Alexa শারদীয় দুর্গাপূজার তাৎপর্য

ঢাকা, শনিবার   ১৯ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৩ ১৪২৬,   ১৯ সফর ১৪৪১

Akash

শারদীয় দুর্গাপূজার তাৎপর্য

 প্রকাশিত: ১৯:৫৪ ৬ অক্টোবর ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

বাঙালির বার মাসে তের পার্বণ- প্রবাদ এমনটিই। আর তের পার্বণের মধ্যে শারদীয় দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রেষ্ঠ ও সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। 

শরৎকালের প্রথম শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে মহালয়ার দিনে দেবীঘট স্থাপন করে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। এরপর ষষ্ঠী তিথি থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত চলে পূজার্চনাসহ ধর্মীয় সব আচার। আর পক্ষকাল অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন ধর্মীয় ও লৌকিক পার্বণ-অনুষ্ঠানাদি। শরৎকালের এ পক্ষকে দেবীপক্ষও বলা হয়ে থাকে। শাস্ত্রে আছে, দেবীদুর্গা হিমালয়বাসিনী দক্ষরাজার কন্যা। পিতৃগৃহে আগমন উপলক্ষে ষষ্ঠীর দিনে বিজয়শঙ্খধনির মাধ্যমে মর্ত্যলোকে মা দুর্গার আগমনকে স্বাগত জানানো হয় এটিই দেবীর বোধন। এরপর যথাক্রমে মহা সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ, অষ্টমীতে কুমারী ও সন্ধিপূজা এভাবে নবমী পার হয়ে দশমীর দিনে দেবী বিসর্জন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও পক্ষকাল চলে বিজয়া পুনর্মিলনী উপলক্ষে বিভিন্ন লোকজ উৎসব। এগুলো সবই উৎসবের উপরিভাগ- লৌকিকতা। পুরাণে দেবী দুর্গার আবির্ভাব তত্তে¡ বলা হয়েছেÑসমাজের সব অশুভ শক্তির বিনাশে দেবী দুর্গার মর্ত্যে আবির্ভাব। ত্রেতাযুগে অসুরদের দাপটে সমগ্র মানবজাতি যখন উৎকণ্ঠিত তখন মানবকল্যাণে ধরাধামে আবির্ভূত হন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র। তিনি পিতার আদেশে বনবাস যাপনকালে লঙ্কেশ্বর রাবণ তাঁর পতœী সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় লুকিয়ে রাখেন। লঙ্কাপুরী থেকে প্রিয়তমা পত্নী সীতাকে উদ্ধারের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশে শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে দুর্গা দেবীকে মর্ত্যে আহবান করেন। ‘বোধন’ শব্দের অর্থ জাগ্রত করা। বসন্তকালের পরিবর্তে শরৎকালে আহবান করায় এ পূজাকে অকালবোধন বলা হয়। এর প্রেক্ষিতেই শরৎকালে দুর্গা পূজার প্রচলন হয়। 

দেবী দুর্গার সৃষ্টি-রহস্য সমৃদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থ শ্রীশ্রীচণ্ডীতে উল্লেখ আছে, ব্রহ্মা মহিষাসুরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দিয়েছিলেন- কোনো পুরুষ তোমাকে বধ করতে পারবে না। ব্রহ্মার বর পেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে মহিষাসুর। একে একে বিতাড়ন করেন স্বর্গের সব দেবতাদের। উপায়ন্তর না পেয়ে দেবতারা অবশেষে ব্রহ্মার স্মরণাপন্ন হন। কিন্তু কী করবেন তিনি। নিজের দেয়া বর ফেরাবেন কি করে? এ অবস্থায় শিব ও অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে ব্রহ্মা যান স্বয়ং বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণু তাদের দুর্দশার কথা শুনে দেবতাদের বলেন, দেবতাদের নিজ নিজ তেজকে জাগ্রত করতে হবে। তখন দেবতাদের সমবেত তেজের মিলনে আবির্ভূত হবে এক নারী মূর্তি। সেই নারীই বিনাশ করবে মহিষাসুরকে। বিষ্ণুর নিকট থেকে সবকিছু অবগত হয়ে দেবতারা হিমালয়ের পাদদেশে পূণ্যসলিলা গঙ্গার সামনে এসে প্রার্থনা শুরু করেন। দেবতাদের সম্মিলিত তেজরাশি থেকে দশদিক আলোকিত করে আবির্ভূত হন এক নারীমূর্তিÑইনিই দেবী দুর্গা নামে অভিহিত। তিনি আবির্ভূত হন দশভূজা রূপে। তখন দেবীর মুখাবয়ব তৈরি করেন শিব, মধ্যাঙ্গ নির্মাণ করেন ইন্দ্র, বক্ষদেশ সৃষ্টি করেন সোম, আর ব্রহ্মা তৈরি করেন দাঁত। দেবীর নিম্নাঙ্গ সৃষ্টি করেন মর্ত্য, বরুণ তৈরি করেন উরু ও হাঁটু, আর অগ্নি রূপায়িত করেন তাঁর জলন্ত দৃষ্টি। এরপর সকল দেবতারা নিজ নিজ অস্ত্র দান করেন সেই নারীমূর্তিকে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে শিবের ত্রিশূল, বরুণের শঙ্খ, অগ্নি শীতঘ্নিশক্তি, সূর্যের তীর ও ধনু, পবনের ত‚ণ, ইন্দ্রের বজ্র, যমের কালদণ্ড, ব্রহ্মার কুমণ্ডল, বিষ্ণুর চক্র কুবেরের রতœহার, হিমালয়ের সিংহ। তারপর যুদ্ধের মাধ্যমে মহিষাসুরকে তিনি বধ করেন। দেবতাদের সব দুর্গতি বিনাশ করায় তিনি দুর্গা দুর্গতিনাশিনী, মহিষমর্দিনী এবং অসুরদলনী নামেও পরিচিত। বৈদিক সূত্রে এ দেবীর উল্লেখ আছে।

