ঐ বছরের মার্চে শ্রীলংকায় ত্রিদেশীয় টি-২০ টুর্নামেন্ট খেলতে যায় টিম টাইগার্স। প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে রিয়াদের দল প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক শ্রীলংকার ছুঁড়ে দেওয়া ২১৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় লাল-সবুজের দল দারুণ এক জয় পায়। সেটিই ছিল দুই শতাধিক রান তাড়ায় টি-২০তে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের নজির। উদযাপনের সময় নাগিন নাচের ভঙ্গিতে সকলের দৃষ্টি কেড়েছিলেন ৩৫ বলে অপরাজিত ৭২ রানের ইনিংস খেলা মুশফিকুর রহিম। সাইলেন্ট কিলার খ্যাত রিয়াদের ইনিংসটা সবার অগোচরে থেকে যায়। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খেলেছিলেন ১১ বলে ২০ রানের ক্যামিও ইনিংস।
তৃতীয় ম্যাচে টিম ইন্ডিয়ার সঙ্গে ফিরতি দেখায় আবারো হারের স্বাদ পায় রিয়াদ বাহিনী। তাই লিগপর্বের শেষ ম্যাচটি লঙ্কানদের বিপক্ষে হয়ে যায় অঘোষিত সেমিফাইনাল। কারণ তিন ম্যাচের পর দুটি দলই একটি করে ম্যাচ জিতেছিল। ফাইনালে উঠতে হলে ম্যাচটা জিততেই হবে, ১৬ মার্চ দুই দলের সামনে ছিল একই সমীকরণ। রনিল প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে গড়ানো খেলায় স্বাগতিকদের দেওয়া ১৬০ রানের লক্ষ্য ব্যাটিংয়ে নামে টাইগাররা।
.png)
চোট থেকে সেরে ওঠায় অঘোষিত সেমিফাইনালে দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে অধিনায়কত্বের দায়িত্বটাও নেন সাকিব। আগের মুখোমুখিতে মুশফিকের নাগিন নাচ লঙ্কান সমর্থকরা তো বটেই, ক্রিকেটারদেরও হজম হয়নি। টাইগার ব্যাটাররা যখন আউট হয়ে সাজঘরে ফিরছিলেন, গ্যালারির দর্শকরাও সেই ভঙ্গিতে করছিলেন উদযাপন। মাঠে খেলোয়াড়রাও বাদ যাননি। পেন্ডুলামের মতো ঝুলতে থাকা ম্যাচের শেষ ওভারে ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আম্পায়ারের বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে যায়।
ইসুরু উদানার বাউন্স ডেলিভারিটি ব্যাটার মুস্তাফিজুর রহমানের মাথার অনেক উপর দিয়ে যায়। তিনি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে স্ট্রাইক দেওয়ার জন্য দৌড় দেন। নন স্ট্রাইক প্রান্তে পৌঁছানোর আগেই রান আউট হন। তবে আম্পায়ার হোয়াইড না দিলে রেগে যান সাকিব। শ্রীলংকার ফিল্ডারদের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বাদশ খেলোয়াড় নুরুল হাসান সোহানের বাকবিতণ্ডা হয়। আম্পায়াররা বাধা দিলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি আনতে ব্যর্থ হন। এ সময় বাইশ গজে থাকা রিয়াদের সঙ্গে জুটি বাঁধার জন্য নামেম রুবেল হোসেন।
হোয়াইড না দেওয়ায় সাকিব আম্পায়ারদের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেন। এক পর্যায়ে রেগেমেগে রিয়াদ ও রুবেলকে ড্রেসিংরুমে ফিরে আসতে বলেন। এ সময় দুই ব্যাটার মাঠ ছাড়লে ফিলদ আম্পায়ার শ্রীলংকাকে ওয়াকওভার দেওয়ার ঝুঁকি ছিল। স্টেডিয়ামের গ্যালারিও তখন উত্তপ্ত। ধারাভাষ্যকক্ষ থেকেও উচ্চস্মরে ভেসে আসছে কথামালা। টিম ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা খালেদ মাহমুদ সুজন ঠাণ্ডা মাথায় মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও রুবেল হোসেনকে ক্রিজে ফিরে খেলা শেষ করতে বলেন।
