ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

টেড ডেক্সটার: অপ্রতিরোধ্য এক ক্রিকেট যোদ্ধা

আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশিত: ২০:০৯, ২২ মে ২০২৩
টেড ডেক্সটার: অপ্রতিরোধ্য এক ক্রিকেট যোদ্ধা
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ডে সফর করে উইন্ডিজ জাতীয় ক্রিকেট দল। ওই সফরে ইংলিশদের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলে ক্যারিবীয়রা। যার প্রথম টেস্টেই স্বাগতিকদের ১০ উইকেটে হারিয়ে দেয় সফরকারী দল। এমনকি দ্বিতীয় টেস্টেও জয় তুলে নেয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন তারা। তবে ক্যারিবীয়দের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান ইংলিশ অধিনায়ক টেড ডেক্সটার।

লর্ডসে তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে উইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামে ইংল্যান্ড। এ ম্যাচে টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন উইন্ডিজ অধিনায়ক ফ্র্যাঙ্ক ওরেল। প্রথম ইনিংসে ১৩৩.২ ওভার ব্যাট করে সব উইকেট হারিয়ে ৩০১ রান সংগ্রহ করে ক্যারিবীয়রা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই দুই ওপেনারকে হারিয়ে ম্যাচ থেকে খানিকটা ছিটকে যায় স্বাগতিক ইংল্যান্ড।

এমনটা হবেই বা না কেন? ক্যারিবীয়দের ডেরায় যে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের মনে কাঁপন ধরানো স্যার ওয়েসলি হল ও স্যার চার্লি গ্রিফিথের মতো বোলাররা রয়েছেন। লর্ডস টেস্টে ইংল্যান্ডের ইনিংসের শুরুতেই জোড়া আঘাত হানেন গ্রিফিথ। ছক কষার আগেই বিপর্যস্ত ইংল্যান্ড! 

Advertisement

তবে বাইশ গজে এসেই ষাটের দশক কাপানো দুই বোলারকে দমিয়ে রেখে ধীরে ধীরে দলীয় ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন টেড ডেক্সটার। এ সময়ে তাকে সঙ্গ দেন কেন ব্যারিংটন। লর্ডসের সবুজ গালিচায় বিশ্বসেরা বোলারদের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে দলকে খাদ থেকে টেনে তুলেন ডেক্সটার। 

তবে সত্তর পেরোনো ডেক্সটার ব্যক্তিগত ইনিংস লম্বা করতে পারেননি। স্যার গ্যারি সোবার্সের আর্ম অর্থডক্সে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে প্যাভিলিয়নের পথ ধরতে হয় তাকে। কিন্তু আউট হওয়ার আগে প্রায় ৮৩ মিনিট ক্রিজে রাজত্ব করেছেন। এ সময়ের মধ্যে ১০টি বাউন্ডারিতে ৭৫ বলে ৭২ রানের অপ্রতিরোধ্য ইনিংস খেলেন এ ডানহাতি ব্যাটার। 

সতীর্থের সঙ্গে ব্যাট করতে নামছেন ডেক্সটারটেড ডেক্সারের চরিত্রটাই ছিল এমন, ক্রিকেটকে পছন্দ না করলেও যতটুকু সময় বাইশ গজে প্রতিনিধিত্ব করেছেন ততদিনই ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দোলা দিয়ে গেছেন।

১৯৩৫ সালের ১৫ মে ইতালির মিলানে জন্মগ্রহণ করেন অ্যাডওয়ার্ড র‌্যালফ ডেক্সটার। তবে ক্রিকেট পাড়াতে টেড ডেক্সটার হিসেবেই বেশ পরিচিত ছিলেন। ইতালির প্রসিদ্ধ শহরে জন্ম নিলেও সেখানে বেশিদিন থাকা হয়নি তার। বিশ্বে যে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল তখনই। এজন্য পরিবারের কথা ভেবে সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ইংল্যান্ডের পথে রওনা হন তার বাবা মার্শাল ডেক্সটার। এরপর বেড়ে ওঠা, জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সেখানেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতেই ব্রিটিশ কমনওয়েলথ ফোর্স এবং মালয়ের গেরিলাদের মধ্যে সমস্যা বেড়েই চলছিল। এজন্য ১৯৫৬ সালে ২১ বছরের তরুণ তুর্কি তখন মালয় ইমার্জেন্সিতে ব্রিটিশ ন্যাশনাল সার্ভিসে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকে ফিরে এসে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এ ক্রিকেটার।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পেশাদার ক্রিকেটে মনোনিবেশ করেন ডেক্সটার। যদিও ক্রিকেট খেলায় তার মনোযোগ ছিল না। কিন্তু বড় ভাইয়ের কারণে সাদা পোশাকে ব্যাট হাতে বাইশ গজে নাম লেখান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্রিকেট খেলার কোনো ইচ্ছাই ছিল না আমার। আমার বড় ভাই আর আমি একই কলেজে পড়তাম। একদিন এসে আমাকে বলেছে, ক্রিকেটার বাছাই চলছে, তোমার নাম দিয়ে এসেছি। তুমি বরং তৈরি থাকো। প্রথম তিন ম্যাচের জন্য দলে জায়গা পেয়ে গেলাম। ইয়র্কশায়ার, ল্যাঙ্কাশায়ার ও সারে – সেরা তিনটা কাউন্টি। প্রতি ম্যাচেই প্রায় ৪০-৫০ রান করেছি। ফ্রেড ট্রুম্যান, জিম লেকার, বব অ্যাপলইয়ার্ডের মতো ক্রিকেটারদের বিপক্ষে খেলেছি সেই অল্প বয়সে। এখন ভাবলে মনে হয়, খুব দারুণ কিছু ছিল সেটা।’

অল্প সময়েই জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্যে পরিণত হন ডেক্সটারজাতীয় দলের জার্সিতে টেড ডেক্সটারের অভিষেক হয় ১৯৫৮ সালে। প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিলল্যান্ড। ইংলিশদের ডেরায় সুযোগ পেয়েই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন তিনি। ওই ম্যাচে ব্যাট হাতে অর্ধ শতক হাঁকান। অবশ্য ৫২ রানেই অভিষেক ইনিংস থেমে যায় এ কিংবদন্তি ক্রিকেটারের। তবে নাটকীয়ভাবে কিউইদের বিপক্ষে ফিরতি সফরে দল থেকে বাদ পড়েন ডেক্সটার। এরপর তিনি ফ্রান্সের প্যারিসে পাড়ি দেন। সেখানে স্ত্রী ও মডেল সুসান জর্জিনা লংফিল্ডের সঙ্গে সময় কাটাতে যান।

পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে টেস্ট সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ইনজুরিতে দল থেকে ছিটকে যান ইংল্যান্ডের অধিনায়ক পিটার মে। এতে কপাল খোলে টেডের। ইংলিশ ম্যানেজমেন্টের ডাকে বেশ তড়িঘড়ি করেই অস্ট্রেলিয়া রওনা হন তিনি। এরপর সিরিজের পঞ্চম ও শেষ টেস্টে ইংল্যান্ড একাদশে জায়গা হয় তার। 

মেলবোর্ন টেস্টের প্রথম ইনিংসে শূন্য এবং দ্বিতীয় ইনিংস ৬ রান করে সাজঘরে ফেরেন ডেক্সটার। এ সময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। অবশ্য সেসবে মনোযোগ না দিয়ে দলের সঙ্গে নিউজিল্যান্ড সফর করেন। আর সেখানেই প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখেন এ ব্যাটার।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পান ডেক্সটার। কিউই বোলারদের শাসন করে ১৪১ রানের অপ্রতিরোধ্য ইনিংস খেলেন তিনি। পরের বছর উইন্ডিজ সফরে সুযোগ পান। এরপর ক্যারিবীয়দের বিশ্বসেরা বোলারদের বিপক্ষে চোখে চোখ রাঙিয়ে প্রথম টেস্টেই ১৩৬ রানের ইনিংস খেলেন টেড। তারপর একটিতে ৭৭ এবং গায়ানা টেস্টে  শতকের দেখা পান তিনি।

তবে টেড ডেক্সটার ক্যারিয়ারের রোমাঞ্চকর সময়টি অতিবাহিত করেন অস্ট্রেলিয়া সিরিজে। ১৯৬১ সালে ইংল্যান্ডে সফর করে অস্ট্রেলিয়া। পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টেই সফরকারীদের পরীক্ষার মুখে পড়তে হয় স্বাগতিকদ ইংলিশ বাহিনীকে।

ডেক্সটারের ব্যাটে বহুবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইংল্যান্ডবার্মিংহাম টেস্টে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামেন ইংল্যান্ডের ব্যাটাররা। প্রথম ইনিংসে ডোনাল্ড ম্যাককে ও রিচি বেনোর বোলিং তোপে মাত্র ১৯৫ রানেই গুটিয়ে যায় ইংল্যান্ড। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ৫১৬ রানের বিশাল সংগ্রহ পায় সফরকারীরা।

এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে লক্ষ্য তাড়ায় ৯৩ রানে প্রথম উইকেট হারায় ইংল্যান্ড। ইনিংস হারের শঙ্কা কাটিয়ে ডেক্সটারের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ায় ইংলিশরা। ৩৪৪ মিনিট ক্রিজে থেকে ৩১ বাউন্ডারিতে ১৮০ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন তিনি। এতে অস্ট্রেলিয়ার রান পাহাড় টপকে ম্যাচটি ড্র হয়ে যায়।

১৯৬৪ সালে ইংল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করেন ডেক্সটার। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হন তিনি। এরপর প্রোটিয়াদের বিপক্ষে টেস্ট ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরির তুলে নেন। যা ছিল সাদা পোশাকে তার সবশেষ শতক।

এরপর ১৯৬৫ সালে ওয়েস্ট লন্ডনে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙ্গে যায় ডেক্সটারের। অবশেষে ১৯৬৮ সালে ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন এ কিংবদন্তি ক্রিকেটার। খেলোয়াড়ি জীবন থেকে দূরে সরে নিজেকে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত করেন তিনি।

সাংবাদিকতা পেশা থেকে বেরিয়ে ১৯৮৭ সালে গর্ডন ভিন্স ও রব ইস্টাওয়ের সাথে টেস্টের র‍্যাংকিং নিয়ে কাজ করেন ডেক্সটার। ওই সময়ে ‘র‌্যাংকিং’র ধারণা উদ্ভাবন করেন তারা। যার সুফল পাচ্ছে বর্তমান সময়ের টেস্ট ক্রিকেট।

মূলত তাদের তিনজনের চালু করে যাওয়া র‌্যাংকিং পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে থাকে এবং ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) কর্তৃপক্ষ সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। এরপর থেকেই এটি আইসিসি প্লেয়ার র‌্যাংকিং হিসেবে চালু হয়। 

২০০৫ সালে ক্রিকেটার সাময়িকীর এক নিবন্ধে ডেক্সটার বলেন, “র‍্যাংকিংয়ের আইডিয়াটা ক্রিকেটের প্রতি আমার সবচেয়ে বড় অবদান। দুটো কভার ড্রাইভ করা ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত হওয়ার চেয়ে এটা দিয়ে পরিচিত হওয়াটা বেশ ভালো।”

যতদিন খেলেছেন, ডেক্সটার ছিলেন এক ভরসার নামএরপর ১৯৮৯ সালে পিটার মে’র পরিবর্তে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের নির্বাচকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ডেক্সটার। তিনি দায়িত্ব পেলেও ইংলিশদের হয়ে সেভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেননি। অবশ্য তার সময়কালে ১৯৯০ সালে দীর্ঘ ১৯ বছর পর উইন্ডিজের বিপক্ষে জয় পেয়েছিল ইংলিশরা।

তবে ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে ভারতের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে হেরে ‘ব্রাউনওয়াশ’ হয় ইংল্যান্ড। এরপর একপ্রকার শক্তি প্রয়োগ করেই ডেভিড গাওয়ারকে বিতর্কিতভাবে দল থেকে বাদ দেন তিনি। যার ফল হিসেবে নিজেকেও ১৯৯৩ সালের শেষ দিকে ইংল্যান্ড ক্রিকেটের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। 

সবশেষ ২০০০ সালে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) সভাপতি নির্বাচিত হন ডেক্সটার। এরপর টানা তিন বছর এমসিসির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সবাইকে বিদায় জানিয়ে ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট ৮৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ডেক্সটার। এরপর এমসিসি এক বিবৃতিতে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছিল,

“After a recent illness, he passed away peacefully in the Compton Hospice in Wolverhampton at midday yesterday, surrounded by his family.”

MCC is deeply saddened to announce the death of the Club’s much loved former President, Edward Dexter CBE.

— Marylebone Cricket Club (@MCCOfficial) August 26, 2021”

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!