পুরাকালে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল বসন্তকালে। এ সময় দেবী দুর্গা ‘বাসন্তী’ নামে পূজিত হতেন, এখনো বাসন্তী পূজার প্রচলন আছে। হেমন্তকালে জগদ্বাত্রী ও কাত্যায়নী নামেও এ দেবী পূজিত হন। তবে শরৎকালের শারদীয় পূজা হিন্দু সমাজ সাড়ম্বরে অর্থাৎ জাতীয় উৎসব হিসাবে পালন করে থাকে। শরৎকালের এই মনমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতর ঢাক-ঢোল নৃত্যগীত, উলু আর শঙ্খধ্বনি, মণ্ডপে-মণ্ডপে ধূপের ধোয়া আর পুরোহিতের কণ্ঠে শ্রীচণ্ডীর শ্লোকের সুরের মায়াবী আবেশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তৈরি হয় এক স্বর্গীয় পরিবেশের।

সত্যযুগে রাজ্যহারা সুরথ রাজা এবং গৃহত্যাগী সমাধি বৈশ্য তাদের মনবাঞ্ছা পূরণের জন্য দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। এ দেবীর আদি উৎস অনুমান করা হয়- এ দেবী এসেছেন অনার্য সভ্যতা থেকে। আর্যরা মূর্তিপূজারী ছিলেন না, ছিলেন শক্তি ও প্রকৃতির পূজারী। অগ্নি, ইন্দ্র ও বরুণদেব ছিল তাদের প্রধান পূজ্যদেবতা। এসব দেবতার কোনো মূর্তি তৈরি করা হতো না, বেদীমূলে হোমাগ্নিতে তাদের নামে ঘৃতাহুতি দেয়া হতো। সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কৃত হওয়ার পর মহেঞ্জদারো-হরপ্পায় প্রাপ্ত নিদর্শনাদি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, ওই সময় মূর্তি পূজার প্রচলন ছিল। আর্র্য-অনার্যের মিশ্রণে হিন্দুধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, আর্যরা অনার্যদের মূর্তিপূজা গ্রহণ করে। এর পরবর্তী সময়ে দেবীকে মৃন্ময়ীরূপে চিন্তা করে মাটির মূর্তি তৈরি করে পূজা শুরু হয়।

শ্রীদুর্গা সব শক্তির আধার। শক্তির তিনটি উৎস যথাক্রমে পেশীবল বা সামরিক শক্তি, জ্ঞানশক্তি এবং ধনশক্তি। শ্রীদুর্গা এ তিন শক্তির বলে বলীয়ান। পশুরাজ সিংহ তার বাহন, সঙ্গে রয়েছে দেব সেনাপতি কার্তিক, জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতী, ধনভাণ্ডারের দেবী মা লক্ষ্মী, শিরোদেশে বিরাজমান দেবাদিদেব মহাদেব ভ্যূলোক-দ্যুলোক-গোলকভেদী তার আয়ত ত্রিনয়ন, সর্বভূতে প্রসারিত তার দশহস্ত এবং সঙ্গে রয়েছে সিদ্ধিদাতা গণেশ। পৌরাণিক কাহিনীতে আরো ব্যাখ্যা আছে যে, যোগীময় পুরুষ হলেন দেবাদিদেব মহাদেব যিনি বাস করেন হিমালয়ের কৈলাশে আর পার্বতী হলেন তার সহধর্মীনি। তিনিই স্বয়ং দুর্গা, উমা-সতী প্রভৃতি নামেও আখ্যায়িত। মধ্যযুগে মানুষ ছিল মূলত শক্তির পূজারী। আবহমানকাল ধরে অনুসন্ধানী মানুষ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শক্তির উৎসগুলোর সন্ধান করেছে। সে কারণে মা দুর্গা পূজিত হন শক্তিদাত্রী দেবী হিসাবে। যে কারণে শ্রী দুর্গা অদ্বিতীয়া। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবের পক্ষেও যা পারা সম্ভব নয়, সেসব গুরুতর সমস্যা সমাধানের জন্য তাই দারস্থ হতে হয় শ্রী দুর্গার চরণ যুগলে। এভাবে শ্রী দুর্গা পরিণত হন জগৎ জননীতে, পরিণত হন মহামায়া আদ্যাশক্তিতে। 

