Alexa যুবতী নারীকে বলি দিতেই নীল নদ পানিতে ভরে উঠত!

ঢাকা, শুক্রবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ৮ ১৪২৬,   ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪১

Akash

যুবতী নারীকে বলি দিতেই নীল নদ পানিতে ভরে উঠত!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৬ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৫১ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

‘নীল নদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো নদ-নদীর নেই।’ কথাটি বলেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক ইবনে সিনা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নীল নদের উৎপত্তিস্থল থেকে শেষ প্রান্তের মাঝে এর দূরত্ব সর্বাধিক।

এটি প্রবাহিত হয় বড় বড় পাথর ও বালুময় প্রান্তরের উপর দিয়ে। যাতে কোনো  শ্যাওলা ও ময়লা-আবর্জনা নেই। তার মধ্যে কোনো পাথর বা কংকর সবুজও হয় না। মিশরের নীল নদ পৃথিবীর সপ্তাশ্চার্যের একটি। নীল নদকে প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় বলা হয় ইতেরু। এটি আফ্রিকা মহাদেশের একটি নদী। বিশ্বের দীর্ঘতম এ নদীর রয়েছে দুইটি উপনদী। একটি শ্বেত নীল নদ ও অন্যটি নীলাভ নীল নদ। 

এর মধ্যে শ্বেত নীল নদ দীর্ঘতর। শ্বেত নীল নদ আফ্রিকার মধ্যভাগের হ্রদ অঞ্চল হতে উৎপন্ন হয়েছে। উত্তর দিকে তাঞ্জানিয়া, লেক ভিক্টোরিয়া, উগাণ্ডা ও দক্ষিণ সুদানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নীল নদ। ইথিওপিয়ার তানা হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়ে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে সুদানে প্রবেশ করেছে। দুইটি উপনদী সুদানের রাজধানী খার্তুমের নিকটে মিলিত হয়েছে।    

অতীতের নীল নদনীলের উত্তরাংশ সুদানে শুরু হয়ে মিশরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত, প্রায় পুরোটাই মরুভূমির মধ্য দিয়ে। মিশরের সভ্যতা প্রাচীনকাল থেকেই নীল নদের উপর নির্ভরশীল। মিশরের জনসংখ্যার অধিকাংশ এবং বেশিরভাগ শহরের অবস্থান আসওয়ানের উত্তরে নীলনদের উপত্যকায়। প্রাচীন মিশরের প্রায় সমস্ত সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও এর তীরেই অবস্থিত।

বিশাল ব-দ্বীপ সৃষ্টি করে নীলনদ ভূমধ্যসাগরে গিয়ে মিশেছে। বলাবাহুল্য যে,নদীটির পানির স্বচ্ছতার কারণেই এই রকম হয়ে থাকে। এছাড়াও আর সব নদ-নদীর পানি যখন কমে যায়, এর পানি তখন বৃদ্ধি পায়। আর অন্যসব নদীর পানি যখন বৃদ্ধি পায়, এর পানি তখন কমে যায়। তবে বর্তমানে যে নীল নদ দেখা যায় তার পেছনে রয়েছে অনেক গল্প।

নীল নদপ্রচলিত মিথ অনুযায়ী, এক সময় নীল নদের পানি প্রবাহের জন্য এখানে সুন্দরী নারীকে উৎসর্গ করা হতো। ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দের আগ পর্যন্ত মিশরীয়রা খ্রিস্টান ছিল। এ সময়ে মিশরের এই নীল নদ প্রতি বছর শুকিয়ে যেত। সেসময় মিশরীয়রা একটি কুসংস্কার মেনে চলত। সেটি ছিল শুকিয়ে যাওয়া নদীতে কোনো পিতামাতাকে রাজি করিয়ে তাদের সুন্দরী, ষোড়শী এবং কুমারী মেয়েকে অলংকার ও সুন্দর পোশাক পরিয়ে নীল নদের শেষ সীমানায় যেখানে ডুবন্ত পানি থাকত সেখানে ভাসিয়ে দেয়া হতো। 

এদিনটিকে তারা ঈদের দিনের মতো আনন্দে পালন করতো। রাজা বাদশাহরা নিজেরা উপস্থিত থেকে সব আয়োজন তদারকি করতেন। উৎসবে কবিতা আবৃত্তি থেকে শুরু করে গান, নাচ সবই করতো। এদিন সাদা গরুর বাছুর ও মুরগি জবাই করা হত ভোজের জন্য। সবই সাদা রঙের হতো। অন্য রঙের কোনো কিছু তারা জবাই করতো না। তাদের ধারণা ছিল নীল নদকে এসব উপহার দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে। না হয় নীল নদ আর পানি প্রবাহ করবে না। এই নিষ্ঠুর নারী বলি প্রথা মিশরে যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল। 

