ঢাকা,  শনিবার   ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ পেশা ও জীবন ]

কর্পোরেট ছেড়ে কৃষি খামারে ঝুঁকছে মানুষ

আছহাব উদ্দিন খোকন
প্রকাশিত: ০৯:৫৯, ৩ অক্টোবর ২০২৬
কর্পোরেট ছেড়ে কৃষি খামারে ঝুঁকছে মানুষ
প্রাথমিক মূলধন, শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস এবং সঠিক কৃষি প্রযুক্তির জ্ঞান না থাকলে এখানেও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। তাই অনেকেই এখন চাকরি করার পাশাপাশি শুরুতেই আংশিক বা উইকএন্ড (Weekend) ফার্মিং দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। খুব শীঘ্রই তারা চাকরি ছেড়ে ফুল টাইম ফা

নিরাপদ চাকরি ছেড়ে নিজের সব পুঁজি খামারে বিনিয়োগ করেছেন ইখতেয়ার। সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে অভিজ্ঞতা ও কৌশল আয়ত্ত করেছেন তিনি। প্রায় দুই বছর পর এখন তার উদ্যোগে সাফল্যের ছাপ দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ‘এমএম এগ্রো’র কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলাজুড়ে।

গ্রামের বেকার ও শিক্ষিত তরুণদের কাছেও খামারটি হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার জায়গা। অনেকেই তার কাছ থেকে সমন্বিত কৃষি খামার পরিচালনার কৌশল শিখতে আগ্রহী হচ্ছেন।

Advertisement

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকী গ্রামে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে শিক্ষকতা ও ব্যাংকের ভালো পদে চাকরি ছেড়ে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন ইখতেয়ার উদ্দিন আহমেদ মুন্না নামের এক যুবক উদ্যোক্তা। মাছ চাষ, মুরগি পালন, ষাঁড় গরু মোটাতাজাকরণ ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন— এই ৪ খাতকে একসঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘এমএম এগ্রো’ নামের এক সমন্বিত কৃষি খামার।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই এদেশের মানুষের মনস্তত্ত্বে "চাকরি" বা "গোলামী"র এই মানসিকতা গভীরভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল, যার প্রভাব আমরা আজও আমাদের সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থায় স্পষ্ট দেখতে পাই।

ব্রিটিশ শাসকেরা কীভাবে এই ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন, তা নিচে কয়েকটি পয়েন্টে আলোচনা করা হলো:

• মেকলে শিক্ষা নীতি (১৮৩৫): লর্ড থমাস ব্যাবিংটন মেকলে ভারতে যে ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান চর্চা বা বিজ্ঞানী তৈরি করা ছিল না। তিনি নিজেই বলেছিলেন, তারা এমন এক দল মানুষ তৈরি করতে চান যারা "রক্তে-মাংসে ভারতীয় কিন্তু রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিমত্তায় হবে ব্রিটিশ"। অর্থাৎ, ব্রিটিশদের দাপ্তরিক কাজ (কেরানিগিরি) চালানোর জন্য একটি বাধ্য অনুগত শ্রেণী তৈরি করাই ছিল এর লক্ষ্য।

• স্বাধীন ব্যবসার পথ রুদ্ধ করা: ব্রিটিশরা আসার আগে এদেশের মানুষ কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, মসলিন তৈরি, এবং স্বাধীন কৃষিকাজে যুক্ত ছিল। ব্রিটিশরা করের বোঝা চাপিয়ে এবং দেশীয় শিল্প ধ্বংস করে মানুষকে অন্যের অধীনে কাজ বা চাকরি করতে বাধ্য করে।

• সামাজিক মর্যাদা ও 'বাবু' সংস্কৃতি: ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি করা বা "বাবু" উপাধি পাওয়া সমাজে এক ধরনের কৃত্রিম মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীন ব্যবসার চেয়ে শাসকের অধীনে কাজ করাকে মানুষ বেশি নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ মনে করতে শুরু করে, যা আজীবন দাসত্বের মানসিকতা তৈরি করে।

• ঝুঁকিহীন মানসিকতা: স্বাধীন উদ্যোগ বা ব্যবসা মানেই নতুন কিছু করা এবং ঝুঁকি নেওয়া। কিন্তু ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে কেবল "হুকুম পালন" করতে শিখিয়েছে, নিজে থেকে নেতৃত্ব দিতে বা ঝুঁকি নিতে শেখায়নি। এর ফলে "মাসের শেষে নির্দিষ্ট বেতন"-এর প্রতি এক ধরনের অন্ধ মোহ তৈরি হয়।

বর্তমানে আমাদের এই "চাকরি বা গোলামীর ভূত" থেকে বের হয়ে উদ্যোক্তা হওয়া এবং স্বাধীন চিন্তাভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।

বর্তমানে কর্পোরেট লাইফের তীব্র মানসিক চাপ, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বজুড়েই অনেক মানুষ কৃষিকাজ বা ফার্মিং লাইফকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এই প্রবণতাকে অনেকেই 'ব্যাক টু রুটস' (Back to Roots) বা শিকড়ে ফেরা বলে অভিহিত করছেন।

মানুষ কেন কর্পোরেট লাইফ ছেড়ে ফার্মিংয়ে ঝুঁকছেন, তার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

• মানসিক শান্তি ও স্বাধীনতা: কর্পোরেট অফিসের নির্দিষ্ট ডেডলাইন, সারাদিন স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা এবং রাজনীতির চেয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি স্বাধীনভাবে কাজ করা অনেক বেশি মানসিক প্রশান্তি দেয়।

• নিরাপদ ও অর্গানিক খাদ্যের চাহিদা: নিজে চাষাবাদ করে রাসায়নিকমুক্ত, একদম তাজা ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার তাগিদ এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ।

• প্রযুক্তির আধুনিকায়ন: আধুনিক কৃষি এখন আর শুধু রোদে পুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনি নয়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষিকাজ এখন অনেক বেশি সহজ এবং লাভজনক ব্যবসা বা 'অ্যাগ্রো-বিজনেস' (Agro-business)-এ রূপ নিয়েছে।

• দীর্ঘমেয়াদী টেকসই জীবন (Sustainable Living): শহরের কোলাহল ও দূষণ ছেড়ে গ্রামের শান্ত পরিবেশে একটি পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করার ইচ্ছা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে।
তবে কর্পোরেট লাইফ ছেড়ে হুট করেই ফার্মিংয়ে চলে আসা সবসময় সহজ হয় না। 

প্রাথমিক মূলধন, শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস এবং সঠিক কৃষি প্রযুক্তির জ্ঞান না থাকলে এখানেও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। তাই অনেকেই এখন চাকরি করার পাশাপাশি শুরুতেই আংশিক বা উইকএন্ড (Weekend) ফার্মিং দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। খুব শীঘ্রই তারা চাকরি ছেড়ে ফুল টাইম ফার্মিং এ প্রবেশ করবেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!