পরিবারে যতটা না ছিল রাজনৈতিক আবহ, তার চেয়ে ঢের বেশি খেলাধুলার। ১৯৯০ সালের ৮ আগস্ট তৌরাঙ্গাতে জন্ম নেয়া উইলিয়ামসন তার মায়ের গর্ভ থেকে একা বের হননি। কিউইদের ইতিহাসের সেরা ব্যাটারের পৃথিবীতে আগমনের এক মিনিট পর তার যমজ ভাই লোগানের জন্ম হয়।
উইলিয়ামসনের মা সান্দ্রা ছিলেন একজন চমৎকার বাস্কেটবল খেলোয়াড়। তিন বোন আনা, কাইলি এবং সোফি খেলতেন ভলিবল। আনা এবং সোফি নিউজিল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলে খেলেছিলেন। তবে মা-বোনদের নয়, ক্রিকেটার বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি ব্যাট-বলের প্রেমে পড়েন। ৩৪ বর্ষী ক্রিকেটারের বাবা ব্রেট নিউজিল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৭ দলের পাশাপাশি ক্লাবের হয়েও খেলেছেন। পরে অবশ্য বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে পেশাগত জীবন পার করেন। খেলোয়াড়ে পরিপূর্ণ পরিবারে উইলিয়ামসনের যমজ ভাই লোগান কেন ক্রীড়াবিদ হলেন না, সেটি নিয়ে খানিক বিস্ময় মনের কোণে থাকতেই পারে।
.png)
কেন উইলিয়ামসন কিশোর বয়স থেকেই একজন বিস্ময়কর খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হন। ১৪ বছর বয়সে সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং ১৬ বছর বয়সে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেন। ২০০৪-২০০৮ সাল পর্যন্ত তৌরাঙ্গা বয়েজ কলেজে পড়াশোনা করেন। যেখানে শেষ বর্ষে তিনি হেড বয় ছিলেন।
গত কয়েক বছরে শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, একজন অধিনায়ক হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন। চাপের মুখে পারফর্ম করার ক্ষমতা তাকে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনায় আনতে বাধ্য করে। ফাস্ট বোলিংয়ের বিপক্ষে ব্যাট হাতে পারদর্শী। এশিয়ান ক্রিকেটার না হয়েও মানসম্পন্ন স্পিন বোলিংয়ের বিপক্ষে তার খেলার দক্ষতা বিরলই বলা যায়।
২০০৭ সালে ব্ল্যাক ক্যাপসদের ইতিহাসের সফল ব্যাটার এবং অধিনায়কের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হয়। একই বছর সফরকারী ভারতীয় অনুর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে তিনি প্রথমবার নিউজিল্যান্ডের জার্সিতে খেলেন। পরের বছর অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে দলের অধিনায়ক মনোনীত হন। ২০১০ সালে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে।
উইলিয়ামসন চারটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ এবং ছয়টি টি-২০ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বে দল ফাইনালে ওঠে। সুপার ওভারে টাইয়ের পর কিউইদের ট্র্যাজিক পরাজয়ে স্বাদ পেলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন।
২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি ব্যাটিংয়ে ৮৯০ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে স্টিভেন স্মিথ এবং জো রুটকে পেছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট ব্যাটসম্যান হন। আইসিসির দশকের সেরা পুরুষ ক্রিকেটারের জন্য স্যার গারফিল্ড সোবার্স পুরস্কার এবং দশকের সেরা টেস্ট ক্রিকেটারের পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।
একমাত্র নিউজিল্যান্ডার হিসেবে আইসিসি টেস্ট দল অব দ্য ডিকেডে (২০১১-২০২৪) স্থান পান উইলিয়ামসন। ২০২১ সালের জুনে আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরে নিউজিল্যান্ডের শিরোপা জয়ী দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি।
ঠিক ১০০ টেস্ট খেলা উইলিয়ামসন ৫৪.৯৮ গড়ে ৩২ সেঞ্চুরি ও ৩৪ হাফ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৮,৭৪৩ রান। তিনিই টেস্টে নিউজিল্যান্ডের সর্বাধিক রানের মালিক। ১৬৫ ওয়ানডেতে ৪৮.৬৪ গড়ে ১৩ সেঞ্চুরি ও ৪৫ হাফ সেঞ্চুরিতে তার ব্যাটে এসেছে ৬,৮১০ রান। অভিজ্ঞ এ ক্রিকেটার ৯৩ টি-২০ ম্যাচে ৩৩.৪৪ গড়ে ১২ অর্ধশতকে তুলেছেন ২,৫৭৫ রান।
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ডানহাতি অফব্রেক বোলিংটাও দলের প্রয়োজনে করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার ঝুলিতে রয়েছে ৭৩ উইকেট। ব্যাটিং-বোলিং ডান হাতে করলেও লেখালিখিটা বাঁহাতে করেন।
বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০১০ সালের অক্টোবরে ঢাকায় তিনি প্রথম ওয়ানডে শতকের দেখা পান। নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হন। সেবার ওয়ানডে সিরিজে টাইগারদের বিপক্ষে কিউইরা ৪-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হলেও পারফরম্যান্সের কারণে উইলিয়ামসন দলের পরবর্তী ভারত সফরের জন্য টেস্ট স্কোয়াডে ডাক পান। ঐ বছর নভেম্বরে আহমেদাবাদে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে তার প্রথম ইনিংসে ২৯৯ বলে ১৩১ রানের ইনিংস খেলেন। নিউজিল্যান্ডের অষ্টম খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট অভিষেকে পান সেঞ্চুরি।
২০১৫ সালে ১,১৭২ রান করে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটার হিসেবে এক পঞ্জিকাবর্ষে বছরে সবচেয়ে বেশি টেস্ট রানের রেকর্ড ভেঙে দেন উইলিয়ামসন। এছাড়াও তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ২,৬৯২ রান করে বছরটি শেষ করেন। ব্র্যান্ডন ম্যাককালামের অবসরের পর ২০১৬ সালে তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক নির্বাচিত হন।
পাকিস্তান সফরের আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। সিরিজের প্রথম টেস্টে তিনি প্রথম কিউই ব্যাটার হিসেবে পঞ্চম ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান। পাশাপাশি টেস্ট ক্রিকেটে ২৫ সেঞ্চুরির মাইলফলক অর্জনকারী প্রথম নিউজিল্যান্ডার হন। ২০২৩ সালের মার্চে উইলিয়ামসন টেস্ট ক্রিকেটে তার ষষ্ঠ ডাবল সেঞ্চুরি করেন।
চলতি বছর টি-২০ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড গ্রুপপর্ব থেকে বিদায়ের পর উইলিয়ামসন সাদা বলের অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। নিজ দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে জানিয়ে দেন ২০২৪-২৫ মৌসুমের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকতে চান না। যদিও অবসরের ঘোষণা এখনো দেননি। ক্যারিয়ারটা আর কতদূর টানতে চান, সেটি বলবে সময়।