সন্তানের মুখ দেখতে পেল না আল্লাহ রে...
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ইব্রাহিমের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি যশোরের বাঘারপাড়া নরসিংহপুর গ্রামে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে কান্নার রোল ওঠে নিহতের বাড়িতে।
সোমবার ভোরের নীরবতা ভেঙে কান্নার শব্দ ছাপিয়ে যায় বাড়ি থেকে পাড়ায়, পাড়া থেকে গ্রামে। কয়েক শ মাইল দূরে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জীবন দেওয়া সন্তানের শেষ বিদায় বেলাতে কাছে পেয়েও স্বভাবসুলভভাবে তাকে ছুঁতে পারেননি বাবা আবুল কাশেম মুন্সি ও মা দুলাপি বেগমসহ তাদের স্বজনেরা। কেননা তাদের ছেলে ইব্রাহিমের সুঠাম দেহ যে অর্ধপোড়া। তাই দাফনের আগ পর্যন্ত ফ্রিজিং গাড়িতেই রাখা হয় ইব্রাহিমের লাশ।
গাড়ির গ্লাসের বাইরে থেকেই তাদের দেখতে হয়েছে প্রাণপ্রিয় সন্তানের মুখটি।
বারবার মূর্ছা যেতে যেতে মা দুলাপি বেগম বলেন, ‘আমি কাকে নিয়ে বাঁচব। ওর ঘরে যে পোয়াতি বউ রয়েছে। প্রথম বাপ হবে আমার ইব্রাহিম। সন্তানের মুখ দেখতে পেল না আল্লাহ রে...।’ পাশেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলেন বাবা অবসরপ্রাপ্ত মাদরাসা শিক্ষক আবুল কাশেম।
সকাল ১০টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্হানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্হিত ছিলেন।
ইব্রাহিমের মৃতু্যর খবরে গত দুই দিন ধরে প্রতিবেশী ও আশপাশের কয়েক গ্রামের লোকজন তাদের বাড়িতে ভিড় করছেন। জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে স্ত্রী মুন্নি খাতুন যেন বাক্রুদ্ধ হয়ে গেছেন। ভাইবোনসহ স্বজনদের ক্ষণে ক্ষণে গগনবিদারী আহাজারিতে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। বাড়ির ভেতরের বারান্দায় প্রতিবেশী নারীরা নিহত ইব্রাহিমের ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মুন্নি খাতুনকে সান্তনা দিচ্ছেন।
মুন্নির বড় বোন রেহেনা খাতুন বলেন, আগামী ২৮ জুলাই মুন্নীর সন্তান ভূমিষ্ঠের সম্ভাব্য দিন। শনিবার রাত ৯টায় ইব্রাহিমের সঙ্গে তার মা ও স্ত্রীর শেষ কথা হয়। কোরবানির ঈদে বাড়ি এসে সন্তানের মুখ দেখতে চেয়েছিল ইব্রাহিম। একই সঙ্গে সন্তান ও মুন্নিকে চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমার বোনজামাইয়ের সেই আশা আর পূরণ হলো না।
ইব্রাহিম প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এক্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের শিপিং সহকারী পদে চাকরি করতেন। একই প্রতিষ্ঠানের অন্য শাখায় কাজ করেন তার খালাতো ভাই নাজমুল হোসেন।
তিনি বলেন, ৪ জুন রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে ইব্রাহিম আগুনে দগ্ধ হয়। তার আগে সে বাড়িতে মা, বাবা ও স্ত্রীসহ অন্য স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। তার মাথার পেছনে ও পেটে আঘাত ও আগুন লাগে। মুখ, টি-শার্ট ও মোবাইল ফোন দেখে তাকে শনাক্ত করি। উদ্ধারের সময় তার ফোনটি সচল ছিল।
আরেক খালাতো ভাই শিমুল হোসেন বলেন, ‘শনিবার রাতে অনেকের মতো ইব্রাহিমও অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও ফেসবুকে লাইভ করছিলেন। কিছু সময় পর হঠাৎ ডিপোর কনটেইনারগুলোতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করে তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে লাশ পাওয়া যায়।