আমাদের এলাকায় চক্রবর্তী সম্রাট না থাকলেও চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ আর মজুমদার ছিল। এরা জমিজমার মালিক-সে অর্থে জমিদার। তাদের ঈশ্বর ছিল, মন্দির ছিল, পুজো-আর্চা ছিল। আর আমার পূর্বপুরুষদের ঈশ্বর ধারণা শুধুই ভীতি আর দণ্ডনায়কের। তারা ভয়ে থাকতেন নিজের আর পূর্বপুরুষের অজানা পাপের জন্য, যার শাস্তি তখনো আসেনি।
এদিকে পারস্য আর আরবের মহীসাওয়াররা আসতে শুরু করেছে। তাদের পথ ধরে ইসলাম খান চিশতী, বুজুর্গ উমিদ খান, আর ছূট্টি খানরা নদী পথে আসেন। তখন আরাক্কানী মগদের দৌরাত্ম্য শেষ হয়ে এসেছে। শাহ সুজা দিল্লির মসনদের দৌড়ে হেরে গিয়ে প্রাণ নিয়ে আরাকানে পালিয়ে যান। যাবার পথে তার খাদিম আর পাঠান সৈন্যদের একটি অংশ আমার পূর্বপুরুষদের গ্রামে রেখে যান। তাদের দীর্ঘকায় গড়ন, শ্মশ্রুধারী মুখাবয়ব আর ফারসি ভাষার উচ্চারণ আমার পূর্বপুরুষদের মুগ্ধ করেছিল। রায়, চক্রবর্তী আর মজুমদারদের চেয়ে এই বিজাতীয় মানুষগুলোকে তারা বেশি দেবতুল্য মনে করেছিল। এরপর, আমার পূর্বপুরুষরাও দীক্ষিত হলেন নতুন বিশ্বাসে। ন্যাংটি ছেড়ে লুঙ্গি পরা ধরলেন।
.png)
... তারপরও, ধান চাষ আর মাছ ধরা দিয়েই যুগের পর যুগ পার করেছেন আমার পূর্বপুরুষেরা। আমার বাবা সেই জীবন পেছনে ফেলে শহরমুখী হলেন। লুঙ্গি ছেড়ে প্যান্ট ধরলেন। আমিও তাই।
তবে এখনো কি উজানের পাহাড়ি নদীগুলোতে গাছের গুঁড়ি আর বাঁশের ভেলা ভাসিয়ে নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা? দূর থেকে দেখলেও মনে হতো, ভিজে বাঁশ আর পানির গন্ধ নাকে এসে লাগে। বর্ষায় খরস্রোতা নদীগুলোর পাক খাওয়া ভাটিযাত্রার হলদেটে রূপ কি এখনও একই রকম? পাহাড়ের লাল মাটি মিশে তৈরি হওয়া সেই ভয়ানক সৌন্দর্য এখনো কি নদীর বুক বেয়ে ভেসে বেড়ায়? নদ কিংবা নদীর চরিত্র, তার লিঙ্গ কেবল নাম দিয়েই যেন নির্ধারিত হয়। কপোতাক্ষ নদ, আর যমুনা কিংবা পদ্মা নদী। স্রোতের প্রকৃতি বা শাখা-উপনদীর জন্মের ভিত্তিতে লিঙ্গ নির্ধারিত হলে হয়তো খারাপ হতো না। তবে আজকাল জেন্ডারের ৭৮টি বর্ণ নিয়ে বিতর্কের আলোচনায় এমন তত্ত্ব গুরুত্ব পাবে না।
লেখকের ফেসবুক পোস্ট হতে সংগৃহীত