এর আগের বছর খুলনা বিভাগে শনাক্ত হয়েছিলো শিশুসহ ৬৫ জন এবং মৃত্যু শিশুসহ ১৮ জনের। ঐ সময়ে খুলনায় দুই শিশুসহ শনাক্ত হয় ২৮ জন এবং মৃত্যু হয় শিশুসহ আটজনের। এই পরিসংখ্যান হিসেবে খুলনাঞ্চলে দিনকে দিন বাড়ছে এইডসের শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বাদ পড়ছে না শিশুরাও। খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টার থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের এআরটি সেন্টার থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত শিশুসহ এক হাজার ২০২ জনের রক্ত পরীক্ষার মধ্যে এইচআইভি/এইডস শনাক্ত হয়েছে শিশুসহ ৭১ জন। শনাক্তের মধ্যে পুরুষ ৪৬ জন এবং মহিলা ২৩ জন এবং হিজড়া আছেন দুইজন। এর মধ্যে শিশু (পুরুষ) দুইজন এবং শিশু (মহিলা) আছেন তিনজন। শনাক্তের মধ্যে খুলনায় ৩৫ জন, বাগেরহাটে ১১ জন, নড়াইলে সাতজন, যশোরে নয়জন, গোপালগঞ্জে দুই, বরগুনা, বরিশাল, ঝিনাইদহ ও নারায়ণগঞ্জে একজন করে এবং সাতক্ষীরায় তিনজন। এ সময়ের মধ্যে মোট ২৫ জনের মৃত্যু হয়। মারা যাওয়ার মধ্যে খুলনায় আটজন, সাতক্ষীরায় দুইজন, যশোরে সাতজন, নড়াইলে তিনজন, বাগেরহাটে তিনজন, মেহেরপুরে একজন এবং রাজশাহীতে একজন রয়েছে। মারা যাওয়ার মধ্যে পুরুষ ১৬ জন এবং মহিলা আছেন নয়জন। এর মধ্যে ১০ বছরের শিশু (পুরুষ) রয়েছে। সে যশোর জেলার বাসিন্দা।
.png)
জানা যায়, (২০২২ সাল থেকে ২০২৩ অক্টোবর) গত এক বছরের খুমেক হাসপাতালে এআরটি সেন্টার থেকে নতুন করে ১১৬ জনকে এইচআইভি/এইডস চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এরমধ্যে খুমেক হাসপাতালে এআরটি থেকে শনাক্ত হয় ৭১ জন। বাকি ৪৫ জনকে বিভিন্ন জেলার এনজিও ও সরকারি হাসপাতাল থেকে এই এআরটি-তে রেফার্ড করা হয়। এরমধ্যে রয়েছে বিএসএমএমইউ এআরটি সেন্টার থেকে তিনজন, সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতাল (আডিএইচ) দুইজন, সিরাজগঞ্জ এআরটি থেকে একজন, যশোর এরআরটি সেন্টার থেকে ১৫ জন, সিলেট এআরটি সেন্টার থেকে একজন, ডিএএম (এমএসএম) এনজিও অফিস থেকে ১০ জন এবং আশার আলো সোসাইটি (এএএস) এনজিও অফিস থেকে ১৩ জন। এসব শনাক্তের মধ্যে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ৪০ জন, সমকামী ৪৪ জন, সেক্স ওয়ার্কার পাঁচজন, যক্ষারোগী ১০ জন, সেক্স ওয়ার্কার (পার্টনার) তিনজন, হিজড়া তিনজন, বিদেশে অবস্থান (আসা যাওয়া) পাঁচজন, এইডস পার্টনার দুইজন, সমকামীতে পার্টনার ১০ জন রয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন) ও এআরটি সেন্টারের ফোকাল পার্সন ডা. দীপ কুমার দাশ বলেন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য এইডস আক্রান্ত হয়, বিষয়টি তেমন নয়। আক্রান্ত মায়েদের কাছ থেকে শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে রক্ত নিলেও এইডসে আক্রান্ত হয়। মায়ের কাছ থেকে শিশুরা সাধারণত তিনটি উপায়ে এইচআইভি/এইডস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। গর্ভাবস্থায়, প্রসবকালে এবং বুকের দুধের মাধ্যমে সন্তানের শরীরে এই জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মতে ৯৯ শতাংশের ক্ষেত্রেই শিশুরা তাদের মায়েদের কাছ থেকে এইডসে আক্রান্ত হয়। সেজন্য সন্তান নেয়ার আগে মায়েদের এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েদের জন্য ‘প্রিভেনশন মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন’ (পিএমসিটি) নামে একটি প্রোগ্রাম চালু আছে। এই প্রোগ্রামে এইচআইভি/এইডস পজিটিভ নারীর গর্ভের সন্তানটি যেন এইচআইভি নেগেটিভ হয়, সে লক্ষ্যে সেবাদান করা হচ্ছে।
