সরেজমিন দেখে আসার পর আমার মতামত হলো- পরিস্থিতি ভালো নয়। মিয়ানমার সীমান্ত ভয়াবহ রকম অরক্ষিত।
আরকান আর্মির সদস্যরা অনায়াসে বাংলাদেশের ভেতরে আসা যাওয়া করছে। মিয়ানমারের নাগরিককরাও যাতায়াত করতে পারে। বিজিবির সদস্যদের সহযোগিতায় ইয়াবাসহ অন্যান্য পণ্য বাংলাদেশে ঢুকছে। বাহিনীটির সদস্যদের অনেকেই এই সীমান্তে থাকাটাকে সৌভাগ্যের বলে মনে করেন।
.png)
তবে তমব্রুর কোনাবাড়ি, বাইশফাঁড়ি, তম্ব্রু বাজার, জলপাইতলী, অর্থাৎ গোটা ঘুমধুম সীমান্ত থ্যাইংখালী, হোয়াইক্যং সীমান্ত অর্থাৎ স্থলভাগের অংশে বিজিবি সদস্যরা নিজেরা নিজেদের নিরাপত্তার চিন্তায় আছেন।
জানা যায়, যেসব বিজিপি সদস্যরা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে এদেরকে ধরে ধরে বিজিবির হাতে এনে দিয়েছে স্থানীয়রা। বিজিবি নিজ থেকে এগিয়ে যায়নি একটি ঘটনায়ও। বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র পড়ে থাকাসহ সবকটি ঘটনায় বিজিবির চরম দীর্ঘসূত্রীতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
তম্ব্রু বাজারে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে দৌড়ানো কেএনএফ সদস্যদের ভিডিও বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে।
ঘুমধুম ও হোয়াক্যং সীমান্ত আরাকান আর্মির দখলে। খুব ক্ষুদ্র অংশ আরএসওর দখল আছে।
সীমান্তের মানুষেরা আতঙ্ক আছে, যদি মিয়ানমার আর্মি পাল্টা আক্রমণ করে তাহলে আবারও হতাহত হবে বাংলাদেশের মানুষ। এমনকি আরকান আর্মিও বিজিপির মতো বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে পারে।
গত কয়েকদিনের অনুপ্রবেশের ঘটনায় বেশ কিছু অস্ত্র সীমান্তের মানুষের হাতে পড়েছে এটা শতভাগ নিশ্চিত। অভিযোগ পাওয়া যায়, বিজিপি সদস্যদের প্রায় প্রত্যেকের সাথে থাকা স্বর্ণও হাতিয়ে নিয়েছে সাধারণ বাঙালিরা, এমনকি কিছু বিজিবি সদস্যরাও। সীমান্তে স্মাগলাররা শুধু অস্ত্র নয়, গোলাবারুদও নিজেদের দখলে নিয়ে বিক্রির অফার দিচ্ছে প্রকাশ্যে। এ বিষয়গুলোতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নজরদারির পাশাপাশি দ্রুত সীমান্তের ভেতরে অভিযান করা দরকার। এই অস্ত্র সমতলে এলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সীমান্তে মিয়ানমারের দেওয়া কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও বাংলাদেশের নেই।
বিজিপি সদস্যরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার সময় বেশ কয়েকজন আরএসও সদস্য অস্ত্রসহ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। যেটি টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারেও দেখা গেছে। আরএসও বিষয়ে বাংলাদেশ বিশেষ সিদ্ধান্ত নিলে তা বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে আগে থেকেই সমন্বয় করা উচিত এবং ঐ অঞ্চলে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারে রাষ্ট্রীয় কোনো বিধি নিষেধ থাকলে তা সব গণমাধ্যমের জন্যই একরকম হওয়া উচিত।
সীমান্ত এলাকার মানুষজন গোলাগুলি, মর্টারশেল এর শব্দ এসবের মধ্যেই নিজেদের দৈনন্দিন কাজ করছেন। শূন্যরেখা ঘেঁষে আরকান আর্মির সদস্যরা চলাফেরা করছে। তাদের খাবার ও জ্বালানির জোগান দিতে বাংলাদেশের পাচারকারীরা খাদ্য ও জ্বালানি পাচারের চেষ্টা করছে, যেগুলো প্রকাশ্যে জনসাধারণের হাতে চলে আসছে সেগুলো আটক করতে বাধ্য হচ্ছে বিজিবি। বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কও ব্যবহার করছে মিয়ানমারের নাগরিকরা।
জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেকেই বেতনভুক্ত হিসেবে আরাকান আর্মিতে চাকরি করছে। এই বিষয়গুলো ভালোভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
বিজিবিকে জিরো টলারেন্সে রাখা উচিত। আরকান আর্মি যেহেতু সীমান্তের নিয়ন্ত্রণে, তাদের সঙ্গে বাহিনী পর্যায়ে যোগাযোগ দৃঢ় করা দরকার। এমনকি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার হওয়া দরকার। বিজিবি সদস্যরা যেহেতু অবৈধ পাচারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তাই, তিনমাস পরপর তাদের গোটা টিম বদলি করা উচিত।
সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে চিরুনি অভিযান করে অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা উচিত। মিয়ানমার সেনাবাহিনী পাল্টা আক্রমণে এলে স্থানীয় জনগণকে কীভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হবে সেটি এখনই ভাবা উচিত। আরাকান আর্মি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাদের কীভাবে প্রতিহত করা হবে, সেটি নিয়েও চিন্তা করা এবং পরিকল্পনা রাখা দরকার। যেহেতু আরএসওকে বাংলাদেশ ব্যাকআপ দিচ্ছে তাই আরএসও-তে সদস্য সংখ্যা বাড়ানো এবং তাদের শক্তি বৃদ্ধি করা উচিত। এতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয়ের উপরেই চাপ বাড়াতে পারবে বাংলাদেশ। বান্দরবান রাঙ্গামাটি খাগড়াছড়ির যে সেল ইউ পিডিএফ কিংবা কেএনএফ এদের কারো সঙ্গেই যেন আরাকান আর্মি কোনো ধরনের সমঝোতা বা সখ্য না করতে পারে সে বিষয়ে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো দরকার। সার্বিকভাবে যেহেতু মিয়ানমার সীমান্তে দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করবে, সেহেতু সরাসরি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা না গেলেও, সামরিক কৌশলগত কারণেই পুলিশ ও বিজিবির পোশাকে হলেও সেনা সদস্যদের উপস্থিতি রাখা জরুরি।
লেখক: চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, নিউজ টোয়েন্টিফোর টিভি