ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

চায়নার জীবনযুদ্ধের হৃদয় কাঁপানো গল্প

আন্তর্জাতিক নারী দিবস
মো. আবু কাওছার আহমেদ, টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ১৩:৪৪, ৮ মার্চ ২০২০
চায়নার জীবনযুদ্ধের হৃদয় কাঁপানো গল্প
চায়না (ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ)

চায়না বেগম। বয়স চল্লিশের কোটা পার করেছে অনেক আগেই। সফলতা নেই তবুও পিছনের পুরো সময়টা কাটিয়েছেন বেঁচে থাকার সংগ্রামে। সময়ের বিবর্তনে নারীদের অবস্থার পরিবর্তন হলেও বদলায়নি চায়নাদের প্রেক্ষাপট। ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি কেটে যায় তিনবেলার খাবার জোগাড়ে।

টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবের সামনে খোলা আকাশের নিচে চায়নার চায়ের দোকান। চায়ের চুমুকে প্রায়ই কথা হয় চায়নার সঙ্গে। চায়নার লম্বা সময়টা একটি জীবনযুদ্ধের গল্প। ঘণ্টা বাজিয়ে প্রতি বছর নারী দিবস উদযাপন হলেও চায়নাদের মতো নারীদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে না। জীবনযুদ্ধে চায়না এখন অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

চায়ের দোকান চালাতে শহরের আকুরটাকুর পাড়ায় এক কক্ষের ভাড়া বাসা নিলেও চায়নার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সহদেবপুর ইউপির গোঁপিনাথপুর গ্রামে। চায়নার বাবা সামাদ ফকিরের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অল্প বয়সেই মধপুরের শাহজাহানের সঙ্গে চায়নাকে বিয়ে দেন। বিয়ের দুই বছরের মাথায় চায়নার কোলে এক মেয়ে সন্তান দিয়ে চায়নার স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। মেয়ে ফাতেমাসহ পুরো সংসারের দায়িত্ব পড়ে স্বামীহারা চায়নার কাঁধে। শুরু হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
 
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশগ্রাম ছেড়ে চলে আসেন শহরে। সেই থেকে খোলা আকাশের নিচে চায়নার চায়ের দোকান। সকাল থেকে সন্ধ্যা টানা চায়ের দোকানে থাকেন তিনি। প্রেস ক্লাবে কোনো অনুষ্ঠান থাকলে কয়েক কাপ চা অনায়েশে বিক্রি করতে পারেন। অন্যথায় কেটলির পানি গরম করেই সময় কাটাতে হয়। সেই ২০০২ সাল থেকে কেটলি আর কাপের সঙ্গে চায়নার সম্পর্ক। তবুও দিনের উপার্জনে রাতে চুলো জ্বালানো কষ্টকর। দোকানের সামনেই প্রায়ই ঘটে মিছিল-মিটিং আর মানববন্ধন। এই সময়টাতেও চায়নাকে ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কেটলির পাশে। অনেক সময় বিপাকেও পড়তে হয় চায়নাকে। তবে ফুটপাতের এই চায়ের দোকানের উপার্জনই বড় করেছে চায়নার মেয়ে ফাতেমাকে।

Advertisement

ফাতেমা বড় হয়ে চায়নার পাশে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা থাকলেও হয়েছে তার উল্টো। চায়নাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে চায়নার বাবা যে ভুলটা করেছিল তেমন ভুলটাই করেছে চায়না। চায়না তার মেয়ে ফাতেমাকেও অল্প বয়সেই সন্তোষের আল-আমিনের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। দুই কন্যা সন্তান হওয়ার পর ফাতেমার প্রবাসী স্বামীও খোঁজ-খবর নিচ্ছেন না তার। ফলে ফাতেমার সঙ্গে দুই নাতনির দায়িত্বও পড়েছে চায়নার কাঁধে।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশজীবনযুদ্ধে টিকে থাকাটা আরো কঠিন হয়েছে। চায়ের দোকানের উপার্জনে সংসার যেন চলছেই না। ফলে চায়নার মেয়ে ফাতেমা চায়ের দোকানের পাশেই সাত্তার শপিংমল নামের একটি শো-রুমে সেলসম্যানের কাজ নিয়েছেন। এখন শিশু নাতনি দুটিকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চায়না। প্রায়ই দেখা যায় শিশু নাতনিকে কেটলির পাশেই টেবিলে ঘুম পাড়িয়ে কাজ করছেন। ফাতেমা কাজ করছে শো-রুমে। এমন চিত্র অনেকেরই বিবেককে নাড়া দেয়।

চায়না জানান, এভাবে জীবন সংগ্রামে কেটেছে তার ১৮ বছর। অনাহারে-অর্ধহারে কাটছে। খোলা আকাশের নিচে চায়নার চায়ের দোকান জীবনের জন্য যেন এক অনিশ্চয়তা। ঝড়-বৃষ্টিতে বন্ধ রাখতে হয় তার ছোট্ট দোকানটি। চায়ের চুলো না জ্বললে বাড়ির চুলো জ্বালানোও কঠিন হয়ে পড়ে তার। এখন প্রয়োজন একটি স্থায়ী দোকান। যেখানে উপার্জনের একটি পথ নিশ্চিত হবে। অল্প আয়ে ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হতে হচ্ছে। এখন প্রায় দেড়লাখ টাকার কিস্তি টানতে হচ্ছে চায়নাকে। এমন অবস্থায় বড়ই ক্লান্ত চায়না। জীবনের ক্লান্তির অবসান পেতে পথ খুঁজছেন তিনি। কবে তারা ভাগ্যের চাকা উল্টো দিকে ঘুরবে এমন প্রত্যাশায় চায়না চালিয়ে যাচ্ছেন জীবন সংগ্রাম।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!