দুর্গোৎসবের মাধ্যমে অশুভ শক্তি দুরীকরণের প্রচেষ্টা সামাজিক রীতি। ফলে এ উৎসব যথাযথভাবে পালিত হলে সমাজ থেকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দারিদ্র্য দুর হয়ে দয়া, মায়া-প্রেম-প্রীতি বৃদ্ধি পেয়ে গড়ে উঠবে এক আদর্শ সমাজ- এমন বিশ্বাস রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে।  দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গা সব দুর্গতি নাশ করে থাকেন। তাইতো ভক্তের প্রার্থনা ‘রূপং দেহি, জয়ং দেহী, যশো দেহি, দিশো জহী।’ মা তুমি আমাদের রূপ দাও, জয় দাও মা, যশ দাও মা এবং আমাদের সব শত্রু ধ্বংস করো। আসুরিকতা, অপবিত্রতা দুর করে সর্বত্র সুরতা পবিত্রতা এনে আমাদের মধ্যে যে দেবতা আছে তার বিকাশ ঘটাও। মা-মাটি-মানুষ নিয়ে আমরা বাংলা মায়ের সন্তান, এ গর্ববোধে আমাদের প্রত্যেককে উজ্জীবিত করুন। মাতৃ-আরাধনার মধ্য দিয়ে অর্জিত হোক ত্যাগ ও সেবার প্রেরণা, সর্বজীবে সমত্ববোধ, ঈশ্বরানুভূতি। মৃত্যু হোক সব সঙ্কীর্ণতার, সব গোড়ামির। আমরা দীক্ষা নিই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অখণ্ড মানবতাবাদের। মহাশক্তির কৃপায় আনন্দময় হয়ে উঠুক আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন। সেই সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হোক- এমন প্রত্যয়ই ব্যক্ত হয়ে থাকে শারদোৎসবে সমবেত ভক্তকূলের। 

দুর্গাপূজার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বলা যায়- তমগুণসম্পন্ন আসুরিক শক্তির বিনাশের নিমিত্তেই মহাশক্তি শ্রীদুর্গার আবির্ভাব। আমরা বর্তমানে যে সমাজে বসবাস করছি সে সমাজেও আসুরিক শক্তির ভয়াবহ উত্থান লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। মানুষে-মানুষে, ধর্মে-ধর্মে ভেদরেখা টানতে এক শ্রেণির সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উল্লম্ফন ঘটেছে। যা আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ক্ষত সৃষ্টি করে চলেছে। এদের অপশক্তিকেই আসুরিক শক্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে। আবার আসুরিক শক্তিরও রয়েছে নানা রূপ। যে অশুভ শক্তি জগৎ সংসারে শান্তি-শৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটায় সেটি একরকম আসুরিক শক্তি। আবার আসুরিক শক্তির ভয়ঙ্কর অন্য একরূপ নিহিত থাকে প্রতিটি মানুষের মধ্যে। ষড়রিপুর মধ্যে। কু-প্রবৃত্তির তাড়নায় মানুষ যেমন নিজেকে অধঃপতনের দিকে ধাবিত করে, তেমনি এর দ্বারা কলুষিত হয় সমাজ-সংসার-রাষ্ট্র। বাইরের শত্রæর শক্তির তুলনায় ভেতরের এই শক্তির ক্ষমতা অনেক বেশি। সুতরাং দুর্গতিনাশিনী দুর্গার আশির্বাণী নিয়ে বাইরের এবং ভিতরের সব অপশক্তির বিনাশ ঘটাতে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। পাশাপাশি সন্ত্রাস, দুর্নীতিমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থা গড়ার জন্যও মনোনিবেশ করা অপরিহার্য। ধর্মীয় আচারাদির বাইরে এসব সামাজিক শুভ মনোবৃত্তির মধ্যেও শারদীয় দুর্গা পূজার প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর