মনোযোগ কোথায় বিনিয়োগ করছ?
সকালের প্রথম আলোটা কি তোমার মনোযোগ চুরি করবে, নাকি তুমি নিজেই নিজের মস্তিষ্কের পরিচালক হবে?
রাত ১২টা বাজে, শরীর ক্লান্ত, অথচ হাত ছাড়ছে না স্ক্রিন। নিজেকে জিজ্ঞেস করো, আজ সত্যিই কি কোনো কাজ হলো, নাকি সারাদিন শুধু ব্যস্ত থাকার অভিনয় করলে?
আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যেখানে নিজেকে ব্যস্ত দেখানোটাই যেন সাফল্যের নতুন মাপকাঠি। ক্যালেন্ডারের প্রতিটি ঘর পূর্ণ, নোটিফিকেশনের অবিরাম শব্দ, আর হাতে সব সময় একটা জ্বলজ্বলে স্ক্রিন।
কিন্তু স্নায়ুবিজ্ঞানের অদৃশ্য গবেষণাগারে গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। কগনিটিভ নিউরোসায়েন্টিস্টদের মতে, আমাদের মস্তিষ্ক একসঙ্গে একাধিক কাজ করার জন্য তৈরিই হয়নি। যখনই তুমি কাজের মাঝখানে হুট করে ফোনটা হাতে নাও, তখনই মস্তিষ্ককে সুইচ করার জন্য এক অদ্ভুত অদৃশ্য মূল্য মেটাতে হয়। হারিয়ে যায় সময়, ক্ষয়ে যায় মানসিক শক্তি।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, ফোনটা যদি সাইলেন্ট করে টেবিলের এক কোণে নিথর হয়ে পড়েও থাকে, তবুও তা তোমার মনোযোগের একটা বড় অংশ অলক্ষ্যে শুষে নেয়। ডিস্ট্রাকশন সবসময় শব্দের ডানা মেলে আসে না কখনো কখনো কোনো যন্ত্রের নীরব উপস্থিতিই তোমার চিন্তাশক্তিকে ধীর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আমরা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের মনোযোগকে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করে দিচ্ছি ক্ষণিক আনন্দের বিনিময়ে।
আমরা এতটাই নিঃসঙ্গ বা বিরক্ত হতে ভয় পাই যে, জীবনের প্রতিটি ফাঁকা মুহূর্তকে তথ্য দিয়ে গিলে ফেলতে চাই।
বাসের জন্য অপেক্ষা? ফোন। লিফটে কয়েক সেকেন্ড? ফোন। অথচ মস্তিষ্কের আসল জাদু লুকিয়ে থাকে সেই তথাকথিত একঘেয়েমি বা বোরডমের ভেতরেই।
- যখন মাথা খালি থাকে, তখনই জন্ম নেয় নতুন ভাবনার আলো, খুলে যায় সৃজনশীলতার বন্ধ দুয়ার। ব্রেন কোনো স্থির পাথর নয় নিউরোপ্লাস্টিসিটির নিয়মে তুমি যেভাবে তাকে প্রশিক্ষণ দেবে, সে সেভাবেই মনোযোগের নতুন অভ্যাস গড়ে তুলবে।
উৎপাদনশীলতার এই ইঁদুর দৌড়ে আমরা আরেকটা বড় সত্য ভুলে যাই, বিরতি না দিলে যন্ত্রও বিকল হয়ে পড়ে। স্ট্রেস আর বার্নআউট এক জিনিস নয়। নিয়মিত ছোট ছোট রিচার্জ, কাজ থেকে মানসিকভাবে একদম আলাদা হয়ে যাওয়ার অভ্যাসই পারে ভেতরের আগুনটাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে।
দিনের শেষে চাবিকাঠিটা ২৪ ঘণ্টার আয়তনে লুকিয়ে নেই, কারণ সেই সময়টুকু সবার জন্যই সমান। আসল খেলাটা লুকিয়ে আছে তোমার মনোযোগের রাশ কার হাতে, তার ওপর। সময় তো বয়ে যাবেই, কিন্তু তুমি তোমার মনোযোগ কোথায় বিনিয়োগ করছ, সেটাই খুব গোপনে আর নিঃশব্দে লিখে চলেছে তোমার ভবিষ্যৎ।
আজ রাতে স্ক্রিনটা বন্ধ করার আগে ভেবে দেখো, কাল সকালের প্রথম আলোটা কি তোমার মনোযোগ চুরি করবে, নাকি তুমি নিজেই নিজের মস্তিষ্কের পরিচালক হবে?