তাপস দা আসবে ধনবাড়ি থেকে আমি যাবো শোলাকুড়ী থেকে। দুজনে কথা বলে ঠিক করে নিলাম, পঁচিশ মাইল বাজারে একসাথে হয়ে বনে ঢুকবো।
বেশ রোদ আর গরম। সকাল ১১টায় আমরা পঁচিশ মাইল বাজারে একসাথে হলাম। এরপর অটো করে গায়রা গ্রামে ঢোকার রাস্তায় ঠিক টেলকি বাজারের আগে নেমে গেলাম। নামার আগে জিজ্ঞেস করছিলাম, দাদাকে। দাদা,আমরা কি চলে আসছি নাকি? দাদা বললো, এখনি তো তোমার পরীক্ষা হবে।
.png)

পারুল ফুল দেখতে গত বছরে ঠিক একই জায়গায় আসছিলাম, তখন ফুল ছিল না, আর গাছ দেখেও ঠিকঠাক চিনতে পারিনি।
এবার হবে পরীক্ষা।
অটো থেকে নেমে দাদা বললো খুঁজে বের কর, পারুল কই?
যেহেতু ফুল ফুটেছে তাহলে গাছে ফুল দেখে চিনতে পারবো।
গাছে ফুল বেশি দেখা যাচ্ছিলো না,পুরো গাছের মাথা ছেয়ে আছে কাঞ্চন লতায়।
আবার সেখানে উপর থেকে গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে, একটা গাড়ি দূর্ঘটনাও ঘটেছিল মনে হল, গাছের গোড়ায় ভাঙা কাচ পড়ে আছে।
তবে 'পারুল ফুল' দেখলে চিনতে পারবো।
আমি আশেপাশে সকল গাছের উপরে আর রাস্তায় খেয়াল করছি কোথাও পারুলের দেখা নাই। সকালে যে ফুল পড়ে ছিল সেই ফুলও নাই। তাহলে কি পরীক্ষায় ফেইল করবো?
আমি 'পারুল' চেনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। দাদাও কিছু বলছে না।
ময়মনসিংহ টাংগাইল মহাসড়ক, ব্যস্ত রাস্তা। মধুপুর থেকে ময়মনসিংহ যেতে ঠিক রাস্তার ডানে কয়েক ফুট রাস্তা পার হলেই বিশাল গাছ।
গাছ দেখে চেনার উপায় নাই। এই সেই 'পারুল'। আমি উপরে আর মহাসড়কে খেয়াল করছিলাম, কোন ফুল আছে কিনা, পড়ছে কিনা।
মৃদু বাতাস, হঠাৎ উপর থেকে একটা ফুল পড়লো রাস্তার মাঝখানে। আমি ডানে বামে না তাকিয়ে রাস্তার মাঝখানে ফুল কুড়াতে গেলাম।
দাদা বললো, সাবধানে।
ফুল হাতে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে দাদাকে বললাম,দাদা এইতো 'পারুল'।
দাদা হুমমম,বলে মাথা নাড়লেন।
এরপর একটু অপেক্ষা করলাম। এরপর একটু পর পরই গাছ থেকে একটা দুইটা করে ফুল পড়ছিলো আমি কুড়িয়ে হাতে জমাচ্ছিলাম।
বেশ কিছুক্ষণ থেকে পাশের বন এবং মহাসড়কের দুপাশে বীজ ছিটিয়ে টেলকি বাজারে চা খেয়ে ভ্যান নিয়ে রওনা করলাম গায়রা বাজারে।
গায়রা গ্রামটা মধুপুর গড়ের অন্যতম একটা গ্রাম। এই গ্রামে এক সময় জুম চাষ হতো। গহীন বন ছিল। এখন আর সেই দৃশ্য নেই। চারদিকে আনারস আর কলার বানিজ্যিক চাষ।
বাতাসে সার,বিষ,কীটনাশকের ঘ্রাণ। ইট বিছানো রাস্তা, বেশ ঝাকি লাগছিলো। দাদাকে বলছিলাম আজকে শরীরের বারোটা বেজে যাবে।
ভ্যানে যেতে যেতে দাদা বলছিলেন আমরা আরেকটা পারুল দেখতে যাচ্ছি। এই গাছটাও বেশ বড়। আমি অবাক হলাম। আমিতো জানতাম একটা গাছই আছে।
গায়রা বাজারে আরো একটা গাছ? দাদা বললেন আরে,পারুল বন আবিষ্কার করবো আজকে। চলো?
