‘এলো খুশির ঈদ’ গানের গীতিকার ও সুরকারের জন্মদিন এবার ঈদের দিনই

ঢাকা, শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৬ ১৪২৭,   ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

‘এলো খুশির ঈদ’ গানের গীতিকার ও সুরকারের জন্মদিন এবার ঈদের দিনই

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৫১ ২৪ মে ২০২০   আপডেট: ১৩:৩৮ ২৪ মে ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।’ এই গানটি কখনো পুরনো হবে না। কালজয়ী এই ইসলামিক সংগীত যুগের পর যুগ ধরে বেজে আসছে, তবুও আমরা মুগ্ধ হয়েই শুনছি। ঈদ আসলেই ছোট বড় সবাই গেয়ে ওঠে গানটি। 

এই গান ছাড়া যেন প্রত্যেক বাঙালি মুসলমানদের ঈদ উৎসব পূর্ণ হয় না। তবে জানেন কি? এই গানটিই বাংলা ভাষার প্রথম ইসলামিক গান। কবি কাজী নজরুল ইসলাম অনেক ইসলামিক গান লিখেছেন তার মধ্যে এটিই সর্বপ্রথম প্রকাশিত সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হিসেবে বিবেচিত। এই গানটি আজো মুসলমানদের অন্তরে ছুঁয়ে যায়। এবছরের ঈদ ও কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন ঠিক একই দিনে হতে যাচ্ছে। আজকের লেখায় থাকছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সব ইসলামিক গানগুলো রচনার আদ্যোপান্ত- 

দুঃখু মিয়ার কবি হিসেবে বেড়ে ওঠা

১৮৯৯ সালে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের বর্ধমান জেলার (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে) আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারে ২৫ মে জন্ম নেন কবি। কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া। নজরুল গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। মক্তবে (মসজিদ পরিচালিত মুসলিমদের ধর্মীয় স্কুল) কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। 

১৯০৮ সালে তার পিতার যখন মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স মাত্র নয় বছর। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। মাত্র ১০ বছর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজে নামতে হয় দুখু মিয়াকে। বরেণ্য এ কবি নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন। কখনো মসজিদের ইমামতি, মাজারের খাদেমগিরি, চায়ের দোকানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে তাকে। 

কাজী নজরুল ইসলামআসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটির কাজ করার সময় সেখানে কর্মরত দারোগা রফিজ উল্লাহর সঙ্গে পরিচয় হয় নজরুলের। তিনি কিশোর নজরুল নিয়ে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। এটা ১৯১৪ সালের কথা। মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে ১৯১৭ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন নজরুল ইসলাম। এরপর সাংবাদিক হিসেবে পথচলা শুরু হয় তার। তখন তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। 

এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন ‘বিদ্রোহী’ এবং ‘ভাঙার গানের’ মতো কবিতা; ‘ধূমকেতুর’ মতো সাময়িকী। জেলে বন্দী হওয়ার পর লিখেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, এই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। 

বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল, এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামা সংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় তিন হাজার গান রচনা করেছেন। অধিকাংশ গানেরই সুরারোপ করেছেন তিনি। যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা নজরুল গীতি নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।

ইসলামি গান রচনায় নজরুল

কবি কাজী নজরুলের ইসলামি গান রচনার শুরুটা একেবারেই মসৃণভাবে ঘটেনি। প্রখ্যাত লোক-সংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদের অনুরোধে তিনি ইসলামি গান লেখা শুরু করেন। নজরুল তখন এক গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আব্বাস উদ্দীনের উৎসাহে কবি ইসলামিক গান লেখার ইচ্ছা পোষণ করেন। তবে ওই গ্রামোফোন কোম্পানির মালিক ভগবতী ভট্টাচার্য এর মতও নিতে হবে। এই দায়িত্ব নিলেন আব্বাস উদ্দীন। তবে মালিক সোজা না করে দিলেন। এ ধরনের রেকর্ড বের করে তিনি লোকসান করতে চান না বলে সাফ জানিয়ে দেন!

