সূরা মারইয়াম এর আলোকে নবীদের আদর্শ (পর্ব-১)
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচে সুন্দর ও সফল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন নবী রাসূলগণ। তাদের চরিত্র মাধুর্যের সংস্পর্শে মানুষ পেয়েছে শান্তি ও মুক্তির পথ। তাদের সেই সুন্দর চরিত্রের বর্ণনা রয়েছে কোরআন ও হাদিসে।
মহান আল্লাহ তাদের এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তাদের ভেতরে মনুষ্য চরিত্রের সকল ভালো দিকগুলোর সমাবেশ ঘটিয়েছেন। একেক জন নবী ছিল আদর্শ ভদ্র, সভ্য ও মোহনীয় চরিত্রের স্থায়ী পিরামিড। তাদের ব্যবহারে শত্রুও অভিযোগ উঠাতে পারেনি, তাদের আচরণে সমাজের কেউ কষ্ট পায়নি। তাদের চলাফিরায় কোনো পথিক দুঃখবোধ করেনি। তাদের ক্রয়বিক্রয়ে কোনো ক্রেতা বিক্রেতাও সমালোচনা করতে পারেনি। তাদের হাসিতের কেউ বিদ্রুপের রেশ পায়নি। তাদের চলনে বলনে কথনে শয়নে স্বপনে কেউ আহত হয়নি।
আরো পড়ুন>>> হজ পালনকারীর প্রস্তুতি
তবে হ্যাঁ, অনেকে আহত হয়েছে; যাদের আহত হওয়াটাও সুন্দর চরিত্রের দাবি ছিল। নবীদের সেই চরিত্রগুলো কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য সুন্দরভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। সেই চরিত্রগুলো আমরা নম্বরওয়ারি বিন্যাস করেছি। সেই বিন্যাসের নাম দিয়েছি নবীচরিত। আজকে প্রথম পর্ব...
ذِكْرُ رَحْمَةِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيَّا
তরজমা : কাফ, হা, ইয়া, আইন, সোয়াদ। এটা সেই রহমতের বর্ণনা, যা তোমার প্রতিপালক নিজ বান্দা যাকারিয়ার প্রতি করেছিলেন (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ২)।
১ নম্বর গুণ- সদাসর্বদা অন্তরে আল্লাহকে স্মরণ রাখা।
ব্যাখ্যা : নবী রাসূলগণ আল্লাহর মেহেরবানিকে কখনো ভুলতেন না। আল্লাহর রহমত বরকতের রূপকাঠামো অন্তরে সদা সর্বদা হাজির রাখতেন। নবী রাসূলদের অন্যতম চরিত্র বৈশিষ্ট্য- অন্তর জিহ্বা কখনো আল্লাহর স্মরণ হতে ফারেগ হতো না। কখনো তাদের অন্তর আল্লাহর শোকর মুক্ত থাকতো না।
২নম্বর গুণ- আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখা, তার সম্পর্ককে প্রাধান্য দেয়া।
ব্যাখ্যা : সমস্ত ভালো গুণাবলির দ্বারা নিজেকে সাজানো। আল্লাহর সামনে বিনয় দুর্বলতা অসহায়ত্ব প্রকাশ করা। এর দ্বারা বান্দার অন্তরে মাওলাপ্রেম বৃদ্ধি পায়। কেননা মাওলার প্রতি প্রবল দুর্বল হওয়া মেরাজ মনে করা হয়। আল্লাহর সঙ্গে সর্ম্পকের দরুন সে অনেক উপরে উঠে যায়। তাই, তাদের এ অবস্থা দেখে কেউ যেন তাদের কামালাতকে ভুল না বুঝে।
إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاء خَفِيًّا
তরজমা : যখন নিজে প্রতিপালকের ডেকেছিল চুপিসারে (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ৩)।
৩ নম্বর গুণ - আল্লাহকে স্মরণ করার আদব।
ব্যাখ্যা : আল্লাহর দরবার কোনো সাধারণ বিষয় নয়। তাই, আবেদন পেশ করার সময়বহু বিষয়ের প্রতি নজর রাখতে হয়। চুপিচুপি ডরে ভয়ে আস্তে ধীরে দাবি দাওয়া পেশ করা। যাতে মাওলা নারাজ না হন।
قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُن بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا
তরজমা : সে বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার অস্থিরাজি পর্যন্ত জীর্ণ হয়ে গেছে, মাথায় বার্ধক্যজনিত শুভ্রতা প্রজ্জলিত হয়ে উঠেছে এবং হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করে কখনো ব্যর্থ হয় নি। (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: আয়াত: ৪)।
৪ নম্বর গুণ- বার্ধক্য আর দুর্বলতার কথা আল্লাহর দরবারে এভাবে প্রকাশ করা যেন নিজের অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়।
ব্যাখ্যা : নিজের শরীরের দুর্বলতা এবং বার্ধক্য আল্লাহর সামনে এভাবে বর্ণনা করা যেন বিনয় নম্রতা এবং অক্ষমতার চূড়ান্ত সীমা প্রকাশ পায়। দুর্বলতা অক্ষমতা দেখলে আল্লাহর রহমতে জোশ আসে।
৫ নম্বর গুণ- আল্লাহর রহমত হতে কখনো নিরাশ না হওয়া এবং প্রবলভাবে দোয়া কবুলের পূর্ণ আশা রাখা।
ব্যাখ্যা- কখনো কখনো মানুষের দোয়া কবুল হতে বিলম্ব হতে থাকে তখন সে সীমাহীন পেরেশানিতে পড়ে যায়। ওই সময়েও আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ না হওয়া। আল্লাহর রহমত মাকবুল বান্দাদের নিকটবর্তি আর নৈরাশ্যতা কুফরির নিকটবর্তী। তাই দয়া কবুলে ব্যাপারে সদাসর্বদা দৃঢ় আশা রাখা এবং আগত বিপদ আপদে ধৈর্য ধারণ করা
وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِن وَرَائِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا
তরজমা- আমি আমার পর চাচাতো ভাইদের ব্যাপারে শঙ্কাবোধ করছি এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতরাং আপনি আপনার নিকট থেকে আমাকে এমন এক উত্তরাধিকারী দান করুন। (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ৫)।
৬নম্বর গুণ- আল্লাহ থেকে তার নেয়ামত চাও।
ব্যাখ্যা : পৃথিবী জুড়ে আল্লাহর নেয়ামত রাজি সর্বদা বর্ষিত হতে থাকে কিন্তু আল্লাহর কাছে পছন্দ হচ্ছে- বান্দা তার প্রয়োজন পূরণার্থে আল্লাহর সামনে নিজের হাজত অসুবিধা পেশ করবে। আর তিনি তাদেরকে মালে দৌলত পূর্ণ করে দেবে। এই কারণে আল্লাহর বড়ত্বের কাছে সদাসর্বদা ভিক্ষার হাত প্রসারিত করা এবং তার দান দক্ষিণার আশা করা। এটাই ছিল আওয়ালিয়াদের চরিত্র।
يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ وَاجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا
তরজমা : যে আমারো উত্তারাধিকারী হবে এবং ইয়াকুব (আ.) এরও উত্তারাধিকার লাভ করবে। হে আমার প্রতিপালক! তাকে এমন বানান যেন (আপনার নিজেরও) সন্তুষ্টপ্রাপ্ত হবে। (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ৬)।
৭নম্বর গুণ- আল্লাহর সন্তুষ্টিকে ‘জীবনের লক্ষ’ বানানোই জীবনের রূপ সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতার আলামত।
ব্যাখ্যা : আনুগত্য করা এবং বান্দার ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি। তার ইবাদত বন্দেগি। আর বন্দেগির পূর্ণতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। জীবনের চরিত্র মাধুর্য, আমালের সৌন্দর্য ও কামালাতের দ্বারা বান্দা আল্লাহর প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়। এ কারণে আল্লাহর রেজা তবল করা, হাসিল করা, জীবনের মাকসাদ বানানো উচিৎ।