ভর দুপুর। গায়রা বাজারে হাতে গুণা কয়েকটা দোকান। সব গুলোই বন্ধ। ভ্যানের উপর দুজন লোক বসে লুডু খেলছে।
আমাদের ভ্যান থামাতে বললাম।
গায়রা বাজারেই যেহেতু গাছ এবার পারুল চিনতে আর দেরি হল না।
আমরা ভ্যান থেকে যেখানে নামলাম ঠিক কয়েক গজ পরেই গাছটি। গাছের সাথে একটা টেইর্লাস আর চায়ের দোকান। চায়ের দোকানটা খুলা। এই গাছটাও বেশ বড় আকারের।
তেমন ফুল নেই,পাতা চলে আসছে। ভ্যান থেকে নেমেই স্থানীয় আদিবাসী রফিক সাংমা(গারো) চায়ের দোকানদার দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম দাদা এই গাছটার নাম কি? তিনি গাছের নাম বলতে পারলেন না।
তবে আদিবাসী (গারোরা) এই গাছের কাঠ,ডাল পোড়ানির কাজে ব্যবহার করেন না। পোড়ালে নাকি পরিবারের অমঙ্গল হয় । প্রমাণ সরুপ তিনি নিয়ে গেলেই দোকানের পেছনে। ঝড়ে এই গাছের ডাল ভেঙে ছিল। কেউ সাহস করেনি গাছের ডাল নিতে। দোকানের পেছনে দীর্ঘ দিন এভাবেই পড়ে আছে।
বাংলা ভাষার পারুল, সংস্কৃত ভাষার পাটল বা পুলিলা,পারুল শুষ্ক থেকে আর্দ্র পাতাঝরা বনের গাছ। আদিনিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া। ইংরেজি নাম Fragrant Padri-tree বা Yellow Snakeroot, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Stereospermum cheloniodes ও গোত্র বিগ্নোনিয়েসি। মাঝারি আকারের পাতাঝরা প্রকৃতির বৃক্ষ। শীতে গাছগুলোর সব পাতা ঝরে যায়, বসন্তে পাতা গজায়।
ফুল উভলিঙ্গী ও সরু বোঁটাযুক্ত বাঁকানো ফানেলাকৃতি, পাপড়ি গাঢ় বেগুনি থেকে গোলাপি ও সুগন্ধযুক্ত, ভেতরের অংশ হলদেটে, পুরুষ কেশর চারটি, স্ত্রী কেশর একটি।
বিপন্ন এবং বিরল বৃক্ষ সংগ্রাহক প্রকৃতিপ্রেমী তাপস বর্দ্ধন পারুল ফুল নিয়ে বলেন, ২০১৮ সালে টেলকি রাস্তার পাশে গাছটি খুঁজে পাই আর গায়রা বাজারের গাছটা খুঁজে পাই ২০২১ সালে সাংবাদিক শহিদ এর মাধ্যমে।
তবে গাছ দুটো সংরক্ষণ করা খুব জরুরি। এই বৃক্ষ বাংলাদেশ,ভারত,নেপাল,মায়ানমার,কম্বোডিয়া ও শ্রীংলকায় শুধু দেখা যায়,ব্যাপক ভাবে নয় এর বীজের মেডিসিনাল ব্যবহারের জন্য ব্যাপক ভাবে বীজ আহরন করা হয় বন থেকে। ফলে বীজ থেকে চারা হওয়ার সম্ভবনা কমে গেছে।
পারুল ফুলেল নাম অতীত ও বর্তমানে বাংলা সাহিত্যে প্রচুর ব্যবহার করা হয়েছে।
লেখক : রাতুল মুন্সী, প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক।