বাংলার ‘মোগলি’, যার কাহিনী কাঁদায় বিশ্ববাসীকে

ঢাকা, সোমবার   ১৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৫ ১৪২৭,   ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বাংলার ‘মোগলি’, যার কাহিনী কাঁদায় বিশ্ববাসীকে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৩৯ ৩ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১২:৩৪ ৪ ডিসেম্বর ২০২০

ছবি: দিনা সানিচার

ছবি: দিনা সানিচার

কার্টুন বা সিনেমার জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে দ্য জাঙ্গল বুক। ছোট এক মানব শিশুর বন্য প্রাণীদের মাঝে বেড়ে ওঠা নিয়েই এর কাহিনী। ‘দ্য জাঙ্গল বুক’এর মোগলির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। বনের পশুপাখিদের সঙ্গে বড় হয়েছিল মোগলি। কয়েক বছর আগে ভারতের উত্তরপ্রদেশেও এরকম ১০-১২ বছরের একটি মেয়ে শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়। বানরের দলের সঙ্গে বন-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো শিশুটির আচরণ অনেকটাই পশুপাখিদের মতো ছিল।  

পশুদের মতো আচরণ করতো শিশুটি। চার হাত-পা দিয়ে চলাফেরা ও মুখ দিয়ে খাবার তুলে খেত সে। বাস্তবের এই মোগলিও কোনো কথা বলতে পারে না। উদ্ধার করার সময়, খাবারের অভাবে খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল তাকে। গায়ে কোনো কাপড়ও ছিল না তার। 

দিনা সানিচারতবে জানেন কি? জাঙ্গল বুকের মোগলির চরিত্র ছিল বাস্তবেও। ধারণা করা হয়, এই গল্পের চরিত্রটি ধারণা রুডইয়ার্ড কিপলিং পেয়েছিলেন বাস্তবের মোগলিকে দেখেই। ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর 'দ্য জাঙ্গল বুক' বইটি। আর সেই গল্প সংগ্রহের মধ্যে থাকা মোগলি চরিত্রটি অবাক করেছিল সারা পৃথিবীর মানুষকেই। জঙ্গলে একদল পশুপাখির ছত্রছায়ায় মানুষ হয়েছে সেই ছেলেটি। আর এই বই প্রকাশিত হওয়ার ঠিক পরের বছরেই ঘটে যায় একটি মৃত্যু। মৃতের নাম দিনা সানিচার।  

আরো পড়ুন: বাংলার বধূর সিরিয়াল কিলার হয়ে ওঠার পেছনে করুণ ইতিহাস

আপাত দৃষ্টিতে এই দুই ঘটনার কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে এই দিনা সানিচার আসলে লেখকের মোগলি চরিত্রটির অনুপ্রেরণা! চলুন সেই বাস্তব মোগলির জীবনের খানিকটা জেনে নেয়া যাক।

 দি জঙ্গল বুক সিনেমার মোগলি  সালটা ১৮৬৭। উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহর জেলার একটি জঙ্গলে অদ্ভুত জানোয়ারের সন্ধান পান গ্রামবাসীরা। আর তার পিছনে ধাওয়া করেই পৌঁছে যান একটি গুহার কাছে। কিন্তু ধোঁয়ার সাহায্যে সেই গুহা থেকে যখন প্রাণীটিকে বের করে আনা হল, তখন অবাক হলেন প্রত্যেকেই। কারণ প্রাণীটা অন্য কিছু নয়, একটি মানুষ। বছর ছয়েকের একটি বালক। অথচ সভ্য জীবনের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগই নেই। ছোট থেকেই সে মানুষ হয়েছে এই জঙ্গলে একদল নেকড়ের কাছে।

জাকার্তায় রয়েছে আরেক মোগলি ছেলেটিকে যখন গ্রামবাসীরা ধরতে এসেছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাধা দিয়েছিল সেই নেকড়ের দল। তবে তাদের প্রত্যেককেই হত্যা করে ছেলেটিকে নিয়ে আসেন গ্রামবাসীরা। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আগ্রার সিকান্দ্রা মিশন এতিমখানার একটি অনাথ আশ্রমে। সেখানেই তার নাম রাখা হয় সানিচার। উর্দু ভাষায় যার অর্থ শনিবার। কারণ এই দিনেই তাকে আশ্রমে নিয়ে আসা হয়।

ভারতের উত্তরপ্রদেশেওর এক জঙ্গলে পাওয়া যায় এই মেয়েটিকে এরপর সেই অনাথ আশ্রমই হয়ে ওঠে তার বাসস্থান। তবে সেখানে কারোর সঙ্গেই মেলামেশা করত না সেই ছেলেটি। কেবল একটি বন্ধু ছিল। তাকেও এক জঙ্গল থেকেই উদ্ধার করে আনা হয়েছিল। তবে সেই ছেলেটি স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। মানতে পারেনি দিনা। তাকে মানুষের ভাষা শেখানো যায়নি। এমনকি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কাঁচা মাংস খেতেই আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। সেইসঙ্গে মাংসের হাড় ঘষে দাঁতে শান দিত সে। পোশাক পড়াতেও বেশ বেগ পেতে হত। দীর্ঘ ২৮ বছরের চেষ্টাতেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো যায়নি দিনাকে। 

আরো পড়ুন: ৫০০ বছরের প্রথা, শুয়ে থাকা নারীর উপর ওঝা হাঁটলেই সন্তান লাভ

বিশ্ব জঙ্গল বুক সিনেমা দেখে যতটা পছন্দ করেছেন, ঠিক তেমনি বাস্তবের সানিচারের গল্প কাদিয়েছে বিশ্ববাসীকে। এখন পর্যন্ত এমন অনেকগুলো মোগলির সন্ধান পাওয়া গেছে। হতে পারে কেউ পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। আবার হতে পারে জঙ্গলের কাছাকাছি বাস করতে থাকা মানুষের বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায় বন্য প্রাণী। তারা যদিও শিকার হিসেবেই চুরি করেছিল শিশুটিকে। ছোটোবেলায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই শিশুরা বড় হয়েছেন জঙ্গলের মধ্যে। ইংরেজিতে তাদের বলা হয় 'ফেরাল চাইল্ড'। বাংলায় বলা যায় 'বুনো শিশু'?

দিনা সানিচারউত্তরপ্রদেশের সেই বালকের সঙ্গে মোগলি চরিত্রটির কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগের কথা অবশ্য লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং কোথাও উল্লেখ করেননি। কিন্তু যে লেখকের জন্ম এই দেশে, জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন এখানকার জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে। তার গল্পের অনুপ্রেরণা তো এদেশেই লুকিয়ে থাকবে।

আরো পড়ুন: স্বামীর অজান্তে একই বাড়িতে প্রেমিককে লুকিয়ে রাখেন ১৭ বছর

গবেষকরাও মনে করেন দিনা সানিচারের কথা জানতে পেরেই এই চরিত্রটিকে গড়ে তোলেন লেখক। আর দিনা নিজে সভ্য জীবনে ফিরে আসতে না পারলেও সভ্য মানুষ আপন করে নিয়েছে সেই বন্য শিশুকে। অবশ্য সেটা তো গল্পের চরিত্র। বাস্তবের মোগলি কি আদৌ যথেষ্ট সাহায্য পেয়েছিল এই সমাজ থেকে? আবার বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে যাদের আপনজন ভেবেছে, তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু কি মানুষের প্রতি ঘৃণার জন্ম দিয়েছিল তার মনে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে