মৃত্যুর ৭৫ বছর পরও ছিলেন ধ্যানমগ্ন
মানব জাতির মধ্যে বহুকাল ধরে অনেক অবাস্তবকে বাস্তব করার স্বপ্ন দেখে চলেছে। এগুলোর মধ্যে সবথেকে বড় এবং অন্যতম একটি স্বপ্ন হলো অমরত্ব লাভ। জীবনের পুরো সময় ধরে যৌবন লাভ করা এবং অমরত্ব লাভ করার লোভ মানুষের সেই জন্মলগ্ন থেকেই রয়েছে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য অনেক কিছু স্কলার, মং সহ বিভিন্ন বিত্তবান মানুষেরা বহু বছর ধরে চেষ্টা করে আসছে।
এজন্য কেউ কেউ জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেছে, কেউ আবার ব্যয় করেছে প্রচুর পরিমাণে অর্থ এবং কেউ নিজের জীবনেও দিয়ে দিয়েছে। তবে এটা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়ে ওঠেনি এবং এটা কখনো সম্ভব কি না তা নিয়েও আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আজ জানাবো সেইসব মানুষদের ব্যাপারে যারা মৃত্যুর সঙ্গে চিটিং করতে চেয়েছিল। এরপর তাদের কি অবস্থা হয়েছিল সে সম্পর্কে।
কিন শি হুয়াং
যিনি চায়নার মহাপ্রাচীর তৈরি করার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি তার জীবদ্দশায় অনেক রাস্তাঘাট তৈরি করে গিয়েছিলেন। তিনি এতো বড় রাজা হওয়ার কারণে তার পেছনেল সব সময় শত্রু লেগে থাকতো। সে কারণেই তার জীবনের একটা ঝুঁকি ছিল। তিনি নিজেও মৃত্যুকে খুব বেশি ভয় পেতেন। তিনি কখনোই মরতে চাইতেন না। এই কারণেই তিনি অমর হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করে গেছেন।
আরো পড়ুন: নিষ্ঠুর বাবা-মা, সন্তানকে ঘরে বন্দি রেখে চালিয়েছেন নির্যাতন
অমরত্ব লাভ করার জন্য যতরকম তরল পদার্থ সে সময় পৃথিবীতে পাওয়া যেত, তিনি সেগুলোর সবগুলোই প্রায় কিনে এনেছিলেন। তিনি শিফু আইল্যান্ড নামে একটি দ্বীপে তিন বার ঘুরে এসেছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে এখানে একটি অমরত্ব লাভের পাহাড় রয়েছে। সে কারণে তিনি সে দ্বীপে জাহাজ ভরে শত শত যুবক এবং যুবতীদেরকে পাঠাতেন, সেই পাহাড়টিকে খুঁজে বের করার জন্য।
যদিও সেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসেনি। হয়তো বা তারা এ কারণেই ফিরে আসতো না, তারা যদি কিছু না নিয়ে যেতে পারে তাহলে তাদেরকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। এ কারণেই তারা হয়তো আর ফিরে আসার পরিবর্তে অন্য কোথাও পালিয়ে যেতো। এই রাজা তার বিজ্ঞানীকেও বাধ্য করেছিল এমন কিছু আবিষ্কার করতে যার মাধ্যমে সে অমরত্ব লাভ করতে পারে। তিনি তার কোনো অ্যালকেমিস্টকে অমরত্ব লাভের ওষুধ আবিষ্কার করতে না পারায় তাদেরকে মেরে ফেলেছিল। তবে জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি অমরত্ব লাভের কোনো উপায় খুঁজে পান নি। তারপর মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
ডাশি ডর্জো ইতিগিলফ
এই ব্যক্তি ১৮৫২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি তার ধর্ম তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি ১৯১১ সালে পূর্ব সাইবেরিয়ার ১২ তম হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি এই পজিশনে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন। তারপরেই ঘটে সব থেকে আশ্চর্যজনক ঘটনা, তিনি একদিন বৌদ্ধধর্মের পদ্মাসনে বসেন। তারপর তিনি তার সকল ছাত্রদেরকে ডাকেন। তাদেরকে বলে তার জন্য মৃত্যুর প্রার্থনা করতে এবং তাকে ৭৫ বছর পরে আবার জাগিয়ে তুলতে। তবে তার ছাত্ররা শিক্ষকের জন্য মৃত্যুর প্রার্থনা করতে চাচ্ছিল না।
আরো পড়ুন: নৃশংসভাবে বলি দেয়া হয় এই কুমারীকে, প্রকৃতিই তাকে করেছে মমি
তারপর তিনি ৭৫ বছরের জন্য ধ্যানে বসেন। যখন ৭৫ বছর পরে অর্থাৎ ২০০৩ সালে, তিনি যে বাক্স ভেতরের ধ্যানে বসেছিলেন সেই বাক্স খোলা হয়, তখন তাকে সেখানে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে আশ্চর্যজনকভাবে তার শরীর অক্ষত অবস্থায় ছিল। তার চামড়ায় কোনো পচন ধরে নি। এমনকি তার শরীরের ওজনেরও পরিবর্তন হয়নি। যার প্রধান কারণ হতে পারে, যে তারা সবাই শীতপ্রধান এলাকায় বসবাস করতো।
তারা বরফের ভেতর বসেই ধ্যান করতো। তবে এক্ষেত্রে দাশি-দোরঝো ইতিগিলভ একমাত্র বৌদ্ধ ছিলেন না, যিনি এরকম ধ্যানে বসেছিলেন। ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা এরকম আরো একজন সন্ন্যাসীর দেহ মঙ্গোলিয়া থেকে উদ্ধার করেন। তিনিও এই ধ্যানে বসেছিলেন। কারো কারো মতে, এই মৃতদেহটি দাশি-দোরঝো ইতিগিলভের শিক্ষকের। তিনিও এই অমরত্ব লাভের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছেন।
ডায়ান ডি পোইটিয়ার্স
ফরাসি রাজা হেনরি সেকেন্ডের স্ত্রী ছিলেন ডায়ান ডি পোইটিয়ার্স। তিনি একাধারে অত্যন্ত সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সর্বপ্রথম যখন তাদের দেখা হয়েছিল তখন রাজা হেনরীর বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর এবং ডায়ানের ৬ বছর। ফরাসী রাজা দ্বিতীয় হেনরী যখন সিংহাসনে বসলেন তখন তিনি ডায়ানের সঙ্গে সাক্ষাতে তার রূপ এবং গুণে দিশেহারা হয়ে যান।
আরো পড়ুন: স্বামীর অজান্তে একই বাড়িতে প্রেমিককে লুকিয়ে রাখেন ১৭ বছর
যে কারণে তিনি সকলের সামনে ডায়ানের প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাকে প্রিয়তমা বলে ঘোষণা করেন। আমরন বেঁচে থাকার জন্য বিজ্ঞানীদের কিছু গবেষণা রাজা হেনরী এবং ডায়ান এমনকি এক পর্যায় রাজা হেনরী ডায়ানের সকল কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে লাগলেন। ডায়ান যা বলতেন সে বিষয়কেই শির ধার্য হিসেবে ধরে নিতেন রাজা হেনরী। একদা রাজা হেনরীর স্ত্রী এই বিষয়টিকে না মানতে পেরে ডায়ানকে হত্যা করেন। সেখানেই সে সময়ের বিচক্ষণ এবং বুদ্ধিমটি নারী ডায়ানের সমাপ্তি ঘটে।
অতপর ২০০৯ সালে ফরাসি বিজ্ঞানীরা ডায়ানের সমাধি উঠিয়ে পরীক্ষা করার পরে যে তথ্য পেয়েছিল তা সত্যি অবাক করার মতো ছিল। বিজ্ঞানীরা বলেন, ডায়ান সর্বদা এক ধরণের বিশেষ পানীয় পান করতেন। যা পানের ফলে সে সময়ে মানুষের পক্ষে তাদের যৌবনকে ধরে রাখা সম্ভব ছিল। যেই পানীয়টি ছিল অনেকেটাই তরল স্বর্ণ এবং বিভিন্ন পদার্থের মিশ্রণে তৈরি। যার প্রমাণ হিসবে তারা ডায়ানের চুল এবং তার শরীরের হারে প্রচুর পরিমাণপ স্বর্নের সন্ধান পেয়ে ছিলেন বিজ্ঞানীরা। উল্লেখ্য ডায়ানকে যখন মেরে ফেলা হয়েছিল তখন তার বয়স ছিল ৫০ বছর। তবে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে সেই ৫০ বছরেও ডায়ানকে দেখে মনে হতো, তিনি একজন ২৩ বছরের নারী।
