জুলাই স্মৃতিচারণ নিয়ে লেখা গ্রন্থ 'জুলাইগাঁথা' এর মোড়ক উন্মোচন
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ মূলক গ্রন্থ 'জুলাইগাঁথা' প্রকাশ করছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)। এই গ্রন্থে চবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন স্মৃতি ও আত্মত্যাগের কাহিনীকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন চাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক হারেস মাতব্বর।
বুধবার (২১ই অক্টোবর ২০২৬) দুপুর ২:৩০ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসু প্রাঙ্গণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ মূলক গ্রন্থ 'জুলাইগাঁথা' মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তব্যে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, "আজকে অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করেন যে, জুলাই আন্দোলন করে কী অর্জন হলো বা এর ফলাফল কী? কিন্তু আমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করি, তবে বুঝতে পারব যে যদি জুলাই আন্দোলন না হতো, তবে ছাত্র-ছাত্রীরা চুয়েটে যে একমাস ধরে অন্যায়ের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে রাখতে পেরেছে, তা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। বিগত দিনের স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক পরিবেশে এই প্রতিবাদ করার ন্যূনতম সুযোগও থাকত না। জুলাই আন্দোলন আমাদের সেই সাহস ও অধিকার এনে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন হওয়া এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সঠিক নেতৃত্বকে বিজয়ী করা, এটি জুলাইয়ের অন্যতম বড় একটি অর্জন। চাকসু ধ্বংসস্তূপ থেকে শুরু করে যেভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে চাকসুর মেয়াদ এক বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়, কারণ ছাত্রসংসদের একটি ধারাবাহিকতা বা কন্টিনিউয়েশন থাকা উচিত।"
চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, "পৃথিবীতে একজন স্বৈরাচারের পতন হয়, আরেকজন স্বৈরাচার আসে। সেই স্বৈরাচার হয়তো একটা দীর্ঘ সময় মানুষের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণ করে। তারা হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যারা আন্দোলনকর্মী ছিল, মানুষের মানবতার মুক্তির জন্য লড়াই এবং সংগ্রাম করেছে এবং সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে, তাদের জন্য হয়তো কিছু সময়ের জন্য তাদের উপর নির্যাতন, নিপীড়নের স্টিম রোলার নামে। মানুষ নির্যাতিত হয়, নিষ্পেষিত হয়, নতুন করে রক্ত ঝরে। মানুষের কারো হয়তো ফাঁসি হয়। কিন্তু চরম বাস্তবতা—পৃথিবীতে কোনো স্বৈরাচারী টিকে থাকে না। পুনরায় আবার সেই স্বৈরাচার যখন মাত্র সে অতিক্রম করে, সাথে সাথে সেই জামানার যারা মুজাহিদ, জামানার যারা মুক্তিকামী মানুষ, যারা ফ্যাসিবাদীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে জীবন পণ দিয়ে রাজপথে নামে, তারা তাকে আবার পতন ঘটায় এবং নতুন একটি পদচারণা শুরু হয়।"
সাবেক সমন্বয়ক মোহাম্মদ আলী বলেন, "আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই চট্টগ্রামের এই আন্দোলন শুরু করেছিলাম, যা পরবর্তীতে চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। চাকসু জুলাইকে কেন্দ্র করে অনেক বড় বড় আয়োজন করেছে, যার মধ্যে 'জাগরত জুলাই' কালচারাল ফেস্ট অন্যতম।"
তিনি আরো বলেন, "একটি বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সাংস্কৃতিক চর্চা ও এর ধারাবাহিকতা অত্যন্ত জরুরি। স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থে জুলাইকে ব্যবহার করলেও, সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেই এই বিপ্লব মানুষের হৃদয়ের গহীনে চিরজাগরুক থাকবে। ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য ও সন্ত্রাসী রাজত্ব রোধ করতে চাকসু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। অতীতে প্রশাসন ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে যেভাবে হলে সিট দিয়ে এবং নানা সুযোগ দিয়ে সন্ত্রাসী তৈরি করেছে, চাকসু সচল থাকলে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর সন্ত্রাস তৈরির কারখানা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মানুষের কল্যাণের কেন্দ্র হওয়া উচিত। আমাদের জ্ঞান, মেধা ও শ্রম যেন কোনো অন্যায়ের পক্ষে না থেকে মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।"
চাকসু জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, "আমাদের সেই জুন মাসে যখন আন্দোলন শুরু হয় কোটা দিয়ে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সর্বপ্রথম গোটা চট্টগ্রামের মধ্যে সর্বপ্রথম এখানে আন্দোলন শুরু হয়। আমাদের ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা যারা অবদান রেখেছে আন্দোলনে, আহত হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, আমরা কেবলমাত্র তাদের স্মৃতিগুলোকে একটা মলাটবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি।"
সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক হারেস মাতব্বর বলেন, জুলাইকে টিকিয়ে রাখতে আমরা জুলাই ফেস্ট, জুলাই স্মৃতি লেখন, "ডকুমেন্টারি এবং সর্বশেষ জুলাইগাথা বই প্রকাশ করেছি৷ হাসিনার স্বৈরাচারী কাঠামো কিভাবে হয়েছে, তার সকল প্রতিষ্ঠানকে কিভাবে ফ্যাসিবাদী তৈরি করেছে এ-সব কিছুই বিভিন্ন সময় আমরা তুলে ধরেছি যেনো ভবিষ্যতেও কেউ এমন ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারে। আমাদের দেশে আবারও যদি কোনো সরকার যদি ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে চায়, সেক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্ম যাতে এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিতে পারে সেইজন্যই আমাদের এই দলিলভিত্তিক কাজ।"
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে চাকসু ও হল সংসদের অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।