রিকশা আর্টে কম্পিউটারের ব্যবহার, ভাতে মরছেন চিত্রকররা
একসময় রিকশা চালাতাম। ২০০২ সালের দিকে ওস্তাদ ফজল করিম মিস্ত্রির উৎসাহে রিকশা চিত্র আঁকা শুরু করি। এরপর এই পেশাতেই কেটে গেছে ১৮ বছর। রিকশার গাঁয়ে হাতে আঁকা চিত্রকর্মের কদর আগে থাকলেও এখন তাতে ভাটা পড়েছে।
এভাবেই আক্ষেপ প্রকাশ করে কথাগুলো বলছিলেন এক রিকশা চিত্রকর মোহাম্মদ শাহীন মিস্ত্রি। বর্তমানে হাতে আঁকা রিকশা চিত্র হটিয়ে জায়গা দখল করছে ‘ডিজিটাল প্রিন্ট’৷ রুটি-রুজি যোগাতে হিমশিম খাওয়া এসব শিল্পীরা পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। যদিও শাহীনের মতো অনেকেই ধরে রেখেছেন এই ঐতিহ্য।
প্রথমেই জেনে নিন রিকশা আর্ট কী-
রিকশার সঙ্গে পথ চলতে থাকে চিত্রগুলোও। রোমান্টিকতার নতুন ধারা হিসেবে রিকশা চিত্র জন্ম নিয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশে। খুব কঠিন করে ‘ত্রিচক্রযানচিত্র’ও বলা চলে তবে সবসময় সবকিছুর বাংলাটা তো আর চলে আসে না ভাষায়। তাই ওই ‘রিকশা আর্ট’ ই অপেক্ষাকৃত পরিচিত নাম। রিকশা আর্ট মানেই যে শুধু রিকশার পেছনে আঁকা থাকবে তা কিন্তু নয়।
যদিও শুরুটা এর থেকেই, মূলত উজ্জ্বল রঙে আঁকা সুস্পষ্ট সাবলীল ও প্রাণবন্ত গঠনকে রিকশা আর্ট বোঝানো হয়। এর একটি নির্দিষ্ট গঠন আছে। আর এ কারণেই খুব সহজেই চেনা যায় এটি রিকশা আর্ট! রিকশা আর্টের মূল লক্ষ্য রিকশাকে সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় করা। গত ৫০ বছরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে রিকশা পেইন্টিং করা হয়েছে। যেমন, ষাটের দশকে রিকশা পেইন্টিং করা হতো মূলত শীর্ষ স্থানীয় চলচ্চিত্র তারকাদের প্রতিকৃতি অবলম্বনে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে বিষয়বস্তু করে। আবার সত্তরের দশকে নতুন দেশের নতুন রাজধানী হিসেবে ঢাকা যখন বাড়তে শুরু করে, তখন কাল্পনিক শহরের দৃশ্য আঁকা হত রিকশায়। পাশাপাশি সব সময়ই গ্রামের জনজীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিও আঁকা হতো, এখনো হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ফুল, পাখি ইত্যাদি তো আছেই।
মোহাম্মদ শাহীন বলেন দু’টি রিকশা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকলে সুন্দর রিকশাতেই মানুষ লাফিয়ে উঠে। কারণ রিকশার সৌন্দর্যই ফুটে উঠে এসব চিত্রকর্মে। শাহীন রিকশাকে সুন্দর করতে এর পেছনে ফুল, পাখি, তাজমহল, বিভিন্ন নায়ক-নায়িকার ছবিসহ বিভিন্ন চিত্র আঁকিয়ে অভ্যস্ত। এটিই তার নেশা ও পেশা। যখন একটি রিকশা নতুন রঙে সেজে উঠে তখন নিজের শত কষ্টেও মনটা ভালো হয়ে যায় বলে জানান এই আঁকিয়ে।
কীভাবে আঁকানো হয়?
