স্বামীর আনুগত্যের সুফল ও অবমাননার কুফল (শেষ পর্ব)

ঢাকা, বুধবার   ০১ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ১৯ ১৪২৬,   ০৮ শা'বান ১৪৪১

Akash

স্বামীর আনুগত্যের সুফল ও অবমাননার কুফল (শেষ পর্ব)

নিলুফার ইয়াসমিন জান্নাত ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৫০ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

উত্তম ওই ব্যক্তি, যে স্ত্রীর প্রতি নম্র ব্যবহার করে-ফাইল ফটো

উত্তম ওই ব্যক্তি, যে স্ত্রীর প্রতি নম্র ব্যবহার করে-ফাইল ফটো

হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি এবং ফাতিমা (রা.) নবী করিম (সা.) এর নিকট গিয়ে দেখতে পেলাম যে, তিনি খুব কান্নাকাটি করছেন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কোরবান হোক। আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি বললেন, হে আলী! ‘যে রাতে আমার মিরাজ হয়েছে এবং আমাকে আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সে রাতে আমি আমার উম্মতের বহু নারীকে নানা প্রকার আজাব ভোগ করতে দেখেছি। তাদের কঠোর আজাব দেখে আমি কেঁদে দিয়েছি। এক নারীকে তার চুল দ্বারা বেঁধে লটকানো অবস্থায় দেখেছি এবং তার মস্তিষ্ক টগবগ করে ফুটছিল। আর এক নারীকে তার জিহ্বা দ্বারা লটকনো অবস্থায় দেখেছি এবং তার মুখের ভেতরে গরম পানি ঢালা হচ্ছিল।  অন্য এক নারীকে দেখলাম তার পা স্তনের সঙ্গে এবং হাত কপালের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। অপর এক নারীকে তার স্তন দ্বারা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা অবস্থায় দেখতে পেলাম। অপর এক নারীকে দেখলাম তার মাথা শূকরের মতো এবং দেহ গাধার মত, তার ওপর রয়েছে হাজারো প্রকার আজাব। অপর এক নারীকে কুকুরের আকৃতিতে দেখলাম। আগুন তার মুখ দিয়ে ঢুকে গুহ্যদ্বার দিয়ে বেরুচ্ছে এবং ফেরেশতারা আগুনের হাতুড়ি দিয়ে তাকে প্রহার করছে।

আরো পড়ুন>>> স্বামীর আনুগত্যের সুফল ও অবমাননার কুফল (পর্ব-১)

১ম পর্বের পর থেকে... একথা শুনে ফাতিমা (রা.) উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমার প্রিয়তম ও নয়নের তৃপ্তি পিতা! এ সব নারীর কোন আমলের কারণে এরুপ আজাব হচ্ছে? তিনি বললেন, হে আমার কন্যা! যে নারীকে চুল দ্বারা বেঁধে লটকিয়ে রাখা হয়েছে, সে মাথার চুল ঢেকে চলাফেরা করতো না। যাকে জিহ্বা দ্বারা বেঁধে রাখা হয়েছে, সে তার স্বামীকে কথা দ্বারা কষ্ট দিতো। যাকে স্তনের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, সে তার স্বামীর বিছানায় অন্য লোককে স্থান দিতো। যার দু‘পা স্তনের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে এবং হাত দু‘টো কপালের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে এবং যাকে সাপ-বিচ্ছুতে কাটছে, সে নারী যৌন মিলনের পর এবং ঋতু বন্ধ হওয়ার পর গোসল করে পবিত্র হতো না এবং নামাজের সঙ্গে উপহাস করতো। আর যার মাথা শুকরের মতো এবং দেহ গাদার মতো সে ছিল চোগলখোর ও মিথ্যুক। যে নারীর আকৃতি ছিল কুকুরের মতো এবং মুখ দিয়ে আগুন প্রবেশ করে গুহ্যদ্বার দিয়ে বেরুচ্ছে সে হলো হিংসুক এবং খোঁটাদানকারী।

মুআয ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, স্ত্রী তার স্বামীকে দুনিয়াতে এই বলে কষ্ট দেয় সে জান্নাতের হুর। তাই তাকে কষ্ট দিয়ো না। সাবধান ওহে নারী সমাজ! যে নারী তার স্বামীর অবাধ্য, তার রয়েছে দুর্ভোগ।