সেদিন ছয় নম্বরে নামা সাইলেন্ট কিলারের উপর যেন পড়ল জয় ছিনিয়ে আনার দায়িত্ব, সঙ্গে সম্মান মাটিতে মিশিয়ে না যাওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ। জয়ের জন্য তখন দরকার ৪ বলে ১২ রান। উদানার অফ স্টাম্পের বিশাল বাইরের বল অনেকখানি সরে গিয়ে কভার অঞ্চল দিয়ে বাউন্ডারি মেরে সবাইকে অবাক করেন রিয়াদ। প্রতিপক্ষকে বার্তা দিয়ে দেন, বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী।
চতুর্থ বলটি ফ্লিক শটে ডিপ মিডউইকেটে পাঠিয়ে রিয়াদ দৌড় দেন। দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে বিপদে পড়েন। রান আউটের সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও উইকেটরক্ষক কুশল পেরেরা বিস্ময়করভাবে ফিল্ডারের ছোড়া বল গ্লাভসবন্সি করে স্টাম্প ভাঙতে পারেননি। সমীকরণ দাঁড়ায় ২ বলে ৬ রান।
পঞ্চম ডেলিভারিটি ছিল ফুলটস। স্লটে পাওয়া বল পেয়ে রিয়াদ ফ্লিক শটে ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগের উপর দিয়ে বিশাল ছক্কা হাঁকান। গ্যালারিতে বল আঁচড়ে পড়ার সময় স্টেডিয়ামজুড়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা। পুরো কলম্বোতে যেন নেমেছিল নীরবতা। ডাগআউট থেকে বাংলাদেশি খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফসহ সকলে মাঠে ঢুকে প্রেমাদাসার দর্শকদের সামনে সমানতালে চালিয়ে গেলেন নাগিন নাচ। ক্রিকেটীয় মর্যাদাহানি থেকে রক্ষা পাওয়ার উদযাপনের দৃশ্যটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে স্বীকৃত হয়ে যায়। পরাজয় হজম না হওয়ায় অনেক শ্রীলংকার সমর্থক বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমের কাঁচ ভেঙে ফেলেন।
প্রবল চাপের মাঝে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ১৮ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কায় রিয়াদ ৪৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। নিদাহাস ট্রফির সেই আনন্দদায়ী স্মৃতি তার টি-২০ থেকে অবসরের ঘোষণার পর যেন আবারো হয়ে উঠেছে প্রাসঙ্গিক। স্মৃতিচারণের দারুণ এক উপকরণ। তার ব্যাটের সেই নিখুঁত ফিনিশিং টাইগার ক্রিকেটের লড়াকু মানসিকতার প্রতীক হয়ে এখনো চির অম্লান। অবসরেরঘোষণায় টি-২০তে নিজের মুখেই পছন্দের মুহূর্ত জানিয়েছেন। একবাক্যে বললেন, ‘সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত পেয়েছি নিদাহাস ট্রফিতে।’
দারুণ এক রেকর্ডের মালিক হয়েই তিনি ফরম্যাটটি থেকে বিদায় নিতে চলেছেন। লাল-সবুজের জার্সিতে তার চেয়ে বেশি ম্যাচ আর কেউ খেলেনি। বাংলাদেশের জার্সিতে খেলেছেন ১৩৯ আন্তর্জাতিক টি-২০। সবকিছু ঠিক থাকলে ভারতের বিপক্ষে ১৪১ ম্যাচ খেলে ক্যারিয়ার শেষ করবেন। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৪৩টি টি-২০তে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার অধীনেই ফরম্যাটটিতে সর্বাধিক ১৬ ম্যাচ জিতেছে লাল-সবুজের দল।