ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

অদম্য জসীমের অনন্য জীবন সংগ্রাম

হারুন আনসারী, ফরিদপুর
প্রকাশিত: ১৫:২৯, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
অদম্য জসীমের অনন্য জীবন সংগ্রাম
অদম্য জসীমের অনন্য জীবন সংগ্রাম

জসীম মাতুব্বর। বয়স ২২ বছর। দুই হাত নেই। একটিও পা-ও খুঁড়িয়ে হাটতে হয় তাকে। কিছুটা খর্বাকৃতির এই ছেলেটিকে স্কুলে যাওয়ার পর তাচ্ছিল্যের সঙ্গে মারও খেতে হয়েছিল সহপাঠীদের হাতে। আজ তাদেরই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন পরিশ্রম আর অধ্যবসায় থাকলে অসম্ভবকেও জয় করা যায়। বলছিলাম ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউপির কদমতলী গ্রামের কৃষক হানিফ মাতুব্বরের ছেলে জসীমের কথা। চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ ৪.২৯ পেয়েছেন তিনি। 

জানা যায়, জসীমের শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতার কারণে তার হাটাহাটি শিখতেই লেগেছে ৬ বছরের বেশি সময়। অন্যরা তার সঙ্গে মিশতো না। বন্ধু বলতেও কেউ ছিল না। শিশুকালে তাকে একাকী কাঁধে নিয়ে গ্রাম ঘুরিয়ে বেড়াতেন তার দাদা। সেই ছেলেটি একদিন জেদ করে গেলো পাশের প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া করতে। তবে প্রথমদিনে সমবয়সীদের তরফে জুটলো তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর মারধর। পরে একজন শিক্ষক এসে তাকে রক্ষা করলেন। তাদের থেকে রেহাই মিললেও শিক্ষার্জনের প্রতি পদে পদে ছিলো তীব্র প্রতিকূলতা।

জসীম বলেন, আমিও পড়াশুনা করবো তাই একদিন জেদ করেই স্কুলে গেলাম। ওরা আমাকে বলতো ‘ল্যাংড়া’ তুই কেনো স্কুলে এসেছিস?’ তবে স্যারদের সহানুভূতি পেয়ে আমি স্কুল ছাড়িনি। এরপর জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেছি। এখন আমি উচ্চ শিক্ষা শেষ করে শিক্ষক হতে চাই। 

Advertisement

অদম্য জসীমের অনন্য জীবন সংগ্রাম

পরিবারের সদস্যদের বাইরে যিনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনি তার প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, জসীম খুবই মেধাবী এবং চৌকস। সে একবার কোনো জিনিস শুনলে সেটি মনে রাখতে পারে। কোনোকিছু দ্রুত শিখতে পারে। তার এই আগ্রহ দেখে তাকে আমরা এই পর্যন্ত আসতে উৎসাহ দিয়েছি। 

তিনি আরো বলেন, কাদা মাড়িয়ে স্কুলে আসার পর কাগজ দিয়ে ওর পা পরিষ্কার করে দিতাম। তারপর পায়ের নখের মধ্যে চক ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লিখতো। এক সপ্তাহের মধ্যেই স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ লেখা শিখেছে সে। জসীম এখন পড়াশুনা করতে পারে, খেলাধুলাও করতে পারে। সে ভালো ফুটবল খেলে, গানও গায়।

জসীমের মা তসিরন বেগম বলেন, আমি খুবই খুশি। খুবই আনন্দিত। 

জসীমের ছোট ভাই রশীদ বলেন, ভাইয়ের হাত নেই তারপরেও ও আমাকে কোলে নিয়ে স্কুলে যেতো। আমরা যখন মাঠে খেলতাম, তখন সেও খেলার জন্য মাঠে নেমে যেতো।

জসীমের গ্রামের বাড়িতে গেলে দেখা যায় একটি চারচালা সেমিপাকা টিনের ঘর। পাশে একটি মাটির জীর্ণ ঘর। ওই ঘরেই থাকেন তিনি। জানতে চাইলে জসীম বলেন, রাত জেগে পড়াশুনা করতে হয়। রাতে লাইট জ্বালালে অন্যদের ঘুমের ব্যাঘাত হয়। তাই এই ঘরে একাকী এসে পড়াশুনা করি। শুধু কি তাই, জসীম প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি আয় উপার্জনের জন্য মৌসুমী ব্যবসাও করেছেন। দুটি হাত নেই, তবু কিছু একটাতো করতে হবে; নইলেতো ভিক্ষে করে খেতে হবে।

তিনি বলেন, পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। সেই টাকায় প্রথমে কিছু আনারস আর বাঙ্গি কিনে বিক্রি করি। পরে তার খবর জানতে পেরে এক ব্যক্তি তাকে ৩০ হাজার টাকা সাহায্য করেন। সেই টাকা দিয়ে রাজশাহী থেকে লিচু এনে ব্যবসা করেন। পরে আরো কিছু টাকা টাকা যোগ করে একটি লিচুর বাগানও কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ব্যবসায় লাভ করতে পারেনি বরং পুঁজির টাকাও লোকসানে খোয়াতে হয়। পরে এডিডি নামে একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় সে একটি মোবাইল রিপেয়ারিং শপে কাজ শিখে সেখানেই কাজ করছে। 

অদম্য জসীমের অনন্য জীবন সংগ্রামমোবাইল রিপেয়ারিংয়ের প্রশিক্ষক সোহাগ শেখ বলেন, জসীম ভাইয়ের দুটি হাত নেই। তবু তিনি পা দিয়েই মোবাইল সারানোর কাজ ভালোভাবেই করছেন। আলহামদুলিল্লাহ তিনি অনেকের চাইতে ভালো করছেন। শুধুমাত্র আইসির কাজ বাদে আর সব কাজই তিনি ভালোই রপ্ত করেছেন।

জসীমের এই সাফল্যের খবরে উপজেলা প্রশাসনের তরফ হতে পুরস্কৃত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঈনুল হক তাকে ৬০ হাজার টাকা প্রদান করেন।

ইউএনও মঈনুল হক বলেন, অদম্য মেধাবী জসিম মাতুব্বরের স্বপ্ন পূরণে উপজেলা প্রশাসনের তরফ হতে তাকে সবধরনের সহায়তা করা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!