ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

ভিক্ষুকের কোলের বাচ্চা কার?

মো. রাকিবুর রহমান, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১৫:৫০, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
ভিক্ষুকের কোলের বাচ্চা কার?
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শনিবার দুপুর ২টা। চট্টগ্রাম নগরের একে খান মোড় এলাকায় আনুমানিক ছয় থেকে সাত মাস বয়সী একটি শিশু কোলে নিয়ে ঘুরছিলেন রাবেয়া (ছদ্মনাম)। হাত পাতছিলেন পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারী ও গাড়ি থেকে নামা যাত্রীদের উদ্দেশ্য করে। পথচারী কিংবা গাড়ির যাত্রীরাও যে যার সাধ্যমতো করছিলেন সাহায্য। দুই, পাঁচ, দশ কিংবা বিশ টাকা করে দিয়ে যাচ্ছিলেন রাবেয়ার হাতে।

দেবেন না-ই বা কেন? রাবেয়ার কোলে ছোট্ট এক মায়াবী শিশু, দেখে মায়া কাড়বে যে কারো। তবে সেই শিশু আদৌ রাবেয়ার কিনা, তা হয়তো জানেন না তাদের কেউই।

রাবেয়ার কাছে গিয়ে ‘শিশুটি কার’ জানতে চাইলে উত্তরে ‘নিজের’ বলে দাবি করেন তিনি। এরপর শিশুর নাম ও বয়স জানতে চাইলে খানিকটা ইতস্তত বোধ করেন রাবেয়া। দ্রুত সেখান থেকে চলে যান তিনি।

কিছুক্ষণ পর ঠিক সেখানেই কোলে ছোট্ট শিশু নিয়ে হাজির হন আরেকজন। নাম জিজ্ঞেস করতেই এড়িয়ে যান প্রতিবেদককে। যথারীতি রাবেয়ার মতো শিশু দেখিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করে যাচ্ছিলেন তিনিও। শিশুটির বয়স আনুমানিক দেড় বছর। রাবেয়ার মতো তিনিও শিশুটি নিজের বলে দাবি করেন।

তবে শুধু রাবেয়া কিংবা পরবর্তীতে আসা সেই নারীই নন, ঐ এলাকায় ভিক্ষা করছিলেন অন্তত আট থেকে দশজন নারী। যাদের প্রায় প্রত্যেকের কোলে কিংবা সঙ্গে ছিল বিভিন্ন বয়সী শিশু।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

অনুসন্ধান বলছে, সুস্থ-স্বাভাবিক কাজে সামর্থ্যবান হলেও টাকা উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে এসব শিশুদের ব্যবহার করছেন তারা। আর এ কাজে লিপ্ত অসংখ্য নারী। কেউ কেউ কোলে থাকা শিশু নিজের বলে দাবি করলেও সব শিশু নিজের নয়, কিছু আনেন ভাড়ায়; আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করে অপরাধী চক্র- বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ডেপুটি গভর্নর আমিনুল হক বাবু বলেন, সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ভিক্ষাবৃত্তি অনেকটাই কমে এসেছে। দরিদ্রদের ভাগ্যোন্নয়নে নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এরপরও দরিদ্র কিছু মানুষ তো আছেই। যারা ভিক্ষা করে তাদের মধ্যে কে আসল কে নকল, বোঝা কিছুটা কঠিন। কেননা দরিদ্র কাউকে দেখলে মানুষের মধ্যে যে সহানুভূতি কাজ করে, সেটিকে পুঁজি করে একটি চক্র দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জোর করে কিংবা অনেক সময় ভাড়ায় খাটিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োগ করে বলে অভিযোগ আছে। অনেক সময় বীভৎসভাবেও করেন। এমনও শুনেছি- শিশুদের ওষুধ দিয়ে বা ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে অথবা বিভিন্ন কৌশলে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োগ করা হয়। রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় শিশুগুলো দেখে মানুষের মধ্যে সহানুভূতি কাজ করে। মানুষ তো ততটা গভীরে যায় না, কিংবা যাওয়ার চেষ্টা করে না।

তিনি আরো বলেন, মূলত এলাকাভিত্তিক কিছু চক্র এসব করে, যারা নানা ধরনের অপরাধকর্মের সঙ্গে লিপ্ত। এলাকাভিত্তিক চুরি-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে এমন মানুষের পৃষ্ঠপোষকতাও এখানে রয়েছে। চট্টগ্রামে অলি আউলিয়ার দরগাহ বেশি, মাজার বেশি। ফলে মাজার এলাকায় চক্র নিয়ন্ত্রিত এসব ভিক্ষুকের আনাগোনা বেশি। কেননা মাজারে যারা যায়, তাদের আবেগ কাজ করে। সেই আবেগকে পুঁজি করে চক্রগুলো সুযোগ নেয়। এছাড়া জনসমাগম বেশি এমন এলাকায়ও এসব ভিক্ষুকের উপস্থিতি থাকে বেশি।

আমিনুল হক বাবু বলেন, এ ধরনের অপরাধকর্মে লিপ্তদের চিহ্নিত করে সঠিক ব্যবস্থা নিতে আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানাই। তবে এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় এ ধরনের কাজগুলো হয়, সেই এলাকার দোকানদার কিংবা অধিবাসী যারা আছেন; তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করতে হবে। যাতে অসহায়ের ছদ্মবেশে কিংবা আবরণে কেউ এ ধরনের কাজ করার সুযোগ না পায়। এটি অবশ্যই নিন্দনীয় কাজ এবং অপরাধও।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, ভিক্ষাবৃত্তিতে শিশুদের ব্যবহার করে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ। ছোট থেকেই ধীরে ধীরে পরনির্ভরশীল জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তাদের। এখান থেকে অনেক শিশু অল্প বয়সেই অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে। লিপ্ত হয় মাদক বহনের মতো কাজেও।

শিশু আইন ২০১৩ অনুসারে- কোনো ব্যক্তি যদি কোনো শিশুকে ভিক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন বা কোনো শিশুর দ্বারা ভিক্ষা করান অথবা শিশুর হেফাজত, তত্ত্বাবধান বা দেখাশোনায় নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি শিশুকে ভিক্ষার উদ্দেশ্যে নিয়োগদানে প্রশ্রয়দান বা প্রদান করেন, তাহলে সেটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ অপরাধের জন্য ঐ ব্যক্তি অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয় চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক মো. ফরিদুল আলম বলেন, উপার্জনের সহজ মাধ্যম হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নেন অনেকে। দেখা যায়- গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে এসে কেউ কেউ এ কাজে লিপ্ত হন। তবে ভিক্ষাবৃত্তি রোধে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। কাউকে ভ্যান, কাউকে দোকানসহ বিভিন্নভাবে উপার্জনের মাধ্যম করে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, শিশুদের ব্যবহার করে ভিক্ষাবৃত্তি করানোও অপরাধ। তবে এক্ষেত্রে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। যারা এ কাজে ঝুঁকছেন, তাদের নিরুৎসাহিত করতে হবে। যদিও সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে পূর্বের তুলনায় ভিক্ষাবৃত্তি অনেকটাই কমে এসেছে। সেটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এইচএন
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!