রবার্ট এথেঞ্জার
রবার্ট এথেঞ্জার ১৯১৮ সালে আটলান্টিক সিটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি পদার্থ এবং গণিতের উপরে তার পড়াশোনা শেষ করেন। রবার্ট যখন ছোট ছিলেন তখন তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি জীবিত থাকা অবস্থাতেই হয়তো কোনো এক সময়ে বিজ্ঞানীরা আজীবন বেঁচে থাকার ওষুধ অবিস্কার করে ফেলবেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রবার্ট বুঝতে পারলেন এই বিষয়টি হয়তো এখন সম্ভব নয়। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ব্যাতিক্রম এক পন্থার। ৪২ বছর বয়সে রবার্ট তৈরি করলেন মৃত্য ব্যক্তিদের বডি সংরক্ষন করার হিমাগার।
আরো পড়ুন: বাংলার ‘মোগলি’, যার কাহিনী কাঁদায় বিশ্ববাসীকে
এর জন্য তিনি যুক্তি দেখালেন হয়তো এখন বিজ্ঞানীরা আজীবন জীবিত থাকার ওষুধ আবিস্কার করতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু ভবিষ্যতে যে পারবে না সে বিষয়টি কিন্তু কেউ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবে না। তাই তিনি মানুষের মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখতে চাইলেন যেন ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে বিজ্ঞানীরা সেগুলোকে আবার জীবিত করতে পারেন। যদিও রবার্ট বিখ্যাত হন তার লেখা বই “দ্য প্রোস্পেক্ট অফ ইম্মোর্টালিটি” লেখার মাধ্যমে।
সে সময়ে এই বইটি লেখার পরে রবার্ট বেশ আলোড়ন তৈরি করেন। এবং পরবর্তীতে তার ডাকে সারা দিয়ে অনেকেই তাদের মৃত্যুর পরে নিজের শরীরকে হিমাগারে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। অতঃপর ১৯৭৬ সালে রবার্ট ক্রায়নিক্স ইন্সটিটিউট নামে একটি সংস্থার সন্ধান পান। যারা কিনা মৃত মানুষের লাশ সংরক্ষণ করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে। যদিও এই আইডিয়াটি তাদের জন্য তেমন কোনো কষ্টের ব্যাপার ছিল না। ক্রায়নিক্স ইন্সটিটিউটে মৃত মানুষের শরীরকে সরক্ষণ করার জন্য প্রথমে তার উপরে কিছু ওষুধ মাখানো হয় এবং এরপর সেই মৃতদেহকে প্রায় মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এক থেকে দুই দিনের জন্য রাখা হয়।সর্বশেষ সেই মৃতদেহগুলোকে নাইট্রোজেন ভর্তি একটি কন্টেনারে আজীবন সংরক্ষণের জন্য রেখে দেয়া হয়।
আরো পড়ুন: বাংলার বধূর সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে করুণ ইতিহাস
বর্তমানে এই ইন্সটিটিউটে রবার্টের মা, দুই স্ত্রী, এমনকি রবার্টকেও এ হিমাগারে রাখা হয়েছে। জানা যায়, এখন পর্যন্ত ক্রায়নিক্স ইন্সটিটিউটে প্রায় ১৭০টির বেশি মৃতদেহ হিমাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়াও প্রায় দুই হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুর পরে তাদের মৃতদেহকে সংরক্ষণ করার জন্য আবেদন করেছেন। উল্লেখ্য, রবার্ট ২০১১ সালের ২৩ জুলাই ৯২ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলনে। রবার্টের মতো অনেক মানুষ বর্তমানে বিশ্বাস করেন হয়তো ভবিষ্যতে আজীবন বেঁচে থাকার ওষুধ আবিস্কার হওয়া সম্ভব।