সৈনিক নজরুলআব্বাস উদ্দীন ভগবতী বাবুর পেছনে লেগেই রইলেন।  জানালেন, অন্তত একটা গান পরীক্ষামূলকভাবে বের তো করা যেতেই পারে। আর যদি গানটি বিক্রি না হয়ে তবে ইসলামিক গান আর নেবেন না, ক্ষতি কী? এভাবেই নাছোড়বান্দা হয়ে ভগবতী ভট্টাচার্যকে রাজি করান আব্বাস উদ্দীন। আর এই সুসংবাদ জানতেই খাতা কলম নিয়ে ইসলামিক গান লিখতে বসে পড়লেন কবি নজরুল। কোন গানটি জানেন? ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’

এই গানের পরদিনই নজরুল আরেকটি গান রচনা করে দেন, ‘ইসলামেরই ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর।' গান দুটো ১৯৩১ সালের নভেম্বরে রচিত ও সুরারোপিত হয়। পরের বছর রমজান মাসে ধারণ করা হয়। ঈদের আগেই গানটি বাজারে প্রকাশ করা হয়। আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে নজরুলের লেখা বিখ্যাত দুটি ইসলামিক সঙ্গীত ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি বাজারে প্রকাশের পর দেখা গেলো, রেকর্ডটি সুপার-ডুপার হিট করেছে। 

ছেঅট থেকে বড় সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ‘এলো খুশির ঈদ’ গানটি। নজরুল আসলেই ইসলামি গানের রেকর্ড নিয়ে বেশ উত্তেজিত ছিলেন। তার অন্যান্য গানের মতো ইসলামি গানও সফল হওয়ায় তার চোখে মুখে আনন্দ ভেসে ওঠে। ওদিকে ভগবতী বাবুও খুশি। প্রকাশনার অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই হাজারো রেকর্ড বিক্রি হয়ে গেছে। এবার সেই ভগবতী ভট্টাচার্যই কবিকে অনুরোধ করলেন এরকম আরো কয়েকটি ইসলামি গান রচনার জন্য! এভাবেই শুরু হয়লো নজরুলের ইসলামি গান রচনার অভিযাত্রা।

তবে নজরুল যে এবারই প্রথম ইসলামি গান লিখলেন তা কিন্তু নয়। অনেক ছোটবেলাতেই লেটো গানের দলে যোগ দিয়েছিলেন নজরুল। সেখানে নানা ধরনের গানের পাশাপাশি ইসলামি ভাবাদর্শের সংগীতও তিনি রচনা করেছিলেন। এরকমই একটি গান, ‘নামাজী, তোর নামাজ হলো রে ভুল/ মসজিদে তুই রাখলি সিজদা ছাড়ি ঈমানের মূল।’

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামএছাড়া পরিণত জীবনে ‘বাজলো কী রে ভোরের সানাই’ শিরোনামের ইসলামি গানের মাধ্যমেই তিনি মূলত তার সংগীত যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছিলেন। লোকসংগীতের ধাচে রচিত তার ‘সদা মন চাহে যাবো মদীনায়’ গানটি কিংবদন্তী শিল্পী আবদুল আলীমের কণ্ঠে গীত হয় ১৯২৯ সালেই। ইসলাম ধর্মের শিক্ষা ছোটবেলাতেই নজরুলের মনে এমনইভাবে অঙ্কিত হয়েছিলো, যার ছাপ পাওয়া যায় তার ইসলামি সংগীতগুলোতে। 

ইসলামি নজরুল সংগীতের বৈচিত্র্যতা

ইসলাম ধর্মের মৌলিক অনুষঙ্গগুলোর প্রায় সব বিষয়েই নজরুল ইসলামি গান লিখেছেন। তাওহীদ, রিসালাত, হামদ-নাত, আজান, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, শবে মিরাজ, শবে বরাত, শবে কদর, রমজান, ঈদ, মহররম, ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, জাগরণী গান, ইসলামের সাম্যের শিক্ষা, অমর ব্যক্তিত্ব, মুসলিম নারীর মর্যাদা- কী এমন বিষয় নেই, যা নিয়ে তিনি সংগীত রচনা করেননি!    

