জুমার দিনে দরুদ পাঠের ফজিলত
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি। এ দিন নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও দরুদ পাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা মুমিনের ভালোবাসা ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে জুমার দিনে দরুদ পাঠের প্রতি হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
জুমার দিনে বেশি দরুদ পড়ার নির্দেশ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। সুতরাং তোমরা এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।”
.png)
সাহাবিরা জানতে চাইলেন, তাদের দরুদ কীভাবে নবীজির কাছে পেশ করা হবে। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা নবীদের দেহ মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।
(সুনানে আবু দাউদ)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, জুমার দিনে দরুদ পাঠের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাই এ দিনে অন্যান্য নেক আমলের পাশাপাশি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা উচিত।
দরুদ পাঠের অর্থ কী?
দরুদ হলো মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি আল্লাহর রহমত, শান্তি ও বরকত কামনা করা। মুসলমানরা বিভিন্ন সহিহ দরুদ পাঠ করেন। নামাজের শেষ বৈঠকে পাঠ করা দরুদে ইবরাহিম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সহজভাবে একটি দরুদ হলো:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ।
অর্থ: হে আল্লাহ, হযরত মোহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবার-পরিজনের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।
একবার দরুদে দশবার রহমত
দরুদ পাঠের অন্যতম বড় ফজিলত হলো, একজন বান্দা মহানবী (সা.)-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন।”
(সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ অল্প সময়ের একটি আমলের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর রহমত লাভের সুযোগ পান। জুমার দিনে এই আমল বেশি করার প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
নবীজির নৈকট্য লাভের আমল
দরুদ পাঠ মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন নবীজির সবচেয়ে নিকটবর্তী ব্যক্তি হবেন যিনি তার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সে, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে।”
(জামে তিরমিজি)
তাই জুমার দিনকে দরুদ পাঠের জন্য বিশেষভাবে কাজে লাগানো একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমল হতে পারে।
দোয়ার আগে ও পরে দরুদ
দোয়া কবুলের আদবের মধ্যেও দরুদ পাঠের গুরুত্ব রয়েছে। হাদিসে এমন একজন ব্যক্তির কথা এসেছে, যিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন কিন্তু নবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করেননি। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দোয়ার ক্ষেত্রে দরুদ পাঠের প্রতি নির্দেশনা দেন।
তাই দোয়া করার সময় প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা, এরপর নবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করে দোয়া শুরু করা এবং শেষে আবার দরুদ পাঠ করা উত্তম আদব।
জুমার দিনে কীভাবে বেশি দরুদ পড়বেন?
জুমার দিন দরুদ পাঠের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বাধ্যতামূলক নয়। যে ব্যক্তি যতটুকু সম্ভব, আন্তরিকতার সঙ্গে দরুদ পাঠ করতে পারেন।
দিনটিকে এভাবে সাজানো যেতে পারে:
ফজরের পর কিছু সময় দরুদ পাঠ
কাজের ফাঁকে নিয়মিত দরুদ পাঠ
জুমার নামাজের আগে ও পরে দরুদ পাঠ
মসজিদে যাওয়ার পথে দরুদ পাঠ
দোয়া করার আগে ও পরে দরুদ পাঠ
রাতে ঘুমানোর আগে দরুদ পাঠ
মূল বিষয় হলো, দরুদ পাঠের পাশাপাশি ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা এবং আল্লাহর স্মরণে সময় কাটানো।
দরুদ শুধু মুখের উচ্চারণ নয়
দরুদ পাঠের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের সম্পর্ক রয়েছে। একজন মুসলমান যদি নবীজির ওপর দরুদ পাঠ করেন, তাহলে তার জীবনে নবীজির আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টাও থাকা উচিত।
সত্যবাদিতা, আমানতদারি, মানুষের প্রতি দয়া, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং সুন্দর আচরণ নবীজির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাই দরুদ পাঠের বরকত লাভের পাশাপাশি তার আদর্শ অনুসরণ করাও জরুরি।
জুমার দিনে আরও যেসব আমল করা যায়
জুমার দিনে দরুদ পাঠের পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, বেশি বেশি জিকির, দোয়া, তওবা ও ইস্তিগফার করা যেতে পারে। এ দিন সূরা কাহফ পাঠেরও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
এ ছাড়া জুমার নামাজ যথাসময়ে আদায় করা এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার বিশেষ সুযোগ রয়েছে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তাই এ দিনের শেষভাগসহ বিভিন্ন সময়ে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
জুমা শুধু সাপ্তাহিক একটি নামাজের দিন নয়; এটি মুসলমানের জন্য ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ সুযোগ। এ দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ এবং হাদিসে উৎসাহিত একটি আমল।
একবার দরুদ পাঠে আল্লাহর পক্ষ থেকে দশবার রহমত লাভের কথা সহিহ হাদিসে এসেছে। তাই জুমার দিনকে অবহেলায় না কাটিয়ে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দরুদ ও দোয়ার মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ এবং তার সুন্নাহ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।