হাঁসের পালকে সম্ভাবনা
হাঁস-মুরগির পালক অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে- এটা অনেকের কাছে অবাক লাগতে পারে। পালক সাধারণত বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। তবে সেই পালক ফেলে না দিয়ে সংগ্রহ করা হচ্ছে নওগাঁয়। আর ব্যবসায়ীদের হাত ধরে বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকার পালক চলে যাচ্ছে রাজশাহী ও ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এতে সৃষ্টি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
জেলার রাণীনগর উপজেলার বালুভরা গ্রামের ব্যবসায়ী ছিলেন মজিবর রহমান। তিনি হাঁস-মুরগির ব্যবসা করতেন। ভারতেও হাঁস-মুরগি সরবরাহ করতেন। ১৯৪৭ সালে নাহিদ ফেদার এন্ট্রারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। এরপর পাকিস্তান এবং চীনে হাঁসের পালক রফতানি করেন ১৯৮২ সাল পর্যন্ত।
এসব পালক থেকে ফেদার, কোট, লেপ এবং তোশক তৈরি হয়। পরবর্তীতে ঢাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছে পালক বিক্রি শুরু করেন। মজিবর রহমানের অবর্তমানে সেই ব্যবসার হাল ধরেন তার ছেলে আব্দুস সালাম। রাণীনগর বাজারে তার পালক এবং স্টেশনারি দোকান রয়েছে।
১৯৯০-৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি নিজেই জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও চায়নাতে হাঁসের পালক রফতানি করেন। ১৯৯৫ সালে সারাদেশের মতো জেলাজুড়ে ভয়াবহ বন্যা হলে রফতানির জন্য রাখা পালকগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এতে প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকা ক্ষতি হয় আব্দুস সালামের। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাড়তে থাকে দূরত্ব। এরপর আর রফতানি করেননি তিনি।
এরপর ঢাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে পালক বিক্রি শুরু করেন আব্দুস সালাম। তবে ২০১৯ সালে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে তা আবারো বন্ধ হয়ে যায়। এতে হতাশ হয়ে পড়লেও হাল ছাড়েননি তিনি। রাজশাহীতে চায়না ব্যবসায়ীরা পালক কেনা শুরু করলে তাদের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন। তার দোকানে পাঁচজন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। খারাপ-ভালো পালক ও আবর্জনা বাছাইয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা। এ পালক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় অন্তত পাঁচ হাজার হকারের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে পালক সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন পালক সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। দিনে তারা ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকেন।

রাণীনগর বাজারে তিনজন পালক ব্যবসায়ী রয়েছেন। পাইকাররা এসে তাদের কাছ থেকে পালক সংগ্রহ করে নিয়ে যান। পালক ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন পালক ব্যবসা। হকাররা বিভিন্ন গ্রাম থেকে পালক সংগ্রহ করে দিন শেষে তারা বিক্রি করেন। ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে কেনেন এসব পালক। আর পাইকারিতে বিক্রি হয় ১৮০ টাকা কেজি দরে।
তিনি আরো জানান, প্রতি সপ্তাহে প্রায় এক টন পালক সংগ্রহ হয়, যার বাজার মূল্য প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। মাসে প্রায় সাত লাখ টাকার পালক বিক্রি হয়। এসব পালক দিয়ে বিদেশে ফেদার, কোট, লেপ ও তোশক তৈরি হয়। পালক বাছাইয়ে প্রয়োজন আধুনিক বাছাই মেশিন। আর দাম প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এ মেশিন কেনা সম্ভব হলে পালক বাছাই করে আরো ভালো দাম পাওয়া সম্ভব। পালক রফতানি করা সম্ভব হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও ব্যবসার পরিধি বাড়ানোসহ অনেকের কর্মসংস্থান হবে বলে জানান তিনি।
আলতাফ হোসেন নামে এক কর্মচারী বলেন, ১৯৯৪ সাল থেকে এখানে কাজ করছি। সেসময় মাসে পারিশ্রমিক পেতাম ৯০০ টাকা। বর্তমানে মাসে নয় হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাই। ভাল-খারাপ পালক বাছাই এবং আবর্জনা পরিষ্কারের পর বস্তায় ভরে থাকি আমরা।
পালক সংগ্রহকারী মুনছের আলী বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে পালক সংগ্রহের কাজ করি। সারাদিনে যা সংগ্রহ হয় বিকেলে তা বিক্রি করি। একটি পাতি হাঁসের পালক তিন থেকে পাঁচ টাকা এবং রাজ হাঁসের পালক ১০ টাকা দিয়ে সংগ্রহ করে থাকি। প্রতি কেজি পালক ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা হিসেবে বিক্রি হয়। এ থেকে দিনে প্রায় ৪০০ টাকা আয় হয়।

এ বিষয়ে রাণীনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি কাজী রবিউল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আব্দুস সালাম পালকের ব্যবসা করে আসছেন। তার বাবাও এ ব্যবসা করতেন। বাজারে আরো কয়েকটি পালকের দোকান আছে। পর্যাপ্ত সহযোগিতা পেলে এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
নওগাঁর বিসিক শিল্প নগরী উপ-ব্যবস্থাপক শামীম আক্তার মামুন জানান, হাঁসের পালক রফতানিযোগ্য একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। এসব পালক থেকে বিভিন্ন বস্ত্র উৎপাদন করলে ব্যবসায়ীরা আরো লাভবান হবেন। এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে সার্বিক সহযোগিতার কথাও জানান তিনি।