قَالَ رَبِّ أَنَّى يَكُونُ لِي غُلامٌ وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا وَقَدْ بَلَغْتُ مِنَ الْكِبَرِ عِتِيًّا
তরজমা- যাকারিয়া বলল- হে আমার প্রতিপালক! আমার কীভাবে পুত্র সন্তান জন্ম নিবে। যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা এবং আমি এমন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি যে, আমার দেহ শুকিয়ে গেছে। (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ৮)।
৮ নম্বর গুণ- আল্লাহর দান নেয়ামত, নিদর্শন এবং তার সৃষ্টিতে চিন্তা ফিকির করা।
ব্যাখ্যা : অজানা বিষয়ের ওপর আল্লাহর সাহায্য। যেখানে প্রকাশ্য কোনো উপায় উপকরণ নেই, নেই বাহ্যিক কোনো সুরুত সেখানে তার সাহায্য। অসম্ভব বস্তুকে সম্ভব করে দেয়ার ওপর গভীর চিন্তা ভাবনা করা।
قَالَ كَذَلِكَ قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَيَّ هَيِّنٌ وَقَدْ خَلَقْتُكَ مِن قَبْلُ وَلَمْ تَكُ شَيْئًا
তরজমা- তিনি বললেন, এভাবেই হবে। (এটাতো আশ্চার্যের কোনো বিষয় নয়) তোমার প্রতিপালক বলেছেন, এটাতো আমার পক্ষে সাধারণ ব্যাপার। তাছাড়া এর আগে আমি তোমাকেও সৃষ্টি করেছি; যখন তুমি কিছুই ছিলে না। (সূরা: মারইয়াম, : আয়াত: ৯)।
৯ নম্বর গুণ- প্রথমে নিজের অস্তিত্বহীনতা অতঃপর অস্তিত্বে আসা’ এই বিষয়টি চিন্তা-ভাবনা করলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সবকিছু আল্লাহর পক্ষ হতে এবং তিনিই করেন।
ব্যাখ্যা : চিন্তা-ভাবনা করার দ্বারা অন্তরে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে পৃথিবীর সব কাজ আল্লাহর হাত দ্বারা, তিনি সব বিষয়ের ওপর সক্ষমতা রাখেন। কোনো বস্তুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব আনার বেলায় অন্য কারো যখন কারো কোনো সাধ্য না থাকে, তিনি শুধু ‘কুন’ বলেন, অতপর ফায়াকুন বস্তু অস্তিত্বে এসে যায়। এমন সত্তার জন্য কোনো বস্তুর ধ্বংস অধ্বংস কী কঠিন ব্যাপার? একারণে এ বিশ্বাস ও চেতনা সমৃদ্ধ করে নেয়া যে আল্লাহর সব পারেন করেন বা করান।
قَالَ رَبِّ اجْعَل لِّي آيَةً قَالَ آيَتُكَ أَلاَّ تُكَلِّمَ النَّاسَ ثَلاثَ لَيَالٍ سَوِيًّا
তরজমা- যাকারিয়া বলল হে আমার প্রতিপালক আমার জন্য কোনো নিদর্শন স্থির করে দিন, তিনি বললেন তোমার নিদর্শন হলো তুমি সুস্থ থাকা সত্তেও তিন রাত পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। (সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ১০)।
১০ নম্বর গুণ- আল্লাহর নিদর্শনের পরিচয় লাভ করা।
ব্যাখ্যা : অজানা বিষয় প্রকাশের পূর্বে কিছু আলামত ও নিদর্শন প্রকাশ পায়। যা ওই ঘটনার গুরুত্ব বহন করে। এর দ্বারা আল্লাহর বান্দাগণ আল্লাহর মারেফাত লাভ করে। যা তার ইয়াকিন ও তৌহিদকে শক্তিশালী করে তোলে।
ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে