ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

তিন বছর ধরে শিকলবন্দী সাদেকুল

নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৭:১১, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯
তিন বছর ধরে শিকলবন্দী সাদেকুল
ছবি : সংগৃহীত

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ভবানীপুর মোবারক পাড়া গ্রামে সাদেকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে তিন বছর ধরে কখনো শিকলবন্দী আবার কখনো গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। পাগলামি করে মানুষের ক্ষতি করছে এমন অজুহাতে তাকে গৃহবন্দী করে রাখার অভিযোগ উঠেছে তার ভাই শেরেকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। সাদেকুল ওই গ্রামের সিরাজুল ইসলাম খোকার ছেলে ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশেই ছোট্ট একটি ইটের ঘরের মধ্যে ঠিক বন মানুষের মতো খাঁচায় বন্দী হয়ে আছে সাদেকুল। স্কুল জীবনে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী ঘোষগ্রাম কফিলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়া লেখা করেছেন।

তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে কেন? জানতে চাইলে নরম সুরে বললেন, বাড়িতে ঠিকমত ভাত খেতে দেয়না, তাই অন্য মানুষের বাড়িতে ভাত চেয়ে খাই, মাঝে মধ্যে বউয়ের খোঁজ করি, মানুষের সঙ্গে একটু দুষ্টমি করি তাই বন্দী করে রেখেছে। জমি কতটুকু আছে এমন প্রশ্নের জবাব দিলেন মাত্র দেড় বিঘা। ছোট্ট ইটের চার দেয়ালের মধ্যে একটি চৌকি,ওই ঘরের মধ্যেই রয়েছে তারা প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারার শৌচাগার এবং সিমেন্টের চারীর মধ্যে কিছু পানি। যা দিয়ে সেখানেই গোসল করতে হয়। সামনে গ্রিলের দরজা। দরজার মাঝ বরাবর গ্রিল কাটা রয়েছে,ওই কাটা অংশের মধ্য দিয়ে খাবার পরিবেশন করা হয় । তার সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিবেশীর বেশ কয়েকজন ছুটে আসলেন। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো কত দিন থেকে তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে ? তারাও বললেন প্রায় তিন বছর ধরে এ অবস্থায় রাখা হয়েছে। 

প্রতিবেশী বাপ্পি,আছিয়া খাতুনসহ কয়েকজন জানালেন, তার কথা বার্তায় কিছুটা এলোমেলো রয়েছে। তবে তার আচরণে মানুষের কোনো ক্ষতি হয়না। তবে ক্ষুধা লাগলে লোকজনের কাছে থেকে ভাত চেয়ে খায় । দীর্ঘ তিন বছর ধরে বন্দী অবস্থায় থাকার কারণে কিছুটা পাগলের আচরণ দেখা যাচ্ছে । তবে চিকিৎসা করলে ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু স্বার্থপর ভাই তাকে চিকিৎসা না করে পাগল সাজিয়ে বন্দী করে রেখেছে।

সাদেকুলের ভাই শেরেকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, প্রায় পনের বছর ধরে সাদেকুল পাগল হয়েছে। বেশ কয়েক জায়গায় চিকিৎসা করে কোনো ফল হয়নি। মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করালে ডাক্তাররা তাকে পাগল বলতে পারেনা। সম্প্রতি রাজশাহী চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু সাদেকুলের কথা এবং আচরণে ডাক্তাররা তাকে মানসিক রোগী বা পাগল বলতে নারাজ। তাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিল। এক ছেলে জন্ম নেবার এক বছর পর প্রায় একযুগ আগে স্ত্রী তাকে তালাক দিয়ে চলে গেছে। মাথায় পাগলামো জাগলে লোকজনকে মারপিট করে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ফেলে । তাই তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে।

ব্র্যাক রাণীনগর শাখার মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচির এইচ আর এল এস অফিসার শাহানা সুলতানা জানান, কয়েক দিন আগে তিনি ওই গ্রামে একটি ট্রেনিংয়ের কাজে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে সাদেকুলের গৃহবন্দীর ঘটনাটি নজরে আসে। 

তিনি বলেন, ওই গ্রামের অন্তত ৩০ জন লোকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, কয়েক বছর আগে সাদেকুল তার মায়ের মাথায় বাড়ি দিয়েছিল। সেই ক্ষোভে এবং সম্পত্তি ভোগ দখল করতেই বড় ভাই শেরেকুল তাকে গৃহবন্দী করে রেখেছে। সাদেকুলের দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এমনটি গ্রামের কেউ বলতে পারেনি । দীর্ঘ দিন তাকে গৃহবন্দী করে রাখার কারণে মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে । তাকে সঠিক চিকিৎসা দেয়া হলে দ্রতই সুস্থ্য হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে রাণীনগরের ইউএনও আল মামুন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!