১৩ বছর ড্রেনের স্লাবে কাটানোর পর ঠাঁই খুঁজে পেলেন আনু বেগম
শুধু নিজের নাম ছাড়া আর কিছুই বলতে পারেন না তিনি। ঝড়, বৃষ্টি, রোদ যত কিছুই হোক না কেন ওই জায়গা থেকে অন্য কোথাও যাননি তিনি। তিনি কখনো কাউকে বিরক্ত করেন না এবং হাত পেতে ভিক্ষাও করেন না।
তিনি হলেন আনু বেগম। জীবনের ১৩ বছরের বেশি সময় ড্রেনের স্লাভের ওপর পার করেছেন। আশপাশের বাসাবাড়ি থেকে যে যা দেয় তা খেয়েই জীবন চলে আনু বেগমের।
ময়মনসিংহ শহরের সেনবাড়ী রোডের স্লাভের ওপর থাকেন তিনি। নগরীর সেনবাড়ী সড়ক দিয়ে চলাচলকারী প্রায় সবাই তাকে দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছে একই অবস্থায়।
আরো পড়ুন: অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন দুই কলেজছাত্র
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আনু বেগম সারাদিন একা এক জায়গায় বসে থাকতেন এবং আনমনে একা একা কথা বলেন আর মাঝে মাঝে উপরের দিকে তাকিয়ে হাসেন। তার কথার ভাষা এবং হাসির রহস্য একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই বোঝেন। ড্রেনের উপর এত বছর রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে থাকলেও কখনো তাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখেনি কেউ। দীর্ঘ একযুগ পর আনু বেগম নজরে আসেন মানবিক কয়েকজন মানুষের। যার ফলে শেষ বয়সে ঠাঁই হয়েছে একটি বৃদ্ধাশ্রমে।
ময়মনসিংহ ডিভিশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুমী সরকার জানান, এত বছর একটি মানুষ এক জায়গায় খেয়ে না খেয়ে থেকেছেন কিভাবে! নিশ্চয় আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন। অবাক করার বিষয় হচ্ছে তাকে সবসময় শত কষ্টের মাঝেও হাসিমুখে দেখা গেছে। এই অবস্থায় আনু বেগমকে আমি ও ফ্লোরেন্স কলেজের প্রভাষক আলমাস হোসেন সাজু রাস্তার ড্রেনের উপর দেখতে পেয়ে ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রমে’ জানানোর পর রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে তাকে বৃদ্ধাশ্রমে নেয়া হয়। পরে তাকে গোসল করিয়ে খাবার খাইয়ে দেন তারা। এখন দেখলে চেনার উপায় নেই তিনিই রাস্তার ওপর থাকা সেই বৃদ্ধা। আসলে মানুষকে যত্নে রাখলেই দেখতে ভালো লাগে।
স্থানীয় ফ্লোরেন্স কলেজের প্রভাষক আলমাস হোসেন সাজু জানান, অসহায় বৃদ্ধা মহিলার চুলগুলো জটপাকানো ছিল। কখনো শরীরেরই যত্ন হয়নি আবার চুলের যত্ন! যখন তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম খুব কষ্ট লেগেছিল। হায়রে মানুষের জীবন। কেউ থাকে সাতলায় আর কেউ ড্রেনের উপর। কোটি টাকার মালিকদের রোগে ছাড়ে না, আর এক যুগের বেশি সময় রাস্তায় থাকার পরও ভালো আছেন আনু বেগম।
আরো পড়ুন: করোনায়ও দমেননি ময়মনসিংহ সিটি মেয়র
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের ভালুকার সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক আব্দুল মালেক বলেন, অসহায় আনু বেগমের বিষয়টি ময়মনসিংহ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আসাদুজ্জামান সাহেব প্রথমে আমাকে জানান। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষভাবে খোঁজ খবর নিয়ে আমাকে সম্পূর্ণ বিষয়টি খুলে বলেন অধ্যক্ষ সুমী সরকার এবং প্রভাষক আলমাস হোসেন সাজু। এরপরই আমার সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রমে এই অসহায়কে বৃদ্ধা মা’কে নিয়ে আসি।
তিনি জানান, অসহায় আনু বেগমকে বৃদ্ধশ্রমে আনার পর গোসল করিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। চুলগুলো জটপাকানো ছিলো, তাই চুল কেটে মাথায় তেল দেয়া হয়েছে। খাবার খাইয়ে দেয়া হয়েছে। তার শরীর দেখেই বোঝা যায় অনেক কষ্টে দিন কেটেছে। এ নিয়ে ১৪ জন অসহায় আমার বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয়ে আছেন। তাদেরকে সবসময় সেবা দেয়ার জন্য লোক রয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য। আমার বৃদ্ধাশ্রমেই চলবে আনু বেগমের চিকিৎসা ও সেবা। এরপর তার মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হলে খোঁজ করা হবে তার ঠিকানা এবং আত্মীয় স্বজনদের।