ইসলামের দৃষ্টিতে রুকইয়া : জায়েজ নাকি নাজায়েজ?

ঢাকা, সোমবার   ০৬ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২২ ১৪২৭,   ১৪ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ইসলামের দৃষ্টিতে রুকইয়া : জায়েজ নাকি নাজায়েজ?

পর্ব-১

ওমর শাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫৫ ৩ জুন ২০২০   আপডেট: ১৫:৫৯ ৩ জুন ২০২০

ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ তুমারকেই রুকইয়া বলে।

ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ তুমারকেই রুকইয়া বলে।

রাসূল (সা.) এর এক প্রসিদ্ধ হাদিস। পূর্ববর্তী নবীদেরর উম্মতকে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পেশ করা হয়, তখন কোনো কোনো নবীর উম্মত ছিল একজন; তার প্রতি একজনই ঈমান এনেছিল। কোনো কোনো নবীর উম্মত ছিল দু’জন, কোনো কোনো নবীর উম্মত ছিল দশজন, কোনো কোনো নবীর সঙ্গে ছিল ছোট একটি দল। কোনো কোনো নবী একাই ছিলেন; তার সঙ্গে কেউ ছিল না, তার প্রতি কেউ ঈমান আনেনি। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে একটি বড় দলকে পেশ করা হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এরা কারা? উত্তরে বলা হলো এরা হজরত মুসা (আ.) এর উম্মত। সংখ্যায় হজরত মুসা (আ.) এর উম্মত অনেক ছিল। এরপর আমার সামনে পেশ করা হলো অনেক বড় একটি দলকে যাদের দ্বারা পুরো মাঠ এবং আশেপাশের পাহাড়গুলোও ছেয়ে গিয়েছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? আমাকে বলা হলো, এরা আপনার উম্মত। এরপর আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি কি আপনার উম্মতকে দেখে খুশি হয়েছেন? আমি উত্তরে বললাম, হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ! হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মতের সংখ্যা এতবেশি দেখে আমি সত্যিই খুশি হয়েছি।

সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে:

এরপর আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সুসংবাদ দিলেন যে,

وَمَعَهُمْ سَبْعُونَ أَلْفًا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ وَلَا عَذَابٍ

আপনি আপনার যে উম্মতকে দেখেছেন এদের মধ্যে সত্তর হাজার লোক এরূপ আছে, যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

এরা কারা? যারা চারটি গুণের অধিকারী হবে, তারাই বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

চারটি গুণের অধিকারী:

প্রথমত যারা ঝাড়-ফুঁক করবে না। দ্বিতীয়ত যারা তপ্ত লৌহশলাকার দাগ দিয়ে রোগের চিকিৎসা করবে না। যখন কোনো চিকিৎসা দ্বারাই রোগ ভালো হত না তখন আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, তারা লৌহশলাকা গরম করে রোগীর শরীরে তা দ্বারা দাগ দিত। তৃতীয়ত যারা কুলক্ষণে বিশ্বাস করে না। চতুর্থত যারা সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে। যাদের মধ্যে এ চারটি গুণ থাকবে তারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশকারী সত্তর হাজার লোকের মধ্যে গণ্য হবে।

তাবিজ-তুমারে বাড়াবাড়ি:

এ হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশকারীদের অন্যতম গুণ হলো তারা ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে চিকিৎসা করে না। বর্তমান যুগে মানুষের মাঝে ঝাড়-ফুঁক এবং তাবিজ-তুমারে বাড়াবাড়ি আছে। কিছু লোক আছে যারা ঝাড়-ফুঁক এবং তাবিজ-তুমারকে একদম বিশ্বাস করে না। তারা এ ধরনের কাজকে সম্পূর্ণরূপে নাজায়েজ মনে করে। কেউ কেউ তো এ ধরনের কাজকে শিরক্ সাব্যস্ত করে। আবার কিছু লোক আছে যাদের ঝাড়-ফুঁক এবং তাবিজ-তুমারে এতটাই ভক্তি ও আস্থা যে, প্রতিটি কাজের জন্য তাবিজ-তুমার গ্রহণ করে থাকে। 

ঝাড়-ফুঁকে গায়রুল্লাহ থেকে সাহায্য চাওয়া:

ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ তুমারকেই রুকইয়া বলে। ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-তুমারকে নাজায়েজ মনে করা আবার যেকোনো কাজেই ঝাড়-ফুঁক বা তাবিজ-তুমার নেয়া, দুটোই বাড়াবাড়ি। ঝাড়-ফুঁক বা তাবিজ তুমারের কোনো মূল্য নেই বা তাবিজ-তুমার নেয়া নাজায়েজ, কোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে এটি ভুল ধারণা। কারণ আলোচ্য হাদিসে যদিও যারা ঝাড়-ফুঁক করে না বা তাবিজ-তুমার নেয় না তাদের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু বাস্তবে এর দ্বারা সর্বপ্রকার ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-তুমার উদ্দেশ্য নয়। বরং আলোচ্য হাদিসে জাহেলি যুগে ঝাড়-ফুঁকের যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল তা নিষেধ করা হয়েছে। 

জাহেলি যুগে বিভিন্ন রকম দুর্ভেদ্য, অস্পষ্ট এবং শিরকি ও কুফরি মন্ত্র পাঠ করা হত। জাহেলি যুগের লোকদের ধারণা ছিল মন্ত্র পড়লেই রোগী সুস্থ হয়ে যাবে কিংবা উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে। সেসব মন্ত্রের মাঝে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুষ্ট জিন ও শয়তানের সাহায্য নেয়া হত। কোনো কোনো মন্ত্রে প্রতিমা থেকে সাহায্য চাওয়ার বিষয় ছিল। এককথায় বলতে গেলে, যে সব ঝাড়-ফুঁক বা তাবিজ-তুমারে জিন বা শয়তানের সাহায্য নেয়া হয় বা এমন দুর্ভেদ্য, অস্পষ্ট ও জটিল মন্ত্র পাঠ করা হয় যার পঠোদ্ধার করা যায় না তা শরীয়তে নিষেধ। কিন্তু যদি কোরআন ও হাদিসের আয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে ঝাড়-ফুঁক করা হয়, সেগুলো সর্বম্মতভাবেই জায়েজ।

ঝাড়ফুঁকের শব্দগুলোকে প্রভাবসৃষ্টিকারী মনে করা:

জাহেলি যুগে ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-তুমারের আরেকটি খারাপ দিক ছিল, সে যুগের লোকেরা ঝাড়-ফুঁক বা তাবিজ-তুমারকেই প্রভাবসৃষ্টিকারী মনে করত। এ ব্যাপারে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি হলো আল্লাহ তায়ালা ঝাড়-ফুঁকে বা তাবিজ-তুমারে যদি তাসির দেন তাহলে তা দ্বারা কাজ হবে, যদি তাসির না দেন তা দ্বারা কাজ হবে না। তাদের বিশ্বাস ছিল, যে সব বাক্যাবলী বা তন্ত্র-মন্ত্র পাঠ করা হত সেগুলো স্বয়ং প্রভাবসৃষ্টিকারী। সেগুলো পড়লেই অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হয়ে যাবে। এ কারণে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহেলি যুগের ঝাড়-ফুঁক ও তার পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ করেছেন এবং বলেছেন, যারা এ ধরনের ঝাড়-ফুঁক এবং তাবিজ-তুমার থেকে দূরে থাকবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

প্রতিটি মাখলুকের বৈশিষ্ট্য ও শক্তি ভিন্ন: 

আল্লাহ তায়ালা মহাবিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং মহাবিশ্বের প্রতিটি জিনিসকে একটি সুনিপুণ ও সুষ্ঠু নেজামের আওতায় রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি জিনিসের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব রেখেছেন। যেমন, পানির মাঝে তৃষ্ণা মেটানোর বৈশিষ্ট্য রেখেছেন, আগুনের মাঝে দহন ক্ষমতা রেখেছেন। যদি আল্লাহ তায়ালা আগুন থেকে এ বৈশিষ্ট্য বের করে নেন তা হলে আগুনের দাহ্যশক্তি থাকবে না। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর জন্য আগুনকেই আল্লাহ তায়ালা ফুঁলের বাগানে পরিণত করেছিলেন। বাতাসের মাঝে ভিন্নরকম প্রভাব রেখেছেন। মাটির প্রভাবও ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা নানাপ্রকার জীব সৃষ্টি করেছেন, মানুষ, জিন, শয়তান, পশুপাখি ইত্যাদি। প্রতিটি জীবের মাঝে কিছু ক্ষমতা দান করেছেন। মানুষকেও ক্ষমতা দান করেছেন। গাধা ও ঘোড়াকেও ক্ষমতা দান করেছেন। বাঘ ও হাতিকেও ক্ষমতা দান করেছেন তবে প্রত্যেকের ক্ষমতার ধরণ ও পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। বাঘ যতটা শক্তিশালী, মানুষ তত শক্তিশালী নয়। সাপের মাঝে বিষ রেখেছেন। যদি সাপ কাউকে দংশন করে সে মারা যায়। বিচ্ছুর মাঝেও আল্লাহ তায়ালা বিষ রেখেছেন। কিন্তু বিচ্ছুর দংশনে মানুষ মারা যায় না; অনেক কষ্ট হয়। মোটকথা, প্রতিটি সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য ও ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন।

