বাংলা অনুবাদ করলে অর্থগুলো দাড়ায়, ‘আপনার ভালোবাসা আমাকে শক্তিশালী করে, আপনার ঘৃণা আমাকে অপ্রতিরোধ্য করে।’ হয়তো আনমনে বলে যাওয়া এই কথাগুলো ভালোভাবেই মানেন সিআর সেভেন। তা না হলে কি ৩৮ বছর বয়সেও দারুণ ছন্দ থাকে?
পর্তুগালের ছোট্ট দ্বীপশহর মাদেইরা। সাল ১৯৮৫। ৫ই ফেব্রুয়ারি সেখান থেকেই প্রথমবার পৃথিবীর আলোবাতাস দেখেন রোনালদো। বাবা বাগানের মালি এবং মা রাঁধুনি। ছোট্টবেলার সেই কষ্ট এখনও মনে কাঁদে তার। বন্ধুরাও প্রায়ই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত তাকে। কারণ তার বাবা ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
.png)
রোনালদো যেই স্কুলে পড়তেন সেই স্কুলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসাবে তার বাবাকে দেখা যেত। কিন্ত রন সব সালোচনার উত্তর দিয়েছেন ফুটবল দিয়ে। পড়াশোনা ভালো লাগের না তার। স্কুলে গিয়ে পড়াশোনার বিপরীতে তাকে টানত ফুটবল।
ফুটবল এতো টানতো যে ঘুমানোর সময় ফুটবল ছিল রোনালদোর সঙ্গী। পড়াশোনার ফাঁকে খেলাধুলা করতেন স্থানীয় এফসি অ্যান্ডোরিনহারায়। সেখানে খেলার সময় নজর কাড়েন পর্তুগালের নামকরা ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনের।
বয়সটা তখন বেশি হয়নি। মাত্র ১২ বছর। বাবা-মাকে ছেড়ে ফুটবলে নেশায় ঘর ছাড়লেন রোনালদো। রাতে মাঝে মাঝে মা-বাবার কথা মনে পড়লে কাঁদতেন তিনি। ধীরে ধীরে বয়স বাড়তে থাকে। কিন্ত প্রতিকূলতা পিছু ছাড়ে না।
বয়স ১৫। হঠাৎ দেখলেন স্বাভাবিকের চেয়ে তার হার্টবিট বেশি থাকে। প্রথম দিকে গুরুত্ব দেননি। পরে জানলেন এটা স্বাভাবিক কিছু নয়। এটা একটা রোগ। যার নাম ‘Racing Heart Disease’। ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তারা জানালেন তার আর ফুটবল খেলা যাবে না।
কারণ এই রোগ থাকলে নাকি ফুটবল খেলা যায় না। ফলে নিজের প্রিয় ফুটবল খেলা ছেড়ে দিতে হবে রোনালদোকে। এই তারকার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। পরে ঝুঁকি নিয়ে লেজার সার্জারি করালেন তিনি। ফিরে আসলেন ১২০ গজের মাঠে। ওই যে মাঠে ফিরলেন, তারপর থেকে এখন পর্যন্ত খেলে চলেছেন রোনালদো।
স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে খেলার সময় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যানেজার স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের নজর কাড়েন রোনালদো। ২০০৩ সালে ১২.২৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে সিআর সেভেনকে ইউনাইটেডে নিয়ে আসেন তিনি।
২০০৪ সালে রোনালদো ইউনাইটেডের হয়ে প্রথম শিরোপা এফএ কাপ জেতেন। এরপর দলটিকে টানা তিনটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা, একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জেতাতে সাহায্য করেন সিআর সেভেন।
২৩ বছর বয়সে প্রথম ব্যালন ডি অর জেতেন রোনালদো। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখে তাকে দলে ভেড়ায় স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। ২০০৯ সালে তৎকালীন রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে (প্রায় ৯৪ মিলিয়ন ইউরো) রোনালদো নাম লেখান রিয়ালে। নিজের স্বর্ণালি সময়টা এখানেই কাটিয়েছেন তিনি।
যদিও সেখানে রোনালদোর শুরুটা ভালো ছিল না। প্রথম মৌসুমেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ধাক্কা খায় রিয়াল। রাউন্ড অফ ১৬তেই বাদ পড়ে দলটি। তবে কথায় আছে যে, ‘মন থেকে আপনি যা চাইবেন তা আপনি সরাসরি পাবেন।’ রোনালদোরও এই ট্রফির দেখা পেতে বেশি সময় লাগেনি।
পরের মৌসুমেই শিরোপার দেখা পান রোনালদো। জেতেন কোপা ডেল রে। লা লিগার ট্রফি পেতেও বেশিদিন অপেক্ষা পেতে হয়নি তাকে। ২০১১-১২ মৌসুমে নিজের প্রথম লা লিগা জেতেন তিনি। রিয়ালের আগের চার বছরের মধ্যে সেটাই ছিল প্রথম শিরোপা। রেকর্ড ১০০ পয়েন্ট তুলে সেবার ট্রফি জিতেছিল লস ব্লাঙ্কোসরা।
ধীরে ধীরে দাপুটে দল হয়ে ওঠা শুরু করে রিয়াল। তবে ক্লাবের হয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপাটার দেখা যেন পেতে পেতেও পাচ্ছিলেন না তিনি। ২০১২-১৩ মৌসুমে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের কাছে দুই লেগ মিলিয়ে ৪-৩ গোলে হেরে সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়ে রিয়াল মাদ্রিদ। এরপর ভক্তদের উদ্দেশ্যে রোনালদো বলেছিলেন, ‘তোমরা আমার কাছে একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ পাওনা আছো।’
শেষ পর্যন্ত নিজের কথা রাখেন রোনালদো। এক মৌসুম বিরতির পর টানা তিন মৌসুম রিয়ালকে ইউসিএল জেতান তিনি। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নামধারণ করার পর যেখানে কোনো দল টানা দুইবার শিরোপা জিততে পারেনি, সেখানে রোনালদো রিয়ালকে জিতিয়েছেন টানা তিনবার!
ক্যারিয়ারে এমন অসংখ্যবার, অনেক কঠিন পরিস্থিতি থেকে কামব্যাক করেছেন রোনালদো। তার কঠোর পরিশ্রমের কথা কার না জানা? হার না মানসিকতা, কঠোর পরিশ্রম, দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের সময়ে নিজের সেরাটা বের করে এনে প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলা- এই সবকিছুর একটা কমপ্লিট প্যাকেজ যেন সিআর সেভেন। আর এসব কিছুই তাকে করেছে মহিমান্বিত।
ক্লাব পর্যায়ে পাশাপাশি নিজের দেশ পর্তুগালকেও নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বড় ট্রফির স্বাদ এনে দিয়েছেন রোনালদো। ২০১৬ সালের ইউরোর পর উয়েফা নেশনস লিগও জিতেছে পর্তুগাল। এই অর্জনে বড় অবদান ক্রিস্টিয়ানোর। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটিও তার দখলে। এখন পর্যন্ত ১৯৬ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ১১৮টি।
প্রথম ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ারে ৮০০তম গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন রোনালদো। ১ হাজার ৯৭ ম্যাচ খেলে এই কীর্তি গড়েন তিনি। পেছনে ফেলেছেন পেলে, রোমারিও ও পুসকাসদের মতো কিংবদন্তিদের। স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে ৫টি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ১১৮টি, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৪৫০টি, জুভেন্টাসের জার্সিতে ১০২ এবং পর্তুগালের হয়ে এখন পর্যন্ত ১১৮টি গোল করেছেন তিনি। এছাড়া আল নাসরের জার্সিতে করেছেন ৭ গোল।
মাঠের বাইরের রোনালদোও অসাধারণ একজন। রক্ত দান করেন বলে তিনি ট্যাটু আঁকান না শরীরে। তিনটি মেজর চ্যারিটির (ইউনিসেফ, সেইভ দ্য চিলড্রেন, ওয়ার্ল্ড ভিসন) এম্বাসেডর সিআর সেভেন। অনেক দাতব্য সংস্থাতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিজের অর্জিত বোনাসের বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছেন রোনালদো।
স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়া যেন এখন মৃত্যুপুরী। সেসব ক্ষতিগ্রস্তদের পাশেও দাঁড়িয়েছেন পর্তুগিজ তারকা। নিজের অনেক তরুণ ভক্তের সঙ্গেও দেখা করেছেন বহুবার। মাঠের বাইরে এমন সব দৃষ্টান্ত অবশ্যই অনুপ্রেরণা জোগায় ভক্তদের।
শেষ করছি রোনালদোর একটি উক্তি দিয়ে - ‘Talent without working hard is nothing.’
অর্থাত পরিশ্রম ছাড়া প্রতিভা কিছুই নয়। রোনালদো আছেন। পরিশ্রম করেন। তাই তিনি রোনালদো হয়েছেন। এই কারণে রোনালদোকে অন্য সবার থেকে আলাদা।