রচুর মারধর করে। গলায় পাড়া দিয়ে, দাড়ি টেনে কাঠের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে নির্যাতন চালায়।

ভুক্তভোগীদের প্রথমে লোহার আঁড়ার সঙ্গে ঝুলানো হয়। এরপর প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়।

জানা গেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন অভিযুক্ত আজিজুল হক নির্ঝর। মুক্তিপণের দাবিতে নির্যাতনের বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান, আমি নিজেও কাজের সন্ধানে লিবিয়া গিয়েছিলাম। আমাকে ইতালি যাওয়ার পথে মাফিয়ারা বন্দি করে শরীফের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ক্যাম্পের বন্দিরা সবাই অনেক কান্নাকাটি করতো। আমি ভাষা জানতাম বলে সবাইকে চুপচাপ রাখতে শরীফ আমাকে ক্যাম্পের দায়িত্ব দিয়েছিল। সে সময় অনেককেই গালাগালি করেছি, তাই ক্ষুব্ধ হয়ে আমার নামে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। আমি কারো কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করিনি। তবে শুনেছি, ওখানে সাড়ে ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নেয়া হয়। আমার নামে করা অভিযোগ সত্য নয়।

তবে দেশের আসার পরপরই একাধিক ভুক্তভোগী দলবদ্ধ হয়ে নির্ঝরকে জুতাপেটা করেন। তাকে জুতার মালা গলায় দিয়ে ভিডিও ধারণও করা হয়। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে।

যা বলছে প্রশাসন:
মাদারীপুরের পুলিশ-প্রশাসন জানায়, জেলায় ২০২২ সালের জুলাই থেকে সবশেষ দুই শতাধিক মামলা হয়েছে।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, অনেক ভুক্তভোগী দেশে ফিরে মানবপাচার আইনে মামলা করেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না। আমরা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করি। এরপর জানা যায়- অনেকেই করুণ পরিণতির শিকার হন।

তিনি বলেন, মানবপাচার ঠেকানোর জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হলো অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা। মূলত মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা দরকার। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে এগিয়ে আসা দরকার।

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, অনেক ভুক্তভোগী দেশে ফিরে মানবপাচার আইনে মামলা করেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হয় না। আমরা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করি। এরপর জানা যায়- অনেকেই করুণ পরিণতির শিকার হন।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মারুফুর রশিদ খান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, মাদারীপুর অঞ্চলসহ মধ্যাঞ্চলে মানবপাচারের ঘটনা আশঙ্কাজনভাবে বেড়েছে, যা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন মানবপাচার রোধে অনেক তৎপর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!