নারীদের কঠোরভাবে তাদের স্বামীর আনুগত্য করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট থাকতে বলা হয়েছে। অন্য দিকে স্বামীকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার এবং তার প্রতি নম্র ব্যবহার করার জন্য। তার কোনো প্রকার খারাপ অভ্যাস প্রকাশ পেলে তাকে ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং তাকে ভরণ-পোষণ, কাপড়-চোপড় ও সাহচর্য প্রদান করে তার প্রতি কর্তব্য পালনে তৎপর হতে হবে। ‘তোমরা তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো।’ নবী করিম (সা.) বলেছেন: স্ত্রীদেরকে উপদেশ প্রদান করো, স্ত্রীদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে; তাদের অধিকার হলো তাদের খাদ্য ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর তোমাদের অধিকার হলো যাদেরকে তোমরা অপছন্দ করো তাদেরকে তোমাদের বিছানা স্পর্শ করতে দেবে না এবং যাদেরকে তোমরা পছন্দ করো না তাদেরকে তোমারেদ ঘরে প্রবেশ করতে দেবে না। হুকুম পালনের ব্যাপারে নবী করিম (সা.) নারীদেরকে বন্দীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সর্বোত্তম-যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।’

অন্য রিওয়ায়াতে আছে তোমাদের মধ্যে উত্তম ওই ব্যক্তি, যে স্ত্রীর প্রতি নম্র ব্যবহার করে। নবী করিম (সা.) তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি নম্র ব্যবহার করতেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর খারাপ ব্যবহারের ওপর ধৈর্যধারণ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ওই পরিমাণ সওয়াব দান করবেন যে পরিমাণ সওয়াব তিনি হজরত আইয়ুব (আ.)-কে বিপদে ধৈর্যধারণের জন্য দিয়েছিলেন। আর যে নারী তার স্বামীর অনাচারের ওপর ধৈর্যধারণ করবে আল্লাহ তাকে ওই পরিমাণে সওয়াব দান করবেন যে পরিমাণ সওয়াব তিনি দিয়েছিলেন হজরত আছিয়া বিনতে মুযাহিম (রা.)-কে অর্থাৎ ফিরাউনের স্ত্রীকে।

বর্ণিত আছে যে, একবার একব্যক্তি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য হজরত উমর (রা.) এর নিকট গেল। সে হজরত উমর (রা) এর দরজায় তার বেরিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করছিল। সে শুনতে পেল যে, হজরত উমর (রা.) এর স্ত্রী তার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করছে এবং তার সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করছে আর উমর (রা.) চুপ করে আছেন এবং কোনো প্রকার উত্তর দিচ্ছেন না। তখন লোকটি ফিরে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলো এবং মনে মনে বললো, আমীরুল মুমিনীন হয়ে হজরত উমর (রা.) এর মতো লৌহমানবের অবস্থা যদি এই হয় তবে আমার অবস্থা কি হবে?

তখন উমর (রা.) বেরিয়ে দেখলেন যে, লোকটি তার দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছে। তিনি তাকে ডেকে এনে বললেন, ওহে! তুমি কি জন্য এসেছিলে? সে বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! আমি এসেছিলাম আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য। সে আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না এবং আমাকে বকাবকি করে কিন্তু এখানে এসে আপনার স্ত্রীর অনুরুপ কথাবার্তা শুনে আমি ফিরে যাচ্ছিলাম এবং মনে মনে ভাবছি-যদি আমীরুল মুমিনীনের এ অবস্থা হয় তবে আমাদের অবস্থা কি হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অতঃপর হজরত উমর (রা.) বললেন: ওহে ভাই! আমি তার এ সব আচার-আচরণ এজন্য সহ্য করে নিচ্ছি যে, আমার ওপর তার কতগুলো অধিকার আছে। যেমন-১. সে আমার খাদ্য পাকাবার জন্য পাচকিনী, ২. রুটি বানানোর জন্য রুটি তৈরিকারী, ৩. কাপড় ধোয়ার জন্য ধোপানী এবং ৪. আমার সন্তানদের ধাত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। অথচ এর কোনো কাজই তার ওপর ওয়াজিব নয়। সঙ্গে সঙ্গে সে আমকে হারামে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করছে তাই আমি তার এসব দুর্ব্যবহার নীরবে সহ্য করে যাচ্ছি। এবার লোকটি বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! আমার স্ত্রীও একই ভূমিকা পালন করছে। উমর (রা.) বললেন: হে ভ্রাতা! তাহলে তুমিও তার অনাচারগুলো সহ্য করে নাও। দুনিয়ার জীবন তো ক্ষণিকের জন্য।

