ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ নারী নক্ষত্র ]

বুয়েট বিসিএস ছেড়ে নায়লা শারাফ-এর প্রাথমিক শিক্ষকতায় আত্মনিয়োগ

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:৩১, ৬ অক্টোবর ২০২৬
বুয়েট বিসিএস ছেড়ে নায়লা শারাফ-এর প্রাথমিক শিক্ষকতায় আত্মনিয়োগ
দেশের মেধাবী তরুণদেরও প্রাথমিক শিক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান নায়লা শারাফ। তাঁর বিশ্বাস, প্রতিদানের প্রত্যাশা না রেখে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে যারা শিক্ষকতায় আসবেন, তারা বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার চেহারা বদলে দিতে পারেন।

সাত বছর ধরে নেত্রকোণা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বুয়েটের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী। প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের পড়ানো এবং তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাকেই এখন নিজের জীবনের অন্যতম বড় অর্জন মনে করেন তিনি।

নায়লার কাছে জীবনের সাফল্যের সংজ্ঞাটিও কিছুটা আলাদা। অর্থ কিংবা খ্যাতির পেছনে ছুটে বড় হওয়ার বদলে তিনি স্বাভাবিক ও নিশ্চিন্ত জীবনকে বেশি গুরুত্ব দেন। দিন শেষে নিজের কাজ নিয়ে তৃপ্ত থাকা এবং শান্তিতে ঘুমাতে পারাকেই তিনি বড় প্রাপ্তি মনে করেন।

  • নায়লার জীবনযাত্রা তাই প্রচলিত সাফল্যের ধারণাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। যেখানে অনেকে ভালো চাকরি, বেশি আয় কিংবা বড় পদকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখেন, সেখানে তিনি খুঁজে নিয়েছেন অন্য এক পরিতৃপ্তি। তাঁর কাছে একটি শিশুর শেখা, আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা এবং ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠাই বড় অর্জন।

বুয়েট থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা, সরকারি চাকরি, ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়া—প্রচলিত অর্থে সাফল্যের প্রায় সব ধাপই পেরিয়েছিলেন নায়লা শারাফ। চাইলেই বেছে নিতে পারতেন উচ্চ বেতন, সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ারের পথ। 

কিন্তু অর্থ, পদমর্যাদা কিংবা খ্যাতির চেয়ে তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মানসিক শান্তি এবং মানুষের জন্য কিছু করার সুযোগ। তাই একে একে ছেড়ে দিয়েছেন প্রকৌশলী ও ব্যাংকারের চাকরি, এমনকি বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ক্যাডার পদে যোগ দেননি। বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা।

বুয়েটের লোভনীয় প্রকৌশলী চাকরি ছেড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় নায়লা  শারাফ

নায়লা শারাফের শিক্ষাজীবনের শুরু ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে কর্মপরিবেশ ও কিছু অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না পারায় অল্প সময়ের মধ্যেই চাকরিটি ছেড়ে দেন।

এরপর যোগ দেন জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে। কিন্তু ব্যাংকিং পেশার যান্ত্রিক জীবনও তাঁকে টানেনি। পরে ৩৪তম বিসিএসে সফল হন। এত কাঙ্ক্ষিত একটি সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত বিসিএস ক্যাডারের চাকরিতে যোগ না দিয়ে শিক্ষকতাকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন।

বুয়েটের মতো দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় অনেকের কাছে তাঁর সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর মনে হতে পারে। কিন্তু নায়লার কাছে এটি কোনো পিছিয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের পাওয়া শিক্ষার সুযোগ প্রান্তিক শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সচেতন সিদ্ধান্ত।

  • শ্রেণিকক্ষে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নন নায়লা। শিক্ষার্থীদের সত্যবাদী, সাহসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও গুরুত্ব দেন। কোনো কাজ সঠিক কি না, তা বোঝার জন্য নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি করতে শিশুদের উৎসাহিত করেন।

প্রকৌশলী-বিসিএস ক্যাডারের চাকরি ছেড়ে প্রান্তিক শিশুদের পড়ান নায়লা শারাফ

পাঠদানকে আরও আনন্দময় ও সহজ করতে বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও কাজ করেন তিনি। নিজের হাতে ছবি আঁকা, বিভিন্ন শিক্ষামূলক উপকরণ তৈরি এবং ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে শিশুদের শেখানোর নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন।

ভিকারুননিসায় পড়ার সময় তিনি যে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, দেশের প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাও যেন সেই সুযোগ পায়, সেটিই তাঁর অন্যতম স্বপ্ন। তাই শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি শিশুর সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিকের দৃষ্টিতেও নায়লা শারাফ একজন ব্যতিক্রমী শিক্ষক। বুয়েট থেকে পড়াশোনা করেও প্রান্তিক শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে পড়ানোর যে মানসিকতা তিনি দেখিয়েছেন, তা বিরল।

দেশের মেধাবী তরুণদেরও প্রাথমিক শিক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান নায়লা শারাফ। তাঁর বিশ্বাস, প্রতিদানের প্রত্যাশা না রেখে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে যারা শিক্ষকতায় আসবেন, তারা বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার চেহারা বদলে দিতে পারেন। 

প্রান্তিক শিশুদের জন্য একজন দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষক হয়ে ওঠাই যে অনেক বড় সামাজিক দায়িত্ব, নিজের জীবন দিয়ে সেই কথাটিই যেন প্রমাণ করে চলেছেন বুয়েটের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী।

সৌজন্য : পাবলিকিয়ান

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!