রজনীকান্ত সেনের স্বাধীনতার সুখ কবিতাটি মর্মার্থ জীবনে ধারণ করলে চাহিদা ও প্রাপ্তির নানা অসঙ্গতি তাড়িয়ে স্ব স্ব অবস্থানে সন্তুষ্ট থাকার প্রেরণা মিলবে। বাবুই পাখির মতো আত্মসম্মানবোধ ও তৃপ্তির পালক যোগ হবে জীবনে।
বুননশিল্পী বা কারুশিল্পী বা তাঁতি পাখি নামেও ডাকা হয় ছোট্ট এই বাবুই পাখিকে। সংঘবদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত এই পাখিরা লোকালয়ের উঁচু গাছে বাস করতে পছন্দ করে। দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে এদের বেশি দেখা মিলে। জনশ্রুতি রয়েছে- বাবুই পাখির বাসায় রাতে আলো জ্বালে। বাবুইরা আলোর জন্য বাসায় কৌশলে জোনাকি পোকা আটকে রাখে।
.png)
একসময় গ্রামের আকাঁবাকা পথ ও বাড়ির আঙিনায় উঁচু নারিকেল গাছ, তালগাছ, খেজুর গাছে তারা বাস করতো। কিচির-মিচির শব্দে মুখরিত করে রাখতো। নানা কারণে বিলুপ্তির পথে শৈল্পিক পাখি বাবুই। এখন আর আগের মতো বাবুই পাখি ও তার শৈল্পিক বাসা দেখা খুব একটা মিলে না।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বাবুই শারীরিক গঠনে অনেক ছোট পাখি। প্রজাতিভেদে ১৪-১৫ সেন্টিমিটার লম্বা এই পাখির ওজন হয় ১৮-২২ গ্রাম। দেশি বাবুই, দাগি বাবুই ও বাংলা বাবুই নামে তিন প্রজাতির বাবুই পাখি রয়েছে বাংলাদেশে। তবে বাংলা বাবুই ও দাগি বাবুই প্রায় বিলুপ্ত।
মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রীষ্মকালে বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুম। পুরুষ বাবুই বাসা বুনন শুরু করে, বাসা বুনন অর্ধেক হলে স্ত্রী বাবুই তা দেখে, তা পছন্দ হলে জুটি বাঁধে তারা। দুই থেকে চারটি ডিম দেয় স্ত্রী বাবুই। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে সময় লাগে প্রায় দুই সপ্তাহ। বাচ্চা উড়তে শিখে ৩০দিনে। বীজ, ধান, ভাত, পোকা ও ঘাস জাতীয় খাবার খুটে খুটে খায় তারা।
কঠোর পরিশ্রমী বাবুই পাখি নিজেই নিজের বাসা নির্মাণ করে। উল্টানো কলসির মতো দেখতে এই বাসা তৈরিতে ব্যবহার করে নলখাগড়া ও হোগলা বনের ঘাস ও পাতার আস্তরণ। ঠোঁটে কেটে ও পেটে ঘষে মসৃণ করা হয় আস্তরণ। বাসায় তৈরির সময় দুটি নিম্নমুখী গর্ত থাকে, পরে ডিম দেওয়ার সময় একটি বন্ধ করে দেয় হয়। নিম্নদিকে থাকে লম্বালম্বি দরজা এর মাঝে বেলকনি হিসেবে একটি রশি থাকে। এই পথে তারা চলাফেরা করে।
নারী ও পুরুষ ভেদে বাবুই পাখির রঙের ভিন্নতা লক্ষণীয়। প্রজনন সময়ে পুরুষ বাবুইর উজ্জ্বলতা বাড়ে। হালকা বাদামি ও হলদেটে বাবুই, পেট ফিকে সাদা, পিঠে লম্বালম্বি কালচে দাগ। বুকে চওড়া কালো ফিতা, ঘাড়ে ধূসর-কালো ও গলায় সাদা রঙ।
স্ত্রী বাবুইর পীঠে লম্বালম্বি হলুদ-কালচে দাগ, ঘাড়ে কালচে ডোরার মাঝে হলুদ দাগ। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের চোখ হালকা বাদামি, ঠোঁট কালচে, পা, আঙুল ও নখ হালকা গোলাপি হয়ে থাকে।
মামুন মজুমদার বলেন, ছোট বেলায় গ্রামের পথে প্রান্তরে প্রচুর বাবুই দেখতাম। এখন কালেভদ্রে চোখে পড়ে দুই থেকে একটি বাসা। নদীর পাড় ও চরে নলখাগড়া হোগলা কমে যাওয়া বাবুইও কমে যাচ্ছে।
হোগলা ও নলখাগড়া বন কমে যাওয়া, জমিতে কীটনাশক ব্যবহার, বাসা ভেঙে ফেলাসহ নানা কারণে বাবুইপাখি সংখ্যা দিন দিন কমছে। মানুষ সচেতন না হলে এই আত্মসম্মানী শৈল্পিক পাখির বিলুপ্তি রোধ করা সম্ভব হবে না।
অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল ভূঁইয়া বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন, পাখিদের অভয়ারণ্যের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তাল গাছের অপ্রতুলতার কারণে হাওরাঞ্চলসহ সারাদেশে দিনদিন বাবুই পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফসলি জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের বিষক্রিয়া ও খাদ্য অভাবে মারা যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে সংখ্যা কমছে।