কথিত আছে যে, কোনো এক নেককার লোকের এক নেককার বন্ধু ছিল। সে প্রতিবছর একবার তার সঙ্গে দেখা করার জন্য আসতো। একবার সে দেখা করতে এসে বন্ধু দরজায় নাড়া দিলো। তার বন্ধু স্ত্রী বললো, কে? সে বললো, আমি আপনার স্বামীর বন্ধু। আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য এসেছি। বন্ধুর স্ত্রী বললো, সে তো লাকড়ি সংগ্রহের জন্য গেছে। আল্লাহ যেন তাকে ফিরিয়ে না আনেন এবং নিরাপদ না রাখেন। তারপর সে তার স্বামীর নানা প্রকার বদনাম করছিল। আগন্তু বন্ধু তার দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ সে দেখতে পেল যে, তার বন্ধু পাহাড়ের দিক থেকে আসছেন এবং লাকড়ির বোঝা বহন করে আনছে এক বাঘের পিঠে করে এবং তিনি ওই বাঘটির পেছনে থেকে তাড়িয়ে নিয়ে আসছেন।

তিনি এসে বন্ধুকে সালাম দিলেন এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। তারপর তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন এবং লাকড়িগুলো ঘরে তুলে রাখলেন। আর বাঘটিকে বললেন, এখন চলে যাও- আল্লাহ তোমর মঙ্গল করুন! তারপর তিনি তার বন্ধুকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন, তখনও তার স্ত্রী তাকে বকাবকি করছিল কিন্তু তার স্বামী তার কোনো জবাবই দিলো না। অতঃপর আগন্তু বন্ধুর সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে তার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে রওয়ানা হলো। সারাটি পথ সে তার বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে সহিঞ্ষুতাপূর্ণ ব্যবহারে অবাক বোধ করছিল। পরের বছর লোকটি আবার তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য আসলো এবং দরজায় নাড়া দিলো। তার স্ত্রী, বললো, আপনি কে? সে বললো, আমি আপনার স্বামীর বন্ধু অমুক। নারী বললো: শুভাগমন,বেশ আপনি আসুন। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে ইনশাআল্লাহ! নিরাপদে ফিরে আসছেন। আগন্তুক বন্ধুর স্ত্রীর সৌজন্যমূলক ব্যবহারে অবাক হলো। হঠাৎ দেখলো যে তার বন্ধু পিঠে করে লাকড়ি নিয়ে আসছেন। এতেও তিনি আশ্চর্য হলো, বন্ধু এসে তাকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলেন এবং তাকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন।

তারপর বন্ধুর স্ত্রী উভয়ের জন্য খাবার পরিবেশন করলেন এবং অত্যন্ত ভদ্রোচিতভাবে কথাবার্তা বললেন। অবশেষে বিদায়ের পূর্বে সে তার বন্ধুকে বললো, বন্ধু! আমি একটি ব্যাপারে আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি। তিনি বললেন, সে আবার কি? সে বললো, গত বছর এসে দেখেছিলাম যে, আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে, আপনার সঙ্গে বকাবকি করছে এবং আপনার দুর্নাম রটাচ্ছে। আর আপনাকে দেখেছিলাম বাঘের পিঠে করে লাকড়ি আনতে, তখন বাঘটি ছিল আপনার বাধ্যগত। কিন্তু এবার দেখছি আপনার স্ত্রীর কথাবার্তা অতি চমৎকার এবং কোনো প্রকার বাকবিতণ্ডা বা দুর্নাম করছে না এবং লাকড়ির বোঝা আপনি নিজের ঘাড়ে করে বইছেন এর কারণ কি?

তিনি বললেন: ভ্রাতা! সে অভদ্র নারী মারা গেছে। আমি তার আচরণে ধৈর্যধারণ করতাম এবং তার দুর্ব্যবহার সহ্য করতাম, তাই আল্লাহ তাায়ালা আমার ধৈর্য ও সহ্যের বিনিময় ওই বাঘটিকে আমার অনুগত করে দিয়েছিলেন। সে মারা যাওয়ার পর আমি এ ভদ্র নারীকে বিয়ে করেছি এবং তার সঙ্গে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে
বসবাস করছি। বিয়ের পর থেকেই বাঘটি কেটে পড়েছে। যেহেতু আমি এ আনুগত্যশীল নারীর সঙ্গে শান্তিতে ঘরে সময় কাটাই, সেহেতু আমাকে কাঠ কেটে ঘাড়ে করে বহন করতে হয়।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তার পছন্দনীয় কাজগুলো ধৈর্যের সঙ্গে করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে