ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

‘দামি’ ইলিশে ঠক, নেই স্বাদ

শাকের মোহাম্মদ রাসেল, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশিত: ১৫:২৪, ২৮ জানুয়ারি ২০২২
‘দামি’ ইলিশে ঠক, নেই স্বাদ
ইলিশে সয়লাব বাজার

ইলিশ মাছ খেতে কে না পছন্দ করে! আর তা যদি হয় পদ্মা কিংবা মেঘনার, তাহলে তো কথাই নেই। তবে এখন ইলিশ নিয়েও চলছে প্রতারণা। ক্রেতারা নদীর মাছ কিনলেও পাচ্ছেন সাগরের। ফলে স্বাদেরও ভিন্নতা দেখা দেয় ইলিশের। তবু হরহামেশাই ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন উপজেলার মাছ ব্যবসায়ীরা।

এ জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারে প্রতিদিন শত-মণ ইলিশ মাছ ওঠে। বাজারে প্রচুর ইলিশ এলেও স্বাদ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ক্রেতারা। তবে এসব ইলিশ পদ্মা-মেঘনা নদীর বলেই দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দাম দিয়ে ইলিশ মাছ কিনলেও স্বাদে ঠকছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক ক্রেতা।

গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে প্রচুর ইলিশ থাকলেও দাম তেমন কমেনি। তবু খুশি ক্রেতা-বিক্রেতারা। তবে অতিরিক্ত ইলিশ আসায় বাজারে ঢুকে পড়েছে আরেকটি জাত। আর এ জাত দেখে চেনারও উপায় নেই। ফলে প্রতারিত হচ্ছেন অনেকেই।

এক কেজি ওজনের ইলিশ ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি হয়

জানা গেছে, এ বছর হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ঢালচর, নিঝুমদ্বীপ, চরফ্যাশন ও ভোলা থেকে লক্ষ্মীপুরে সবচেয়ে বেশি ইলিশ আসছে। ইলিশবোঝাই নৌকা হাতিয়া ও এর আশপাশের সমুদ্র এলাকা থেকে নদীপথে লক্ষ্মীপুরের আলেকজান্ডার, রামগতি এবং মতিরহাটে আসতে সময় লাগে তিন-চার ঘণ্টা। এতে ইলিশ ব্যবসায়ীরা বেশি দাম পেলেও স্বাদে ঠকছেন ক্রেতারা।

জেলায় ইলিশ বিক্রির ঘাটের মধ্যে রয়েছে- কমলনগরের মতিরহাট, তালতলী, বাতিরঘাট, কটরিয়াঘাট, লুধুয়া-ফলকন, রামগতির আদালত ঘাট, রামগতি ঘাট, গাবতলী ঘাট, সেন্ট্রার খাল, টাংকিবাজার ঘাট, সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট, বুড়িরঘাট ও রায়পুরের হাজীমারা, নতুন ব্রিজ, পানির ঘাট, বালুরচর, মেঘনার বাজার, পুরান বেড়ি, বেড়ির মাথা, হাজিমারা, মেঘনাঘাট।

ঘাট ব্যবসায়ীরা জানান, ১৫-২০ দিন পর্যন্ত বরফে থাকে সাগরের ইলিশ। আর এ ইলিশ তুলনামূলক কম স্বাদ। এছাড়া এক ধরনের গন্ধও রয়েছে। তবে মেঘনা নদীর ইলিশ টাটকা ও বেশি স্বাদ। কিন্তু রং এক হওয়ায় অনেক ক্রেতারা নদীর ইলিশ চিনতে পারেন না। এ সুযোগে মেঘনার বলে সাগরের ইলিশ বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। 

কমলনগর উপজেলার মতিরহাট মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নোঙর করা বেশিরভাগ নৌকাই হাতিয়ার। তারা হাতিয়া ও সন্দ্বীপের সাগর থেকে মাসব্যাপী মাছ ধরে ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে এসে এসব নদীঘাটে বেশি দামে ইলিশ বিক্রি করছেন।

প্রতি বাজারেই উঠছে ইলিশ

মতিরহাটে ইলিশ মাছ কিনতে আসা ঢাকার ব্যবসায়ী মনির জানান, স্বাদ ভালো হওয়ায় লক্ষ্মীপুরের মেঘনার ইলিশের দামও বেশি। এক কেজি ওজনের ইলিশ ৮০০-৯০০ টাকায় বিক্রি হয়। আর হাতিয়ার সমুদ্রের ইলিশ প্রতি কেজি ৬শ’-৭শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাঝারি সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই সাইজের সমুদ্রের ইলিশ প্রতি কেজি ৩০০-৪০০ টাকা।

সরকারের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ বিষয়ক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, ইলিশ সারা বছর সাগরে থাকে। শুধু ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে। নদীর ইলিশ একটু বেঁটেখাটো হবে, আর সাগরের ইলিশ হবে সরু ও লম্বা। সেই সঙ্গে নদীর ইলিশ বিশেষ করে পদ্মা ও মেঘনার ইলিশ একটু বেশি উজ্জ্বল। নদীর ইলিশ চকচকে বেশি হবে, বেশি রুপালি হবে। সাগরের ইলিশ তুলনামূলক কম উজ্জ্বল।

এছাড়া পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার ইলিশ মাছের আকার হবে পটলের মতো অর্থাৎ মাথা আর লেজ সরু আর পেটটা মোটা হতে হবে। এক্ষেত্রে লেজের একটু উপর থেকেই মাছটা গোল হতে শুরু করবে। নদী আর সাগরের ইলিশ মাছের আসল পার্থক্য বোঝা যাবে খাওয়ার সময়।

সাগর থেকে ইলিশ যখন ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে, মানে উজানে আসে তখন নদীর যে প্ল্যাংটন বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী খায় ইলিশ মাছ তার কারণে তার শরীর বেঁটে ও মোটা হয়। এ খাবারের কারণেই ইলিশের শরীরে এক ধরনের চর্বি জমে, যা তার আকৃতিকে সাগরের ইলিশের চেয়ে আলাদা করে।

খাদ্য বিষয়ক লেখক ও গবেষক শওকত ওসমান বলেন, ইলিশ মাছ আকারে যত বড় হবে, তত বেশি স্বাদ হয়। আকারে বড় ইলিশকে অনেকে পাকা ইলিশ বলে অভিহিত করেন। সমুদ্র থেকে ইলিশ নদীতে ঢোকার পর নদীর উজানে মানে স্রোতের বিপরীতে যখন চলে, সেসময় এদের শরীরে চর্বি জমা হয়। এ চর্বির জন্যই ইলিশের স্বাদ হয়। বর্ষাকালে পাওয়া ইলিশের স্বাদ বেশি হয়। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!