মুম্বাাই পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার ছিলেন ডি শিবনন্দন তার ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ঘটনার পরের দিন ছিল বড়দিন। আমি ক্রাফোর্ড মার্কেটে মুম্বাই পুলিশের হেডকোয়াটার্সে ছিলাম। প্রায় ১১টা বাজে। মহারাষ্ট্র ক্যাডারের আইপিএস হেমন্ত কারকারে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এরপর তাকে গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর মুম্বাই অফিসে পোস্ট করা হয়। হেমন্ত কারকারে আমাকে বলেন, ‘র’ একটি ফোন নম্বর পেয়েছে যেটির লোকেশন মুম্বাইতে এবং সেই ফোন থেকে পাকিস্তানের একটি নম্বরে অনবরত কল করা হচ্ছে। হেমন্ত কারকারে আমাকে সেই ফোন নম্বর দিতেই আমি কাজ শুরু করি।
এ বিষয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কারকারে। ফোন নম্বর পেয়েই একাধিক টিম গড়া হয়। আরও তথ্য পেতে সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছে টিম পাঠানো হয়। অন্য দলকে ওই নম্বরের উপর নজর রাখতে বলা হয়। কল যিনি করছেন তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয় আরেকটি টিমকে। পুলিশ জানতে পারে নম্বরটি জুহু ও মালাডের মধ্যকার। টাওয়ার সিগন্যাল ছিল ওই এলাকায়। জনাকীর্ণ এলাকা হওয়ায় সেই সময় পুলিশকে বিশেষ কৌশল নিতে হয়।
.png)
কীভাবে রহস্যভেদ?
ক্রাইম ব্রাঞ্চ টানা তিন দিন ফোন ট্র্যাপ করেও সঠিক তথ্য পায়নি। ভারত সরকার ছাড়াও বিশ্বের অনেক দেশেরই নজর ছিল ঘটনার দিকে। একটা বিষয় পুলিশ লক্ষ্য করে, সব কলে গবাদি পশুর আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। এটি হয়ে ওঠে পুলিশের কাছে অন্যতম ক্লু। পুরো এলাকা তল্লাশি চালালেও কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ।
২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যত খালি হাতেই পুলিশকে বসে থাকতে হয়। তখন সন্ধ্যা ৬টা। মোবাইল নম্বর যে টিম পর্যবেক্ষণ করছিল, তারা ফোন চালু করার একটা অ্যালার্ট পান মুম্বাই থেকে। ওই ব্যক্তি তার পাকিস্তানি হ্যান্ডেলারকে জানায় তার টাকা ফুরিয়ে গিয়েছে। শিবনন্দন জানান ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে বলা হয় তাকে। এটা ক্লু হয়ে ওঠে পুলিশের কাছে।

প্রায় ৪৫ মিনিট পর ফোন আসে। ফোন যিনি করছেন তিনি একটি সংগঠনের সদস্য ছিলেন। তিনি মুম্বাাইয়ে উপস্থিত ব্যক্তির ঠিকানা জানতে চাইলেন তিনি যোগেশ্বরী পূর্বের এক ঠিকানা দেন। সেই সদস্য তাকে জানায় এক লাখ টাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাওলার মাধ্যমে টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে। ওই ব্যক্তিকে রাত ১০ টায় মুম্বাাইয়ে মোহাম্মদ আলি রোডে অবস্থিত শালিমার হোটেলে যেতে বলা হয়। নীল জিন্স আর ডোরা কাটা জামা পরা এক ব্যক্তি তাকে টাকা দেবে বলেও জানানো হয়। এরপরই ফোন কেটে দেওয়া হয়।
তৎপর হয়ে ওঠেন ক্রাইম ব্রাঞ্চের আধিকারিকরা। হোটেলের চারপাশে সাদা পোশাকে পুলিশ তার পজিশন নেয়। কেউ টাকা নিতে এলে তাকে ওয়াচ করা হবে বলেই ঠিক করে পুলিশ। তবে এটাও ঠিক হয় সেখানে তাকে ধরা হবে না। মোট ৬টা টিম অপারেশনে নামে। রাত ১০টা নাগাদ সেখানে এক ব্যক্তি আসেন। তার পরনে ছিল নীল জিন্স ডোরাকাটা শার্ট। কিছুসময় হোটেলে থাকার পর নীল জিন্স পরা ব্যক্তি দক্ষিণ মুম্বাাইয়ে ট্যাক্সি নিয়ে চলে যান। কিছুসময় পর যে টাকা নিতে আসে সেও ট্যাক্সি ধরেন। তাকে ধাওয়া করা শুরু করে পুলিশ।
ট্রেনে ওঠার পর...
মুম্বাই সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। ট্রেনে ওঠার পরও ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসাররা তাকে ফলো করতে থাকেন। যোগেশ্বরীতে পৌঁছালে ট্রেন থেকে তিনি নেমে যান ওই ব্যক্তি। এরপর তিনি একটি অটোতে ওঠেন। বশিরবাগ এলাকায় ওই ব্যক্তি নামেন ঘন বস্তির ভেতরে যেতে শুরু করেন তিনি। এরপর তিনি বস্তির একটি ঘরে ঢোকেন। অপর একজন দরজা বন্ধ করে দেন। সাদা পোশাকে টানা দু-দিন তার উপর নজরদারি চালায় পুলিশ।
সবুজ সংকেত পেয়েই মুম্বাই পুলিশের কমান্ডো ও ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসাররা ঘটনাস্থলে হানা দেয়। সব কিছু এত নিখুঁতভাবে করা হয়েছিল যে হাইজ্যাকার গ্রুপের সদস্যরা টের পায়নি। গোলাপ সিং বাহাদুর মান, রফিক মহম্মদ, আব্দুল লতিফ আদানি প্যাটেল ও মুস্তাক আহমেদ আজমিকে গ্রেফতার করে। উদ্ধার হয় দুটি এ কে ৫৬ , অ্যাসলট রাইফেল, হ্যাণ্ড গ্রেনেড, ৬টি পিস্তল, ১ লাখ ৭২ হাজার রুপি। মুম্বাাইয়ে বড় ধরনের হামলা চালানোর প্ল্যান ছিল তাদের। তাদের কাছে থেকে উদ্ধার হয় বাল ঠাকরের বাংলো মাতোশ্রীর মানচিত্র। এরপর যোগেশ্বরী ও মালাডের দুটি জায়গায় অভিযান চালিয়ে এক নেপালি দম্পতিকে ধরা হয়। তাদের থেকেও উদ্ধার করা হয় হ্যান্ড গ্রেনেড, ২-৩টি পিস্তল, ১০ হাজার মার্কিন ডলার। পুলিশ জানতে পারে যে ব্যক্তি টাকা সংগ্রহ করতে ও ফোন করছিলেন তার নাম আব্দুল প্যাটেল। তিনি ছিলেন গোটা চক্রান্তের মাথা।
কান্দাহার বিমান ছিনতাই নিয়ে সারা বিশ্বে তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল। মুম্বাই পুলিশের এই পদক্ষেপ তাতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে ধরা পড়া মহম্মদ আসিফ ওরফে বাব্লু ও রফিক আহমেদ ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক। গোপাল সিং মানছিলেন নেপালি নাগরিক। অন্যরা কাশ্মীর ভিত্তিক হরকাত উল আনসুর সদস্য ছিলেন।