নজরুলের ইসলামি গানের সুর-বৈচিত্র্য

ইসলামি সংগীত রচনার ক্ষেত্রে ভাব ও সুরের সম্মিলন নজরুলের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি অসংখ্য ইসলামি গান রচনা করেছেন গজল আঙ্গিকে। দাদরা, কাহারবা, ঠুমরি কিংবা পল্লীর লোকসংগীতের ঢঙেও তিনি অনেক ইসলামি গান রচনা করেছেন। কিছু কিছু গানে তিনি বিদেশি সুরও অনুকরণ করেছেন। যেমন- তার বিখ্যাত নাতে রাসূল,

‘ত্রিভূবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়/ আয় রে সাগর আকাশ-বাতাস দেখবি যদি আয়।’ এই গানে তুরস্কের বিখ্যাত ‘কাটিবিম ইশকাদার’ গানটির সুর অনুকরণ করা হয়েছে। মূল এই গানটি প্রায় ৫০০ বছরের মতো পুরানো। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় গানটির সুর অনুকরণ করে গান রচনা করা হয়েছে। একটি আরবি গানেও এই সুর চয়িত হয়েছে। 

তার লেখা বেশিরভাগ গানের সুর তিনি নিজেই করেছেন খুব সম্ভবত, নজরুল এই আরবি সংস্করণ থেকেই দ্যোতিত হয়ে এই সুরে বাংলায় গান রচনা করেছেন। দ্রষ্টব্য, কবি এই সুরে আরো একটি গান রচনা করেছেন, সেটিও তুমুল শ্রোতাপ্রিয়- ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’। বাংলা গানে গজলের পথিকৃৎ নজরুল। তার সব গজল ইসলামি নয়; তবে তার অপার্থিব প্রেম বিষয়ক ইসলামি গজলের সংখ্যাও কম নয়। নজরুলের এসব গানে বাংলার পাশাপাশি আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের মিশেল সত্যিকার অর্থেই ইসলামি আবেশ সৃষ্টি করে। 

নজরুল রচিত যতগুলো ইসলামি গান পাওয়া গেছে, তার মোট সংখ্যা প্রায় ২৮০টি। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। তবে যে কয়টি গান পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই বলা যায়, বাংলা ইসলামি গান রচনায় তিনি সর্বাধিক রচয়িতা হিসেবে আজো খ্যাতনামা। তার নিজের লেকা প্রায় ৮০ ভাগ গানের সুর সংযোজন করেছেন নজরুল নিজেই। নজরুলের ইসলামি গানের বাণীগুলো এতটাই ভাবাবেগপূর্ণ যে, এতে একজন বাঙালি মুসলিমের হৃদয়ের একেবারে মনের গহীন আকাঙ্ক্ষা এতে উদ্ভাসিত হয়েছে। 

বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলাম জনপ্রিয় হয়েছেন কবিতা ও গানে। ব্রিটিশ শাসকদের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে কবিতা ও গান লিখে বিদ্রোহী কবি হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসেন নজরুল ইসলাম। রচনা করেন বিদ্রোহী ও ভাঙ্গার গানের মতো কবিতা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রিটিশ সরকার কবিকে জেলে পাঠায়। সেখানে বসে কবি রচনা করেন রাজবন্দীর জবানবন্দী। বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলামের আবির্ভাবকে ধুমকেতুর আত্মপ্রকাশ হিসেবেও দেখেন অনেকে।

কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিনজরুলের শেষ জীবন

গান ও কবিতা লেখার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন, পরিচালনা এবং অভিনয়ও করেছেন নজরুল ইসলাম। ১৯৪২ সালে তিনি আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভার এ কবি পিক্স ডিজিজে আক্রান্ত। এক পর্যায়ে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন চিরবিদ্রোহী এ কবি। 

এতে তার সাহিত্যচর্চা পুরোপুরি থেমে যায়। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন। এসময় তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। এদেশের মাটিতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৭৭ বছর। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস