ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

তাজমহলের শ্রমিকদের হাত সত্যিই কেটে নিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান?

সাতরং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:২৮, ১০ জুলাই ২০২৩
তাজমহলের শ্রমিকদের হাত সত্যিই কেটে নিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান?
ছবি: সংগৃহীত

‘পূর্ণিমার রাতে তাজমহলের সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এ যেন কালের কপোল তলে একবিন্দু নয়নের জল।’

তাজমহলের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে এমন উপমাই দিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে সত্যি কথা বলতে কী, যতই বর্ণনা শুনু না কেন তাজমহল প্রকৃতপক্ষে কতটা সুন্দর তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। বিশ্বের এই সপ্তমাশ্চর্যকে একবার চোখের দেখা দেখতে হাজার হাজার বিদেশি ভিড় করেন ভারতে। দিনের বেলা হোক বা পূর্ণিমার রাত একেক সময় তাজের সৌন্দর্য একেক রকম। সেই সেকাল থেকে শুরু করে একাল তাজমহলের সামনে গিয়ে ছবি তোলার লোভ পর্যটকরা সামলাতে পারেন না।

আগ্রার এই প্রাচীন স্মৃতিসৌধের নির্মাতা মুঘল সম্রাট শাহজাহান স্বয়ং। তার নির্দেশেই প্রয়াত স্ত্রী মুমতাজের স্মৃতিতে এই সৌধ নির্মিত হয়। কেউ বলেন স্ত্রীর প্রতি সম্রাটের ভালোবাসার নিদর্শন এই মহল। কারো মতে অত্যাচারিত স্ত্রীর মৃত্যুর পর অনুশোচনার জেরে এই মহল নির্মাণ করেন সম্রাট। এসব নিয়ে নানা মুনির নানা মত। শ্বেত পাথরের তৈরি এই স্মৃতি সৌধের আনাচ কানাচে লুকিয়ে রয়েছে নানা তথ্য, নানা রহস্য, নানা অজানা ইতিহাসের কথা।

Advertisement

লোকমুখে শোনা যায়, সম্রাট শাহজাহান নাকি তাজমহল তৈরি করা ২০ হাজার শিল্পী-শ্রমিকের হাত (মতান্তরে হাতের আঙুল) কেটে নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, যাতে ওই সৃষ্টি-নিপুণ আঙুলগুলো আরেকটা তাজমহল বানানোর ‘সাহস’ না দেখাতে পারে। এমনটা শুনলেই শিউরে উঠবেন যে কোনো চেতনাসম্পন্ন মানুষ। চোখের সামনে দেখতে পাবেন, তাজের শুভ্র অস্তিত্বের গায়ে ছিটকে এসে লাগছে রক্তের ছিটে। কেবল ছিটে নয়, হাজার হাজার অসহায় মানুষের রক্তের দীর্ঘ ধারা তারা গড়িয়ে নামতে দেখবেন তাজের মসৃণ শ্বেতপাথরের শরীর দিয়ে।

কিন্তু সত্যিই এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন শাহজাহান? আসলে ইতিহাসের সমান্তরালে বহু মিথ গড়ে ওঠে। তেমনই এক মিথ এটা। কোনো ইতিহাসবিদ এমন দাবি করেননি। এটা স্রেফ মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে কখন যেন নিজের শরীরে চাপিয়ে নিয়েছে এক মিথ্যে ইতিহাসের আবরণ। অন্তত তেমনটাই দাবি বহু ইতিহাসবিদের। অন্যদিকে উলটো মতের পক্ষে যারা, তারা কেউই তাদের মতের সপক্ষে জোরাল কোনো যুক্তি আজ পর্যন্ত পেশ করতে পারেননি।

তাজমহল

১৯৭১ সালে রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘জার্নাল অব হিস্টোরিক্যাল রিসার্চে’ও একইভাবে একে নিছক ‘মিথ’ বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। আবার তাজমহলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ঘুরে এলেও এই কাহিনির কোনো হদিশ মিলবে না। বরং ‘তাজ ট্যুরস’ নামের এক ব্লগে পাওয়া যায় এই সংক্রান্ত একটি লেখা। যেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

কী কী যুক্তি দেখানো হয়েছে সেখানে? বলা হয়েছে, প্রথমত অতজন শ্রমিকের হাত কেটে ফেলা হল, অথচ তাদের কারও কাটা হাতের কঙ্কালজাতীয় কোনো রকম প্রমাণ মিলল না? দ্বিতীয়ত, সেই সময়ে ভারত ভ্রমণে আসা কোনো পর্যটকের বিবরণ কিংবা সমসাময়িক কোনো বইয়ে কোথাও এমন কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। তৃতীয়ত, শাহজাহানের আমলকে ‘নির্মাণের স্বর্ণযুগ’ ধরা হয়। এমন নয় যে, তাজমহল ছাড়া আর কোনো স্মরণীয় স্থাপত্যকীর্তি শাহজাহানের আমলে নির্মিত হয়নি। আগ্রায় তাজমহল ছাড়াও রয়েছে মতি মসজিদ। দিল্লিতে রয়েছে জামে মসজিদ ও লালকেল্লা। পরে শাহজাহানাবাদ নামে একটা গোটা শহর গড়ে তোলেন তিনি। যদি তিনি ২০ হাজার শ্রমিকের সঙ্গে ওই কাণ্ড করতেন, তাহলে বাকি শ্রমিকরা তার নির্দেশ মানতেন না। তবে এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলাই যায়। শাহজাহানের আমল তো বটেই, গোটা মুঘল যুগেরই সবচেয়ে উজ্জ্বল স্থাপত্যের নাম তাজমহল।

এছাড়াও আরো একটা কথা বলতেই হয়। তাজগঞ্জ নামের জায়গাটির কথা আমরা সকলেই জানি। আজও পর্যটকরা ভিড় জমান সেখানে। মুঘল আমলের দুর্দান্ত সব বাগান, শ্বেতপাথরের কবরস্থান রয়েছে এখানে। এই জায়গাটি তৈরিই হয়েছিল শাহজাহানের আমলের শ্রমিক ও নির্মাণশিল্পীদের থাকার জন্য। যে মানুষ শ্রমিকদের হাত কেটে টুকরো করেন, তিনিই আবার শ্রমিকদের কথা ভেবে এমন এক গঞ্জ তৈরি করে দেবেন?

দেশ-বিদেশের সবার আকর্ষণে থাকে তাজমহল

আসলে যে কোনো গুঞ্জনের পেছনেই থাকে কোনো না কোনো কারণ। এই গুজবের পেছনেও রয়েছে। শাহজাহান তাজমহলের শ্রমিকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন অন্য কোনো সম্রাট-বাদশাহদের হয়ে কাজ না করেন। সোজা কথায়, এটা ছিল একটা চুক্তির মতো। অর্থাৎ ‘হাত কেটে নেয়া’ কথাটা আসলে একটা রূপক। ক্রমে সেই রূপক তার ভাবার্থকে ফেলে দিয়ে বাচ্যার্থ হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে।

ইতিহাসবিদ এস ইরফান হাবিব বলেছেন, ‘এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। কোনোদিন কোনো খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ বা গবেষক এমন ধরনের দাবি করেননি।’ তার মতে, গত শতকের ছয়ের দশক থেকে এটা বেশি করে ছড়াতে শুরু করে। তবে তার মতে, আজকের ভারতবর্ষে এটাকেই একটা সাম্প্রদায়িক চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। মূলত শাহজাহানকে খোঁচা দিতেই এই হাত কাটার ‘গল্প’ রটিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেই তার দাবি। সেকথাকে অস্বীকার করা যায় না। আসলে এমন নিদর্শন আরও রয়েছে। ইতিহাসকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা বহু পুরোনো। ইচ্ছেমতো তার শরীরকে বাঁকিয়ে চুরিয়ে অতিরঞ্জন কিংবা একেবারে মিথ্যা ঘটনাকে সত্যি বলে দেখানো- নতুন তো নয়। তবে এটাই আনন্দের যে, এই সব মিথের সমান্তরালে রয়েছেন ইতিহাসবিদরাও। তারা এমন সব ‘গল্প’কে ইতিহাসের শরীর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজ করে চলেন। তাদের ‘ঐতিহাসিক’ হতে দেয় না।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!