ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

৪ কোটি টাকার সেতুতে ওঠা-নামায় বাঁশ-কাঠের মই

মো. মঈনউদ্দিন আহমেদ, মুন্সীগঞ্জ
প্রকাশিত: ১৭:৫৭, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
৪ কোটি টাকার সেতুতে ওঠা-নামায় বাঁশ-কাঠের মই
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মুন্সীগঞ্জে নির্ধারিত সময় পার হলেও শেষ হয়নি একটি সেতুর নির্মাণকাজ। দুই পাশে বাঁশ ও কাঠের মই দিয়ে সেতুতে ওঠা-নামা করতে হয়। বাঁশের সাঁকোতে উঠতে গিয়ে আবার প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোটবড় দুর্ঘটনা। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা। অথচ নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর আরো কয়েকবার বাড়ানো হয় কাজের মেয়াদ। এ অবস্থায় মুন্সীগঞ্জে সদরের চরকেওয়ার ইউনিয়নের চরমসুরা এলাকার মেঘনার শাখা খালের উপর নির্মাণাধীন সেতু এলাকার মানুষ এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চান। 

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে চার কোটি ২৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৯ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ২৪ ফুট প্রস্থের এ সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় টিএন-এএসআই নামে যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযোগ সড়কসহ নির্মাণ কাজ শেষ করে সেতুটি হস্তান্তরের কথা ছিল। তবে নকশা জটিলতার কারণ দেখিয়ে গত বছরের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে দ্বিতীয় দফায় আবারো ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নেয় তারা। এরপর কয়েক দফা নানা অজুহাতে সময় বৃদ্ধি করা হলেও নির্ধারিত সময়ে হয়নি নির্মাণ কাজের সমাপ্তি।

এছাড়া এলজিইডির তথ্য বলছে, বরাদ্দকৃত অর্থে সেতুটি ৩৯ মিটার হওয়ার কথা থাকলেও নির্মাণ হয়েছে ৩১ মিটার। দুই পাশের কোথাও প্রস্তুত হয়নি সংযোগ সড়ক।

সরেজমিন দেখা যায়, সেতুটি মূল সড়ক থেকে অন্তত ১০-১১ ফুট উঁচুতে। সেতুর পূর্বপাশের উচ্চতা কাঁচা সড়ক থেকে অন্তত ১৫ থেকে ১৬ ফুট উপরে। দু’পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতু দিয়ে উঠা-নামা করতে বাঁশ-কাঠ দিয়ে তিনটি খাঁড়া সাঁকো বানানো হয়েছে। সাঁকো বেয়ে সড়কপথে যাতায়াত করছেন মানুষ। এতে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিক্ষার্থীসহ কয়েক গ্রামের হাজারো মানুষ। আবার মাঝপথে কাজ বন্ধ রেখে রীতিমতো উধাও হয়ে গেছেন ঠিকাদার।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় আট বছর আগে ঝাপটা এলাকার মানুষ মেঘনার খালটি নৌকায় করে পারাপার হতেন। এরপর এখানে বাঁশের সাঁকো বানানো হয়। ঝাপটা ও দক্ষিণ চরমসুরা গ্রামের চার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই সাঁকো পার হয়ে মুন্সীগঞ্জ শহরে যাতায়াত করতেন। এরপর সেতু নির্মাণ শুরু হওয়ায় খুশি হন স্থানীয়রা। তবে দীর্ঘদিন নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় এখন তারা হতাশ।

তাদের অভিযোগ, সেতুতে উঠার জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক না করায় বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে। বাঁশের সাঁকোতে উঠতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে কয়েকজনের হাতও ভেঙে গেছে। দুধ, ডিম এবং কৃষিপণ্য নিয়ে সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন অনেকেই।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

এদিকে মেঘনার খালের ওপরে নির্মাণাধীন সেতুটি ইউনিয়নের চরঝাপটা ও দক্ষিণ চরমসুরা গ্রামকে যুক্ত করেছে মূল সড়কের সঙ্গে। তবে দীর্ঘদিন নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকায় সেতুর সুফল বঞ্চিত হচ্ছেন এ দুই গ্রামসহ আশপাশের অন্তত অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। ফলে সংশ্লিষ্টদের শীঘ্রই নির্মাণ কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সাঁকো বেয়ে সেতুতে উঠতে না পেরে হামাগুড়ির মতো করে ঐ খালে নামেন মুন্নি বেগম নামে এক নারী। সঙ্গে ছিল তার দুই বছরের ছেলে মিনির হোসেন। খালের পূর্বপাশে ছেলেকে মাদরাসায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। মুন্নি বেগম বলেন, সেতু বানানোর আগে যখন সাঁকো দিয়ে খাল পার হতাম তখনও এমন ভোগান্তি ছিল না। সংযোগ সড়ক ছাড়া সেতু বানিয়ে আমাদের মতো নারী ও ছোট শিশুদের আরো বিপদ বাড়িয়ে দিয়েছে। খাড়া সাঁকো বেয়ে সেতুতে উঠতে পারি না। খাল দিয়ে নেমে যেতেও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। বৃষ্টি হলে এতে ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুণ বেশি।

অসুস্থ শরীরে পূর্ব পাশ থেকে সাঁকো বেয়ে উঠেন ঝাপটা গ্রামের রহমান মাস্টার (৫২)। সেতুতে উঠার পর দুই মিনিট বিশ্রাম নেন তিনি। এরপর আবার সেতুর পশ্চিম পাশের ভাঙা সাঁকো বেয়ে নিচে নামেন। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ছে না অবহেলিত এই গ্রামের মানুষের। সেতুটিকে ঘিরে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছেন অনেকে। তবে নির্মাণ কাজ থেমে থাকায় বছরজুড়ে ভোগান্তি বেড়েছে মানুষের। ফলে দ্রুত নির্মাণ কাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে আশার বাণী যেন শুভঙ্করের ফাঁকি না হয়- সেটিও লক্ষ রাখার অনুরোধ জানাই।

চরকেওয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন ভূইয়া বলেন, কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করেনি। গত বছর বর্ষার পরে সংযোগ সড়ক করে দেওয়ার কথা ছিল। তবে তারা কোনো কাজ করছে না। সরকারের কয়েক কোটি টাকা খরচ করে সেতুটি করা হয়েছে। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে মানুষ সেতুর সুফল পাচ্ছেন না। উল্টো দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এজন্য স্থানীয়দের দুর্ভোগের কথা বলে শেষ করা যাবে না।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. রফি উদ্দিন আহম্মেদ ফেরদৌস জানান, শিগগিরই ফের শুরু হবে নির্মাণ কাজ। তবে কেন দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হয়নি তিনি।

দ্রুত নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী মো. শফিকুল আহসান। একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে সেতুর কাজ বুঝিয়ে দিতে পারছে না। আমরা তাদেরকে কয়েকবার চিঠি দিয়েছি। সবশেষ তারা গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নিয়েছিল। এরপরেও সেতুটি বুঝিয়ে দিতে পারেনি। ফের যোগাযোগ করা হলে তারা এক সপ্তাহের সময় নিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী চুক্তিপত্র বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এইচএন
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!