ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ রাজধানী ]

টিকটকের মাধ্যমে মেয়েদের সঙ্গে সখ্যতা, বিক্রি করতো যৌনপল্লিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪:৩৫, ২৮ মে ২০২১
টিকটকের মাধ্যমে মেয়েদের সঙ্গে সখ্যতা, বিক্রি করতো যৌনপল্লিতে
রিফাজুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবু। ছবি: সংগৃহীত

২৩ বছর বয়সী এক তরুণীকে বিবস্ত্র করে বিকৃতভাবে যৌন নির্যাতন করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, ভিকটিম তরুণীটি যন্ত্রণায় চিৎকার করে আকুতি জানালেও কর্ণপাত করছে না। নিপীড়ক দলে তিন-চারজন যুবকের পাশাপাশি এক তরুণীও ছিল। এ ঘটনায় জড়িত রিফাজুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবুকে শনাক্ত করেছে পুলিশ।

ঘটনাটি ভারতের কেরালায় হলেও ভিকটিম ও নির্যাতনকারী যুবকদের একজন বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মূলত ভিডিওতে নির্যাতিতার কথা শুনে তাকে বাংলাদেশি বলে ধারণা করা হয়। ভিকটিমসহ জড়িতদের ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সদর দফতরের মাধ্যমে এরই মধ্যে সেখানকার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

বাসা থেকে বের করে দেয়ায় ভারতে টিকটক হৃদয়

নিপীড়ক হৃদয়ের বয়স ২৬ বছর। মগবাজারের নয়াটোলার বৌবাজার এলাকায় থাকতো সে। এলাকায় তাকে সবাই টিকটক হৃদয় বাবু নামে চেনে। টিকটকের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়েদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। জানা যায়, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মেয়েদের নিয়ে হাতিরঝিলে টিকটক বানাতো। 

কোনো কাজ না করায় চার মাস আগে তাকে বাসা থেকে বের করে দেন মা। ধারণা করা হচ্ছে, এর কিছুদিন পরই সে ভারতে চলে যায়। তার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে রমনা থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে মামলা রয়েছে।

সাইবার টহলের অংশ হিসেবে ওই ভিডিও পর্যালোচনা করে পুলিশ দেখতে পায়, নির্যাতনকারী একজনের সঙ্গে হাতিরঝিল এলাকার এক যুবকের চেহারার মিল আছে। হাতিরঝিল থানা পুলিশ পরে তার বাসা খুঁজে বের করে। তারপর হৃদয়ের মা মিনু আক্তার ও মামা ফরহাদ হোসেনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ভিডিওটি দেখানো হলে তারা প্রথমে কাউকে চেনেন না বলে দাবি করেন। এক পর্যায়ে তারা স্বীকার করেন, ভিডিওতে হৃদয় রয়েছে। পরে এলাকার অনেক বাসিন্দাও ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন।

ডিসি মো. শহিদুল্লাহ বলেন, কৌশলে টিকটক হৃদয়ের মামার হোয়াটসঅ্যাপে থেকে হৃদয়ের ভারতীয় নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সে জানান, গত তিন মাস আগে ভারতে গেছে। যৌন নির্যাতনের যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, সেই ঘটনা ঘটে ১৫ থেকে ১৬ দিন আগে।

পুলিশ জানিয়েছে, টিকটক হৃদয়ের সঙ্গে ওই নারীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়, হৃদয় তাকে ভালো বেতনে চাকরিসহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পাচার করে। এরপর সেখানে যৌন ব্যবসা করতে বাধ্য করা হয় তাকে।

ভারতে কেন ও কীভাবে গেল ওই তরুণী

ওই তরুণী মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েছিলেন বলে প্রাথমিক ধারণা করছে পুলিশ। তেজগাঁও বিভাগে উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ওই তরুণীর সঙ্গে অভিযুক্ত হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল। প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাকে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে।

কিশোরগঞ্জ সদরে ওই তরুণীর বাড়ি। ২০১৪ সালে তিনি প্রেমের সম্পর্কের পর চাঁদপুরে কুয়েত প্রবাসী এক যুবককে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকেই তরুণীকে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বিয়ের পর পাঁচ বছর পর্যন্ত বাবার বাড়িতেই ছিলেন তিনি।

বাবার বাড়িতে অভাব-অনটনের জন্য মন টিকতো না ওই তরুণীর। তাই তিনি চিন্তা করেন সৌদি আরবে পাড়ি জমানোর। এক দালালকে ৩০ হাজার টাকাও দেন, তাতে কোনো লাভ হয়নি। এরপর ভুক্তভোগী তরুণী কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করেই কোথাও চলে যান। পরিবারের সঙ্গে দুই বছর ধরে তার যোগাযোগ নেই। তার চার বছরের ছেলে এখন দাদা-দাদির কাছে চাঁদপুরে আছেন।

তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হাফিজ আল ফারুক বলেন, মেয়েটি প্রথমে দুবাই গিয়েছিলেন, এখন পর্যন্ত এমনটাই জানা গেছে। সেখানে কোনো চক্র তাকে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করে দিতে পারে ধারণা করছি আমরা। নির্যাতনের শিকার তরুণী এখন কোথায় রয়েছেন, এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় পর্নোগ্রাফি ও মানব পাচার আইনে মামলা করেছেন। তাতে হৃদয় ও তার চার সহযোগীকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় গতকাল বেঙ্গালুরুর একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে হৃদয়সহ পাঁচজনকে গ্রেফতারর করেছে ভারতীয় পুলিশ। ইন্টারপোল ও ভারতীয় পুলিশের সহায়তায় আসামিদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। সেইসঙ্গে ভুক্তভোগী তরুণীকেও ফিরিয়ে আনা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!