প্রশান্ত মহাসাগরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির রেকর্ড হতে পারে, সতর্ক করল জাতিসংঘ
প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে নতুন রেকর্ড তৈরি করতে পারে শক্তিশালী এল নিনো। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) নতুন মৌসুমি পূর্বাভাসের বরাতে এ সতর্কতার কথা জানানো হয়। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। ডিসেম্বরে এ পরিস্থিতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। খবর রয়টার্সের।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ করা অতীতের রেকর্ডে তাপমাত্রার এমন বৃদ্ধি দেখা যায়নি। এর আগে শক্তিশালী এল নিনোর সময় তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছিল। নতুন পূর্বাভাস সেই মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে গেলে বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের এল নিনো বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে এর প্রভাব খাদ্য উৎপাদন, পানির সরবরাহ, জনস্বাস্থ্য, আবাসন ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের ঘাটতি কৃষি উৎপাদন এবং পানির প্রাপ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলে আবার অতিবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে একই জলবায়ুগত ঘটনার প্রভাবে একদিকে খরা, অন্যদিকে বন্যা মোকাবিলা করতে হতে পারে বিভিন্ন দেশকে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা ও জরুরি ত্রাণবিষয়ক সমন্বয়ক টম ফ্লেচার এবারের এল নিনোকে ‘ধ্বংসাত্মক শক্তির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার সতর্কতা, লাতিন আমেরিকা, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা, এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার কারণে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।
ফ্লেচারের আশঙ্কা, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ আরও তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে খরাপ্রবণ অঞ্চল, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী এবং আগে থেকেই খাদ্যসংকটে থাকা মানুষেরা বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। এটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের অংশ। তবে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা এল নিনোর প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কতা, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির মজুত, কৃষকদের সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, সময়মতো সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সম্ভাব্য দুর্যোগের মানবিক ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে এল নিনোর শক্তি এবং এর আঞ্চলিক প্রভাবের ওপর। তাই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।