শাহীন জানান, উজ্জ্বল রংই রিকশা চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফ্লুরোসেন্ট নীল, সবুজ, লাল, হলুদ, গোলাপি- এই রংগুলো বেশি ব্যবহৃত হয়। হালকা রঙের ব্যবহার নেই বললেই চলে। খুব দূর থেকেও চোখে ধরা পড়তে পারে সবচেয়ে উজ্জ্বল রংগুলো।
শাহীন মিস্ত্রির সঙ্গে অন্যান্য রিকশা চালকদেরও একই মত। নতুন এবং সুন্দর চিত্রকর্মের রিকশা দেখলে যে কেউ উঠতে আগ্রহ প্রকাশ করে। এতে করে তাদের আয়ও ভালো হয়। আগে ওস্তাদ যখন কাজে নিত, তখন দুই চারজন মিলেও কাজ শেষ করতে পারতাম না। আর এখন একাই কাজ পাই না। এভাবেই আক্ষেপ প্রকাশ করেন শাহীন। তার মতো অনেক চিত্রশিল্পীরাই আজ অভাবগ্রস্থ।
জানেন কি? একটি রিকশা তৈরি থেকে রাস্তায় নামা পর্যন্ত ছয় শ্রেণীর পেশাজীবীর হাত ঘুরে আসে। তারা হলেন,
হুড মিস্ত্রি: এরা রিকশার হুডে রেক্সিন দিয়ে অ্যাপ্লিক-সদৃশ অলংকরণের কাজ করেন।
বডি মিস্ত্রি: এরা রিকশার মূল কাঠামো নির্মাণ করেন।
বাতা কারিগর: রিকশার হুড বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি করেন এই কারিগরেরা।
পেইন্টার: রিকশার চৌকোণা বোর্ড ও পেছনে বডির গায়ে পাতলা টিনের শিটের ওপর ছবি আঁকেন এরা। এদেরকেই মূলত রিকশা পেইন্টার বলা হয়।
রংমিস্ত্রি: এরা চাকার ওপর ধাতু নির্মিত ‘মাডগার্ড’সহ অন্যান্য ধাতব অংশে আলপনার মতো রং করে থাকেন।
ফিটিং মিস্ত্রি: রিকশার বিভিন্ন যন্ত্র যথাস্থানে সংস্থাপনের কাজ করেন এরা।
শাহীন জানান, রিকশা চিত্রকররা একেকটা গাড়ি সাড়ে সাত হাজার টাকা চুক্তিতে নেন। আগে রিকশার নিচের চেসিসটা মালিক দিতেন আর রং থেকে যাবতীয় জিনিস সব কিছুর খরচই আমাদের করতে হত। এখন অবশ্য মালিক নিজেই সবকিছু কিনে দেন। আর চিত্রকররা সাড়ে তিন হাজার টাকা মজুরি পান। এভাবে মাসে সর্বোচ্চ দুই থেকে পাঁচটা কাজ পান শাহীন। যদিও রিকশা চিত্রকর্ম আগে হাতে করা হলেও এখন প্রিন্টে করা হয়। কম্পিউটার প্রিন্টের কাজ হলেও দিনে তিনশ, চারশ বা পাঁচশ টাকা হয়।
শাহীনের ওস্তাদ মোহাম্মদ আলী মিস্ত্রি মারা গেছেন তবে তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন ছোট ভাই ফজল করিম মিস্ত্রি। তবে এখন আর এসব করেন না তিনি। তিনি শিক্ষিত থাকলেও এই পেশার কারণে কখনো চাকরি করেননি। তাহলে হয়তো তিনি ভালো থাকতেন। এখন ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালাতে হচ্ছে তাকে। বাকি যারা রিকশা চিত্রশিল্পী আছেন তাদেরও একই অবস্থা। কোনো রকমে দিন চালিয়ে নিচ্ছেন তারা। যারা পুরনো ছিলেন তারাই টিকে থাকতে পারেননি। এখন যারা আছেন তারাই বা টিকে থাকবেন এমন সম্ভাবনাও নেই। কারণ তাদের হাতে কোনো কাজ নেই।
শাহীন মিস্ত্রি মনে করেন, রিকশাও মনে হয় থাকবে না। ডিজিটাল যুগে নতুন কিছু হয়তো রাস্তায় আসবে। তাই টাকা যোগাড়ের চেষ্টা করছেন। ছয় লাখ টাকা হলেই ঢাকা থেকে গ্রামে চলে যাবেন। সেখানে গিয়ে দুটি গাভী কিনে লালন পালন করবেন। শাহীন স্বপ্ন দেখেন যখন তার নাতি নাতনি হবে তখন তাদেরকে তিনি তার এই কর্মের কথা গল্প করবেন। আরো বলবেন, পাখি আঁকতাম, বডি বানাতাম, সুন্দর গাড়ি তৈরি করতাম। এখন আর এই পেশা নেই।
একসময় শাহজাহান মিস্ত্রি, পল্লব মিস্ত্রির অনেক জনপ্রিয়তা ছিল। এখন কিন্তু তারা নিঃস্ব। তাদের পর এ কাজ আর কেউ শেখেইনি। শাহীন বলেন, তার কোনো সাগরেদ নেই। এমনকি তার তিন ভাই রয়েছে। তাদের কাউকেই তিনি এ কাজে সম্পৃক্ত করেননি। অনেক আক্ষেপের সঙ্গে শাহীন বলেন, যদি কোনো কাজে জীবিকা না বাঁচে, তাহলে সে কাজ না করাই ভালো।
তবে কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে রিকশা আর্ট?
কম পারিশ্রমিক এবং চাহিদায় ভাটা পড়ে যাওয়ায় এই পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন রিকশা চিত্রকররা। কারণ তাদের নিজের পেট চালানোই এখন দায়। হয়তো দ্রুতই বাংলাদেশের, বিশেষ করে এর রাজধানী ঢাকার বহমান ঐতিহ্যের একটি বিশেষ অংশ- ‘রিকশা আর্ট’ বিলুপ্ত হয়ে যাবে শিল্প ও শিল্পীর প্রতি অবহেলায়।
বর্তমানে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তবে তা সরকারিভাবে নয়, কিছুটা ব্যক্তিগতভাবে। ‘রিকশা আর্ট ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি ওয়েবসাইট একটি রিকশা আর্টের বিক্রয়ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এতে একেকটি ছবির দাম রাখা হয়েছে আকারভেদে ইউএস ডলার ৮০-১০০-২০০ এরকম।
যা প্রচলিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। এটি মূলত রিকশা আর্টকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলতে এবং শিল্পীদের ভালো অঙ্কের টাকা আয় করানোর উদ্দেশ্যে চালু হয়েছে। পুরান ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গার বেশ কয়েকজন শিল্পী এতে কাজ করছেন।
সূত্র: ডয়চে ভেলে