ডা. দীপ কুমার দাশ বলেন, এআরটি সেন্টার থেকে সকল পর্যায়ে মানুষদের জন্য বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। একইসঙ্গে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের সব প্রকার পরীক্ষা এবং ১৫-১৬ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করছেন। যা বয়স ও ওজন ভেদে আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। যক্ষ্মা রোগীদের মধ্যে এইচআইভি/এইডস পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে যাদের যক্ষ্মা আছে তাদেরকে এইচআইভি/এইডস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম-অ্যাডমিনিস্ট্রেটর দিবেশ ওঝা বলেন, ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে ১৫৮ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী নিয়ে এআরটি কর্নার যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এই সেন্টারে ৬২৭ জন আইডি ভুক্ত এইচআইভি পজিটিভ রোগী আছেন। এরমধ্যে ৩৬৩ জন রোগী নিয়মিত এআরভি ওষুধ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, এইচআইভি পজিটিভ রোগীর ট্রিটমেন্ট সেন্টার বিভাগীয় শহরে আর একটিও নেই। এ বছরে খুমেক হাসপাতালে এআরটি সেন্টারে রেফার হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪৫ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৪৭ জন।
তার দেওয়া তথ্য মতে খুমেক হাসপাতালসহ সারাদেশে সরকারিভাবে ১৩টি এআরটি সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে (২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত) ৯২৩ জনের এইডস পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে, তিন শিশুসহ ৬৫ জনের এইডস শনাক্ত করা হয়। শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৩৩ জন ও নারী ৩২ জন। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টার থেকে এইচআইভি/এইডস পরীক্ষার মধ্যে ২৮ জনের শরীরে এইচআইভি পজিটিভ পাওয়া যায়।
এরমধ্যে খুলনার বাসিন্দা ছিলেন ১৮ জন। এছাড়া যশোরে ছয়জন এবং বাগেরহাটের চারজন। পজিটিভ হওয়ার রোগীর মধ্যে পুরুষ ১৭ জন, মহিলা নয়জন এবং শিশু ছিল দুইজন। একই সময়ে এইডস আক্রান্ত সাতজন রোগী মারা যায়। মারা যাওয়ার মধ্যে খুলনায় চারজন, বাগেরহাটে দুইজন এবং নড়াইলে একজন ছিল। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ চারজন, মহিলা দুইজন এবং শিশু ছিল একজন।
ঐ বছর খুমেক হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে রেফার রোগী সংখ্যা ছিল ২৪ জন। ঐ সময়ে এআরটি সেন্টারের সেবা গ্রহণকারী ৪৩৬ জনের মধ্যে ২২৫ জন পুরুষ ও ২০৮ জন নারী ছিল। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক ছিল তিনজন। ২০২১ সালে ঐ কেন্দ্রের আওতায় এইচআইভি জীবাণু বহনকারীদের মধ্যে খুলনার ১৪৯ জন, যশোরের ১০৬ জন, সাতক্ষীরার ৫৫ জন, বাগেরহাটের ২৬ জন, বরগুনার দুইজন, বরিশালের একজন, চুয়াডাঙ্গার পাঁচজন, ফরিদপুরের চারজন, ঝিনাইদহের ১৩ জন, গোপালগঞ্জের আটজন, ঝালকাঠির একজন, মাদারীপুরের একজন, মাগুরার ১০ জন, নড়াইলের ৪৬ জন, পটুয়াখালীর একজন, পিরোজপুরের চারজন, রাজশাহীর একজন এবং জেলা উল্লেখ না করা দুইজন ছিলেন। ২০২০ সালে পরীক্ষা করা হয় ৮২০ জনকে; এইডস শনাক্ত হয় ৩২ জনের শরীরে। আর ২০১৯ সালে ৫৩৫ জনকে পরীক্ষা করার পর ৪২ জন এইডস আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছিলেন।