চশমা ছাড়াই পত্রিকা পড়েন শতবর্ষী মধুসুধন পাল
মধুসুদন পাল শতবর্ষী হওয়া সত্বেও তিনি নিয়মিত চশমা ছাড়াই পড়ছেন দৈনিক পত্রিকা। পড়ছেন ধর্মীয় গ্রন্থ, আর বিভিন্ন গল্পের বই।
তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের রাধানগর এলাকার বাসিন্দা ও মৃত বঙ্ক বিহারী পালের পুত্র। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বর্তমানে তার বয়স ১০৪ বছর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, পাক-ভারত বিভক্তি বা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সব ইতিহাসই রয়েছে মুখস্থ দীর্ঘদেহী এই মানুষটির। এসব যুদ্ধ তার স্মৃতিতে এখনো অমলিন। তার দেখা ওইসব কিছু যেন এক মুহূর্তে বলে দিচ্ছেন।
এ উপজেলার মধ্যে তিনি নিজেকে সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ হিসেবে দাবি করেন। এই মানুষটির আদি বাড়ি সদর উপজেলার বাসুদেব ইউপির ঘাটিয়ারা গ্রামে হলেও দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছর ধরে তিনি রাধানগর এলাকায় বসবাস করে আসছেন। জীবনের বাকি সময়টুকুও তিনি রাধানগর এলাকাতেই কাটাতে চান।

৬ ছেলে, ৩ মেয়েসহ ৯ সন্তানের বাবা মধুসুদন পাল। অবশ্য গত ৩০ বছর আগে তার স্ত্রী ও ১২ আগে তার বড় ছেলে মারা গেছেন। তবে তার বয়স অনেক হলেও নিজেই চলতে পারেন। কারো সাহায্য লাগে না। প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল বেলা হাঁটা, হাট বাজার করা এবং ছেলের দোকানে বসে সাহায্য করছেন।
পাশাপাশি নিয়মিত খালি চোখে চশমা ছাড়া দৈনিক পত্রিকা, ধর্মীয় গ্রন্থ, আর বিভিন্ন গল্পের বই পড়ছেন। এখনও চশমা ছাড়াই সবকিছু ভালোভাবে দেখতে পান শতবর্ষী এই মানুষটি। এখন তিনি পৌর শহরে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। দূরদূরান্তসহ আত্মীয় স্বজনরা তাকে দেখতে আসছেন। তিনি পৌর শহরের দেবগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তৎকালীন সময় এসএসসি পাস করেছেন বলে জানান।
মধুসুদন পাল বলেন, বাসা থেকে কোথাও বের হলে আমার সঙ্গে কোনো লোকজন লাগে না। এখনও একা একা হাঁটাচলা করতে পারি। এতে কোনো প্রকার সমস্যা হয় না। এই বয়সে একজন মানুষের শরীর স্বাস্থ্য যতটুকু থাকার কথা তার চাইতে বেশ ভালো আছি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ১০৪ বছরের দীর্ঘদেহী এই মানুষটি একা একা হাঁটাচলা করছেন। শৈশব থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত অনেক স্মৃতি তার কাছে অমলিন। ভাষা আন্দোলন, পাক-ভারত বিভক্তি বা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-সবই মনে আছে তার। যদিও সবকিছু পুরোপুরি বলতে পারছেন না। তবে সব কিছুই যে চোখের সামনে হয়েছে তার স্পষ্ট ছাপ ছিল তার চোখেমুখে।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছে থাকলেও সাহস করে যেতে পারিনি। পরিবারের প্রতি খুব টান থাকায় সংসার ছেড়ে কোথাও যাইনি। যুবক বয়স থেকে তিনি আবাদি জমির ধানের ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত, নদী ও খাল বিল থেকে দেশি মাছ, বাড়িতে পালিত হাঁস-মুরগির মাংস, দুধ, দেশি মুরগি ও হাঁসের ডিম, খাঁটি সরিষার তেল, নিজের উৎপাদিত বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি ও প্রচুর ফল মূল খেয়ে আসছেন। এই বয়সে বড় ধরনের কোনো রোগ-ব্যাধি তার হয়নি।
তিনি বলেন, বয়স অনেক হলেও স্পষ্টভাবে এখনও পত্রিকা এবং বই পড়তে পারেন। ছোট বেলা থেকেই পত্রিকা পড়ছি। এটা একটা নেশায় পরিণত হয়ে গেছে। পত্রিকা না পড়তে পারলে ভালো লাগে না। সেই সঙ্গে আগেরকার দিনে রাতে কুপি জ্বালিয়ে পড়াশুনার স্মৃতি তিনি ভোলেননি আজও।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান এই সময়ে আমি অনেক ভালো আছি। সৃষ্টিকর্তা আমাকে অনেক সুস্থ রেখেছেন। পরিবারে নাতি-নাতনিসহ অনেক সদস্য রয়েছে । সবার সঙ্গে গল্প গুজব করা হয়। পরিবারে কোনো কিছুর কমতি নেই । তবুও তিনি নিজের কাজ নিজে করতে অনেকটাই যেন স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।
মদুসুদন পালের নাতি সাংবাদিক বিশ্বজিৎ পাল বাবু জানান, বর্তমানে তার দাদার ১০৪ বছর হলে বড় ধরনের কোনো রোগ নেই। তিনি সব সময় নিয়ম মেনে চলাচল করেন। পত্রিকাসহ বিভিন্ন বই পড়ার প্রতি ছোট বেলা থেকেই অভ্যাস রয়েছে। চশমা ছাড়াই পড়তে পাড়েন সব কিছু। নিয়মিত শুধু প্রেসারের ওষুধ খাচ্ছেন। তাছাড়া মাঝে মধ্যে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খান। নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে ডাক্তার দেখানো হয়।
ডাক্তার কাজী মাজহারুল ইসলাম জানান, সুস্থ থাকতে হলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে। একজন মানুষকে সঠিক খাদ্যাভাসই পারে সুস্থ রাখতে। শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও সঠিক ওজন বজায় থাকলে বেশি বয়সেও ভালো থাকা যায়। বয়স বাড়লে লোহিত রক্তকণিকা মস্তিস্ক শুস্ক রাখা জরুরি। এ সময় দুধ, দুধের তৈরি খাবার, মাছ, মাংস ফলমূল বেশি বেশি খেতে হয়। তাছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক সময় বিশ্রামে যাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শে চলাচল করলে ভালো থাকা যায় ।
আখাউড়া প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সহ-সভাপতি মুসলেহ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, এ এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ হলেন মধুসুদন পাল। তার বয়সী আর কেউ বেঁচে নেই। তিনি এখনও নিজে নিজে চলা ফেরা করতে পারেন। এই সব প্রবীণ ব্যক্তি দেশ ও জাতির সম্পদ। তাদের অবহেলা করা যাবে না। নতুন প্রজন্মরা এসব লোকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখার রয়েছে।