টাইটানিক ডুবে যাওয়ার সেই রাতে আটলান্টিকের হিমশীতল জলে জীবন বাঁচাতে ঝাপ দেন চার্লস। লাইফ জ্যাকেটটিই তখন মূল সম্বল! এভাবেই তিন ঘণ্টা তিনি ভেসে থাকেন গভীর সমুদ্রে। চারপাশে তখন কান্না, মানুষের চিৎকার। এরপর চার্লস খুঁজে পান লাইফবোট।
ঐতিহাসিক ওই জাহাজডুবির ঘটনায় যে কয়েকজন মানুষ প্রাণে বেঁচেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনি একজন। অনেকের মতে, তিনি-ই শেষ ব্যক্তি, যিনি টাইটানিক থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন মহাসাগরে। টাইটানিক জাহাজে বেকিংয়ের মূল দায়িত্বে থাকা চার্লস জোঘিনের জীবন হার মানায় ছবির রোমহর্ষক চিত্রনাট্যকেও।
.png)
১৮৭৮ সালের ৩ আগস্ট ইংল্যান্ডের বার্কেনহেডে চার্লস জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১১ বছর বয়সেই তিনি প্রথম সমুদ্রপাড়ি দেন। পরবর্তীকালে রন্ধনশিল্পী হিসেবে নামী জাহাজে কাজ পেতে থাকেন চার্লস। টাইটানিকের আগেও হোয়াইট স্টারলাইন ও অলিম্পিক নামের দুইটি বড় জাহাজে কাজ করেছেন তিনি।
১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল গভীর রাত। ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে আমেরিকার নিউইয়র্কে যাত্রারত টাইটানিক জাহাজটি তখন উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে। হঠাৎই বিশাল টাইটানিক জাহাজটি ডুবতে শুরু করে। বরফখণ্ডে ধাক্কা লেগে মুহূর্তেই তলিয়ে যেতে শুরু করে জাহাজটি। মানুষের জলযানের ইতিহাসে টাইটানিকের নাম আজো মাইলফলক হয়ে আছে। বিলাসিতা এবং অত্যাধুনিকতার চরম নিদর্শন ছিল এই জাহাজ।
টাইটানিকের বিশাল রান্নাঘরের একটা বড় অংশের দায়িত্বে ছিলেন চার্লস। তিনি মূলত বেকিংয়ের দিকটি দেখতেন। তার অধীনে কাজ করতেন অন্তত ১৩ জন। টাইটানিকের গায়ে যখন বরফখণ্ডের আঘাত প্রথম লাগে, তখন নেশার ঘোরে ঘুমাচ্ছিলেন চার্লস।
ধাক্কার চোটে জাহাজ কেঁপে উঠতেই ঘুম ভেঙে যায় চার্লসের। আসন্ন বিপদ আন্দাজ করেই তার অধস্তন কর্মীদের খাবার মজুত করতে নির্দেশ দেন তিনি। তার কথায় কর্মীরা জাহাজের ডেকে নিয়ে আসেন পাউরুটির পাঁচটি লোফ। যাতে সেগুলো লাইফবোটে দিয়ে দেয়া যায়।
টাইটানিক একটু একটু করে তলিয়ে যেতেই যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অস্বাভাবিক শান্ত ছিলেন চার্লস। তার সঙ্গী ছিলেন ব্র্যান্ডি। জাহাজের ডেকে যেমন অবিচলভাবে বেহালা বাজাচ্ছিলেন বাজনদারেরা, শেফ-বেকার চার্লসও নিজেকে শান্ত রেখেছিলেন। নিজের লাইফজ্যাকেটও দিয়ে দিয়েছিলেন অন্য যাত্রীকে।
টাইটানিকের সব যাত্রী সেদিন লাইফজ্যাকেট পাননি। সবার জায়গাও হয়নি লাইফবোটে। ধনী যাত্রীদের জন্যই বরাদ্দ ছিল নতুন জীবন পাওয়ার সুযোগ। বহু যাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল জাহাজের সঙ্গেই। রীতি মেনে, জাহাজ ছেড়ে যাননি ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথও। তিনিও টাইটানিক জাহাজের সঙ্গেই ডুবে গিয়েছিলেন আটলান্টিক মহাসাগরে।
চার্লসের মতো অনেকেই সেদিন লাইফজ্যাকেট-লাইফবোট পায়নি। তারা সবাই জীবন বাঁচাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন মহাসাগরের জলে। তাদের মধ্যে অনেকে প্রাণ হারিয়েছিলেন আতঙ্কে। আতঙ্কটুকু কাটিয়ে যারা সাঁতার কাটবেন বলে ঠিক করেছিলেন, তাদেরকে গ্রাস করেছিল হিমশীতল জল।
টাইটানিক-এর সেকেন্ড অফিসার চার্লস লাইটটোলার নিজের অভিজ্ঞতায় বলেছিলেন, সে সময় আটলান্টিক মহাসাগরের জল যেন সারা দেহে হাজারো ছুরির আঘাত বসিয়ে দিচ্ছিল। এই অবস্থায় প্রাণ হারান অসংখ্য অসহায় যাত্রী। এখানেই তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন শেফ চার্লস জোঘিন।
বলা হয়, তিনিই শেষ ব্যক্তি যিনি ডুবন্ত টাইটানিক থেকে ঝাঁপিয়েছিলেন আটলান্টিক মহাসাগরে। তারপর টানা তিন ঘণ্টা তিনি ঠাণ্ডা সাগরে ভেসে ছিলেন। ১৫ এপ্রিল ভোরবেলা তাকে দেখতে পেয়ে তুলে নেয়া হয় লাইফবোটে।
নিজেকে বাঁচানোর আগে চার্লস জোঘিন আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন টাইটানিক-এ আটকে থাকা শেষ যাত্রীকেও রক্ষা করতে। জাহাজের বিভিন্ন অংশে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছিলেন তিনি। জাহাজ থেকে মহাসাগরের জলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন ডেক চেয়ার। যাতে সেগুলো ধরে ভেসে থাকতে পারে সাগরের জলে হাবুডুবু খাওয়া মানুষ।
চার্লস যখন টাইটানিক থেকে ঝাঁপ দেন, ততক্ষণে জাহাজটি দুইটি অংশে ভেঙে গিয়েছে। একটি অংশ পুরোপুরি ডুবে গিয়েছে। বাকিটাও ডুবতে থাকা ছিল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সে সময় ডেকের রেলিংয়ের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে জলে ঝাঁপ দেন তিনি। তারপরে আর কেউ ডুবন্ত জাহাজ থেকে প্রাণে বাঁচতে পারেননি।
একাধিক লাইফবোটে আশ্রয় চেয়েও পায়নি চার্লস। অতঃপর তারই অধীনে কাজ করা এক রাঁধুনি তাকে চিনতে পেরে ততক্ষণাৎ জল থেকে টেনে তোলেন। অবশেষে তার জায়গা হয় লাইফবোটে। তারপর সেখান থেকে আরএমএস কার্পাথিয়া জাহাজে করে বাকি উদ্ধার পাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে ইংল্যান্ডে ফিরেছিলেন চার্লস।
তবে চার্লস জোঘিন কীভাবে সেদিন আটলান্টিকের জলে দীর্ঘক্ষণ জীবিত থাকলেন? তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন, অতিরিক্ত মদ্যপানই এর কারণ। তিনি এমনিতেই সুরাসক্ত ছিলেন। টাইটানিক থেকে ঝাঁপ দেয়ার আগে প্রচুর মদ্যপান করেছিলেন। ফলে অ্যালকোহলের প্রভাবে হাইপোথার্মিয়া তাকে গ্রাস করতে পারেনি বলে দাবি করেছিলেন তিনি।
এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পরেও কিন্তু সমুদ্রের নেশা কাটাতে পারেননি তিনি। বারবার সাগরে ভেসেছেন বিভিন্ন জাহাজে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সামিল হয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও। পরবর্তীকালে তিনি পাকাপাকিভাবে চলে যান নিউজার্সিতে। বিয়ে করেন অ্যানি এলেনর হাওয়ার্থ কোলকে।
তবে এটা ছিল তার দ্বিতীয় বিয়ে। অ্যানিরও ছিল তৃতীয় বিয়ে। তার আগের দুই পক্ষের স্বামী প্রয়াত হয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে মারা যান অ্যানিও। এই মানসিক আঘাত আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি চার্লস। পরের বছর কাজ থেকে অবসর নেন তিনি। আর কোনোদিন সাগরে যাননি।
চার্লসের প্রথম স্ত্রী ছিলেন লুইস উডওয়ার্ড। ডগলাসের বাসিন্দা এই তরুণীকে চার্লস বিয়ে করেছিলেন ১৯০৬ সালে। তাদের মেয়ের নাম ছিল অ্যাগনেস লিলিয়ান। ছেলের নাম, রোল্যান্ড আর্নেস্ট। তৃতীয় সন্তান রিচার্ডের জন্ম দেয়ার সময় ১৯১৯ সালে মারা যান লুইস। মাতৃহীন শিশু রিচার্ডও বেশি দিন বাঁচেনি।
জীবনে এত ঝড় সহ্য করেও দীর্ঘজীবী ছিলেন রিচার্ড জোঘিন। ১৯৫৬ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি প্রয়াত হন ৭৮ বছর বয়সে। জেমস ক্যামেরনের টাইটানিক ছবিতে চার্লস জোঘিনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন লায়াম টুহাই।