ইটের নিচে চাপা ‘স্বপ্নিল ভবিষ্যৎ’
রহিম উদ্দিনের বয়স ১০ বছর। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে মাকে নিয়ে তার সংসার। জীবনের শুরুতে দারিদ্র্যের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত জীবনযাত্রা তার। দু-বেলা দু-মুঠো খাবারের সন্ধানে নিয়ে যায় হাড়ভাঙা ইটভাটায়।
ছোট্ট রহিমের বাড়ি নোয়াখালীর মাইজদী উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। মাত্র ২০ হাজার টাকায় ছয় মাসের চুক্তিতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার নানকরা অর্পিতা ব্রিকসে কাজ করতে এসেছে শিশুটি।
রহিমের মতো সাকিব, তুহিন, সজিবদের দিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইট বানাচ্ছেন কুমিল্লার দুই শতাধিক ভাটার মালিকরা। তাদের দিয়ে বড় শ্রমিকদের পাশাপাশি কাঁচা ইট রোদে শুকানো, ইট তৈরি, ট্রলিতে করে ইট টেনে ভাটায় পৌঁছানো, মাটি বহনসহ নানা কাজ করানো হচ্ছে। দারিদ্র্যের বেড়াজালে বন্দি হয়ে ইটভাটায় চাপা পড়ছে এসব শিশুদের ‘স্বপ্নিল ভবিষ্যৎ’।
কুমিল্লার বিভিন্ন ইটভাটায় বছরের বড় একটা সময় জুড়ে চলে শিশুশ্রমের মহাযজ্ঞ। এ যজ্ঞের আগুনে প্রতিনিয়ত পুড়ছে হাজারো শিশুর ভবিষ্যৎ। ইটভাটার মালিকরা কম মজুরিতে বেশি কাজ করিয়ে নেয়ার লোভে শিশুদেরই ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজে জড়াচ্ছেন।

জেলার বরুড়া, চৌদ্দগ্রাম ও সদর দক্ষিণ উপজেলার বেশ কয়েকটি ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, দুপুরে কড়া রোদের মধ্যে কাজ করছে শিশুরা। সবারই বয়স ৮ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। জীবন-জীবিকার তাগিদে কেউ এসেছে মা-বাবার সঙ্গে, কেউ শ্রমিক সরদারের সঙ্গে। এসব শিশুদের দিয়ে ইটভাটার উত্তপ্ত চুলার কয়লার লোড-আনলোডের কাজ করাচ্ছেন মালিকরা। তেমনি একটি ইটভাটা হলো সদর দক্ষিণ উপজেলার মেসার্স আশরাফ অ্যান্ড ব্রিকস।
মেসার্স আশরাফ অ্যান্ড ব্রিকসে কাজ করা ১১ বছর বয়সী নাহিদ বলেন, ছয় মাসের কাজের চুক্তিতে এসেছি। চুক্তি ফুরালে বাড়ি চলে যাবো। পড়ালেখা করে কি লাভ। ভাত দেবো কে। বাবা মারা গেছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নিলুফা আক্তার বলেন, প্রতিটি ইটভাটায় কর্মরত শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। ইটভাটায় দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে শিশুদের ত্বক ও নখ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা, অ্যাজমা, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
কুমিল্লা পরিবেশ অধিদফতরের কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ইটভাটার সংখ্যা ২৯১টি। প্রতিটি ইটভাটাতেই শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে শিশুরা। এছাড়া জেলার সব ইটভাটার জিগজ্যাগ পদ্ধতি রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজে শিশুদের নিযুক্ত করার বিষয়ে কুমিল্লার ইটভাটা সমিতির সভাপতি এমরান হোসেন বলেন, অধিকাংশ ইটভাটাতেই শিশু শ্রমিক নেই। তবে নিজেদের বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে আসে কিছু শিশু। এক্ষেত্রে তাদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় না।
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, আমরা কুমিল্লা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের কাছে জেলার শিশুশ্রমিকদের তালিকা চেয়েছি। তারা আমাদের এখনো তালিকা দেয়নি। তবে শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া কয়েকটি ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।