মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, বইপ্রেমী মানুষের মিলনমেলায় প্রাণবন্ত পাবনার অমর একুশে বই মেলা। বইয়ের স্টলগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। মেলায় অংশ নেয়া স্টল মালিকরা জানান, তাদের কাটতি এবার আশাতীত। শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী, শিক্ষানুরাগীসহ সব বয়সী মানুষ মেলায় আসছে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণ বইপ্রেমীদের জন্য উন্মুক্ত থাকছে। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনায় চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
বই মেলার আয়োজকরা জানান, পাবনায় ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মাসব্যাপী বই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী ঢাকার পরই পাবনার বই মেলা তার অবস্থান করে নিয়েছে।
.png)
বই মেলায় অংশ নেয়া অন্যতম বড় স্টল মালিক ও প্রকাশক আর.কে আকাশ জানান, অনেকের ধারণা এখন ফেসবুক ইউটিউব এর যুগ। মুদ্রিত বইয়ের দিন বুঝি শেষ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে তার নীলাকাশ প্রকাশনী পাবনা বই মেলায় অংশ নিচ্ছে। তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, গত তিন-চার বছর আগে যত বই বিক্রি হয়েছে এবার তার চেয়ে বেশি বই বিক্রি হয়েছে।
_1708773182.jpg)
তরুণ সংগঠক ও বই প্রেমী এসএম আদনান উদ্দিন বলেন, ‘বই মেলা আমাদের উজ্জীবিত করেছে। এই প্রাণের মেলা আমাদের যেন মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছে। শুধু বই কেনার জন্যই আসা নয় অনেকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, উৎসব মুখর পরিবেশে। এ যেন বহু প্রাণের মেলা।’
তিনি জানান, পাবনা বই মেলায় এবার বইয়ের অনেক সমারোহ। তিনি তার পছন্দমত বই সংগ্রহ করতে পারছেন।
সদ্য বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স শেষ করা আনিকা আফরোজ জানালেন, পাবনার মতো মফস্বল শহরে এ মেলা অনেক গর্বের। তিনি মেলা ঘুরে ঘুরে তার পছন্দের বই কিনেছেন বলে জানান।
কলেজ ছাত্র আবির ও বুলবুল জানান, তারা কলেজে পড়ার সুবাদে গ্রাম থেকে পাবনা শহরে এসে থাকছেন। তাই জীবনে এবারই প্রথম বই মেলায় এসেছেন তারা। এতে তারা অভিভূত।
পাবনা জেলা স্কুলের ছাত্র আল মুতালিব হোসেন বলেন, বন্ধুর সঙ্গে বই মেলায় এসেছি। প্রতি বছরই বই মেলায় আসি। বিভিন্ন ধরণের বইয়ের মধ্যে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীগুলো ভালো লাগে।
কলেজ ছাত্রী সাবরিনা বলেন, ‘অনেক দিন পর প্রিয় লেখকদের বই কিনে খুব খুশি লাগছে। মেলা মঞ্চে প্রতিদিন বই পড়ার গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করা হয়। এটাও একটা ভালো দিক।’
গৃহিণী ফাতিমা খাতুন জানান, তার বাচ্চার জন্য তিনি বই মেলায় এসেছেন। শিশুর জন্য তিনি দুই হাজার টাকার শিশুতোষ বই কিনেছেন। শিশুকে মোবাইল গেম বা কার্টুন দেখানো কমাতে বেশি করে বই কিনে দিচ্ছেন।
মেলায় আসা প্রবীণ শিক্ষক আব্দুল খালেক বলেন, বসন্তের হাওয়া বইছে বই মেলায়। বইয়ের মেলা যেন হাজরো প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে। শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস করাতে হবে। কারণ একটি ভালো বই শিশুর জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বই আমাদের গড়তে শেখায়, শিখতে শেখায়। বই বুদ্ধি, জ্ঞানের আধার, অমলিন আনন্দেরও উৎস।
তিনি বলেন, মহামানবদের শৈশব, স্বপ্ন ও তাদের কালজয়ী কর্ম সম্পর্কে জানতে হবে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শরৎচন্দ্রের লেখা পড়তে হবে। শিশুদের পাঠের অভ্যাস গঠন, মেধা ও সৃজনশীলতার উন্মেষ এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বই পড়াটা তাদের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। পাবনার এই অমর একুশে বইমেলা সেক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখছে বলে তিনি মনে করেন।
বই মেলা উদযাপন পরিষদের সদস্য প্রলয় চাকী বলেন, এই বই মেলাকে ঘিরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল বই প্রেমীরা। দেশে শুধুমাত্র ঢাকা ও পাবনা জেলায় মাসব্যাপী বই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছেম বইপ্রেমীদের ভিড় পরিণত হয়েছে এক মিলন মেলায়।
পাবনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজ সেবক অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ভার্চুয়াল জগতে অহেতুক ডুবে না থেকে বই পড়ায় অভ্যস্ত হতে হবে। আলোকিত মানুষ হতে হলে বই পড়তে হবে। আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যেই ঢাকার পর পাবনাতে মাসব্যাপী বই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
তিনি জানান, পাবনাতে নতুন লেখক ও প্রকাশক তৈরিতে এ বই মেলা বিরাট ভূমিকা রাখছে।