জিন ও শয়তানের শক্তি:

এমনিভাবে জিন এবং শয়তানকেও আল্লাহ তায়ালা কিছু ক্ষমতা দান করেছেন, মানুষ যা দেখে বিস্মিত হয়। যেমন, জিন এবং শয়তানকে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার ক্ষমতা দান করেছেন; মানুষকে এ ক্ষমতা দান করেননি। যদি মানুষ চায় আমি কারো দৃষ্টিতে আসব না, এটা মানুষের জন্য সম্ভব নয়। যদি মানুষ চায় আমি মুহূর্তেই এখান থেকে উড়ে মক্কা শরিফ চলে যাব, এ ক্ষমতা মানুষের নেই। পক্ষান্তরে কিছু জিন ও শয়তানকে আল্লাহ তায়ালা এ ক্ষমতা দান করেছেন। শয়তান মানুষকে গোমরাহ করার জন্য এবং আল্লাহর দ্বীন থেকে বিমুখ করার জন্য অনেক সময় এমন বাক্যাবলী বলতে উদ্ভুদ্ধ করে যা সরাসরি শিরক। শয়তান মানুষকে বলে, যদি তুমি এ বাক্যগুলো বলো, আল্লাহ তায়ালার শানে গোস্তাখি কর তাহলে আমি খুশি হব এবং আল্লাহ তায়ালা আমাকে যে ক্ষমতা দান করেছেন তা তোমার পক্ষে ব্যবহার করব।

এ আমলের সঙ্গে দ্বীনের কোনো সম্পর্ক নেই:

যেমন ধরুন, কারো কোনো জিনিস হারিয়ে গেল। সে পেরেশান হয়ে তা খুঁজছে। যদি কোনো জিন বা শয়তান জানতে পারে যে, জিনিসটি কোথায় পড়ে আছে তা হলে এক মিনিটেই তা তুলে নিয়ে আসতে পারে। আল্লাহ তায়ালা তাকে এ ক্ষমতা দান করেছেন। শয়তান স্বীয় ভক্তদেরকে বলে রেখেছেন, যদি তোমরা এ বাক্যগুলো বলো তাহলে আমি তোমাকে সাহায্য করব এবং সেই জিনিসটি তুলে এনে দেব। এর নাম হলো যাদুটোনা, একে সেহেরও বলা হয়। একে জ্যোতিষী বিদ্যাও বলা হয়। কোনো নেক আমলের সঙ্গে বা তাকওয়া, দ্বীনদারিতা এবং ঈমানের সঙ্গে এ কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং একজন নিকৃষ্ট কাফেরও এ ধরনের ভেল্কি দেখাতে পারে। কারণ কিছু জিন এবং শয়তান তার অধীনতা বা বশ্যতা স্বীকার করেছে। সেই জিনরাই তার কাজ করে দেয়। মানুষ মনে করে, ইনি অনেক উঁচু স্তরের লোক এবং অনেক নেককার ব্যক্তি। অথচ রুহানিয়্যাতের সঙ্গে এ কাজের কোনো সম্পর্ক নেই বরং এ কাজের জন্য ঈমানও জরুরি নয়। এ কারণেই যাদুটোনা ও সেহেরকে হাদিসে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। 

যাদুটোনার কাজ অনেক সময় কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যদি কারো আল্লাহর ওপর ঈমান থাকে, আল্লাহর কুদরতের ওপর ঈমান থাকে, তার জন্য কুফরি ও শিরকি মন্ত্র এবং অস্পষ্ট ও জটিল বাক্যাবলী পাঠ করে শয়তানকে খুশি করার মাধ্যমে উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েজ ও হারাম; কোনো মুসলমান এ কাজ করতে পারে না। 

চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে