ঢাকা,  সোমবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ বাংলাদেশ ]

কর আদায় বাড়াতে এনবিআরের নতুন রূপরেখা

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৪, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কর আদায় বাড়াতে এনবিআরের নতুন রূপরেখা
সংগৃহীত ছবি

দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে বড় ধরনের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এ লক্ষ্য অর্জনে করের আওতা বাড়ানো, কর পরিপালন জোরদার, প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ‘ওয়ান এনবিআর’ নামে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

Advertisement

এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগ পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে সমন্বিতভাবে করদাতা ব্যবস্থাপনায় কাজ করবে। এতে করদাতার তথ্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কর পরিশোধ এবং বকেয়া রাজস্বের তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলো আরও কার্যকরভাবে একীভূত করা হবে।

গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। এতে সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে সরকারি ব্যয়ের চাহিদা মেটাতে এনবিআরের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাতের ঘাটতি কমাতে নেওয়া পদক্ষেপ, সংস্থাটির সাংগঠনিক কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

এনবিআর বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে শুধু করের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি করের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং করদাতাদের পরিপালন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এনবিআরের রূপরেখায় স্বল্পমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে এ অনুপাত ১৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করদাতা সেবা বাড়ানোকে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এনবিআর।

উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ বর্তমানে এনবিআর থেকে আসে। এ বিষয়ে এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, রাজস্ব আহরণের প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ জোরদার করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এই সক্ষমতা বৃদ্ধি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেশির ভাগ সময় ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে এটি প্রায় ১০ শতাংশে উঠলেও পরে আবার কমে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ অনুপাত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এনবিআর বলছে, দক্ষিণ এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান কর-জিডিপি অনুপাত এখনও কম। এ পরিস্থিতিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া উপস্থাপনায় জানানো হয়, এনবিআর গত ২৫ বছরের জিডিপির আকার, সরকারি বাজেট, রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়, রাজস্ব আহরণ ও প্রবৃদ্ধি, সরকারি ঋণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কর-জিডিপি অনুপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে সরকারি ব্যয় ৪ দশমিক ৪৭ গুণ বাড়লেও এনবিআরের রাজস্ব আহরণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ গুণ। তাই সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত রাজস্ব আয়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি আরও বাড়াতে হবে।

রাজস্ব প্রশাসন শক্তিশালী করতে তাৎক্ষণিকভাবে করদাতা সেবা, সুশাসন, নীতি প্রণয়ন, তথ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এনবিআর।

প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনায় আইনি কাঠামো পর্যালোচনা, সমন্বিত এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার তৈরি, প্রতিটি করদাতার জন্য স্বতন্ত্র মাস্টার ডেটাবেজ এবং অভিন্ন ডেটা ডিকশনারি ও সিস্টেম ইনভেন্টরি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া রাজস্ব নীতি সচিবালয় গঠন, কর-ব্যয়ের রেজিস্টার তৈরি এবং নীতির আর্থিক প্রভাব নির্ধারণে বাধ্যতামূলক টেমপ্লেট চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রথম তিন বছরে সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, গ্রাহক ও মামলা ব্যবস্থাপনার একীভূত ব্যবস্থা, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের সঙ্গে করদাতার তথ্য যাচাই, বিভিন্ন করের ক্ষেত্রে পরিপালন ঝুঁকি শনাক্তের অভিন্ন ব্যবস্থা এবং কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্বের সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কাস্টমসের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত সীমান্ত কার্যক্রম বহাল রেখে আমদানি ও রপ্তানিকারকদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে পণ্যের মূল্যায়ন, ভ্যাট ও আয়কর-সংক্রান্ত ঝুঁকির তথ্য সমন্বয়ের প্রস্তাব করেছে এনবিআর।

পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কর পরিপালন বিশ্লেষণ, আইনি সুযোগ থাকলে আগে থেকে পূরণ করা কর রিটার্নের পরিধি বাড়ানো, কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ফেরত এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক ও জালিয়াতি শনাক্তে উন্নত বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

এনবিআর জানিয়েছে, রাজস্ব নীতির মাধ্যমে শিল্পোন্নয়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়তা দেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, কৃষি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভ্যাট অব্যাহতি, বিভিন্ন খাতে কম আয়কর হার ও কর অব্যাহতি, কাস্টমস অটোমেশন এবং সিঙ্গেল-উইন্ডো সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব নীতির আওতায় কৃষি, তৈরি পোশাক, রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনার, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যানবাহন, মোবাইল ফোন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), পুঁজিবাজার, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা, ওষুধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ//একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!