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) খেলাফতের সময় বিখ্যাত সাহাবি হজরত আমর ইবনে আছা (রাঃ) নেতৃত্বে ইসলাম কায়েমের জন্য ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে যখন মিশর বিজয়ী হলো। তখন তিনি নীল নদের এই নারী বলি দেয়ার ঘটনায় খুব মর্মাহত হন। মিশরীয় একদল লোক প্রতি বছরের মতো এবারো নারী বলি দেয়ার অনুমতি আনতে বিখ্যাত সাহাবি হজরত আমর ইবনে আছা (রাঃ) কাছে যায়।

তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাদের জানান, ইসলাম কখনো এ ধরণের কুসংস্কার সমর্থন করে না। অন্যায়ভাবে কোনো মানুষের জীবন এভাবে জলাঞ্জলি দেয়া ইসলামে কখনোই বৈধ হবে না। এটি ইসলাম ছাড়াও তিনটি আসমানি ধর্মেই সমর্থন করে না। কোথাও এভাবে নারী বলি দেয়ার নিয়মের বৈধতা নেই।  

বর্তমানের নীল নদসে বছর ঘটনাক্রমে দেখা গেল, নীল নদে পানি আসেনি। তখন চাষাবাদের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি হয়। এমনকি যাদের পেশা চাষাবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে। আবার অনেকেই পুনঃরায় নীল নদকে সন্তুষ্ট করতে এক কুমারীকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। হজরত আমর ইবনে আছা (রাঃ) তৎক্ষণাত চিন্তিত হয়ে খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) কাছে সমাধান চেয়ে বিশেষ দূত পাঠান।

সব ঘটনা জানতে পেরে খলিফা কুমারী উৎসর্গ করার রীতি বন্ধ করায় খুশি হন এবং সাহাবিকে ধন্যবাদ জানান। মহান আল্লাহ তায়ালার নামে একটি পত্র লিখেন খলিফা হজরত ওমর (রাঃ)। এরপর তিনি দূতের মাধ্যমে মিশরের সাহাবি হজরত আমর ইবনে আছা (রাঃ) কাছে পত্রটি পাঠান। পত্রের মধ্যে ছিল ছোট্ট একটি চিরকুট। আর পত্রে লেখা ছিল শুকিয়ে যাওয়া নীল নদের মাঝখানে চিরকুটটি রেখে দ্রুত চলে আসতে।

খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) এর নির্দেশ অনুযায়ী, চিরকুটটি সাহাবি হজরত আমর ইবনে আছা (রাঃ) নীল নদের মাঝখানে রেখে আসেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, চিরকুটটি রেখে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নীল নদ পানিতে পূর্ণ হতে শুরু করল। একরাতের মধ্যেই ১৬ গজ উচ্চতায় পানির প্রবাহ শুরু হয়ে গেল। যা অন্য সময়ের তুলনায় ছয় গজ বেশি। সেই থেকেই নীল নদের পানি প্রবাহ শুরু হয়ে আজো তা প্রবাহমান রয়েছে।  

নীল নদের সৌন্দর্যসেই চিরকুটে খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) কী লিখেছিলেন?  

সেই চিরকুটটি খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) নীল নদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন। তাতে লেখা ছিল, আল্লাহর বান্দা,  মুমিনগণের আমীর খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ) পক্ষ থেকে মিশরের নীল নদের প্রতি, ‘তুমি যদি তোমার ইচ্ছায় প্রবাহিত হও। তবে তোমার প্রবাহিত হবার কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি তোমার জারি হওয়ার, প্রবাহিত হওয়ার ক্ষমতা মহান আল্লাহ তায়া’লার পক্ষ থেকে হয় তবে মহান রাব্বুল আল-আমিনের দরবারে মিনতি জানাই। তিনি যেন তোমাকে জারি করে দেন।’

আধ্যাত্নিক ক্ষমতার অধিকারী খলিফা হজরত ওমর ফারুখ (রাঃ)র সেই চিরকুটের দ্বারা নীল নদের সেই সমস্যা আজীবনের জন্য দূরীভূত হয়। এতে বহু যুবতী নারীর প্রাণ রক্ষা পায়। মিশরবাসী অনেক বড় কুসংস্কারের হাত থেকে চিরজীবনের মতো মুক্ত হয়। এরপর থেকেই মিশরের নীল নদে সারা বছরই পানির প্রবাহ থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস