ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

সমন্বিত প্রয়াসে আগুন বিভীষিকা থেকে বাঁচুন 

আফরোজা পারভীন
প্রকাশিত: ১৪:০০, ৯ মার্চ ২০২৩
সমন্বিত প্রয়াসে আগুন বিভীষিকা থেকে বাঁচুন 
ছবি: অন্তর্জাল

গরম পড়ার আগেই শুরু হয়েছে আগুনলাগার ঘটনা। প্রতিবছর আগুনে জীবন যায় দেশের অসংখ্য মানুষের, নিঃস্ব হয় অগুনতি মানুষ। জীবিকা হারিয়ে কত মানুষ পথে বসে যায়, সারাজীবনের কষ্টার্জিত সম্পদ কেড়ে নেয় সর্বগ্রাসী আগুন। এ চিত্র আমাদের চিরচেনা। আগুন লাগে, আমরা তাকিয়ে দেখি, হা-হুতাশ করি, আশপাশের লোকজন আগুন নেভাতে ছুটে যায়, ফায়ার সার্ভিস ছুটে আসে। একসময় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ততক্ষণে চলে যায় অনেক মূল্যবান জীবন ও সহায় সম্পদ।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ফায়ার ফাইটারদের জীবন দানের করুণ কাহিনিও জানি। আমরা তাদের ত্যাগ, তাদের সাহসিকতাকে বাহবা দিই। জীবনের বিনিময়ে কিছু ক্ষতিপূরণ তাদের পরিবার পায়। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ অন্য পরিবারগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ওরাও যে সর্বহারা হয়ে যায় তা আমরা ভেবে দেখি না! বড় সড় আগুন লাগার পর প্রতিবারই অপর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, মই, হোস পাইপ, প্রয়োজনীয়  অন্য যন্ত্রপাতির অপর্যাপ্ততা  এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের অদক্ষতা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কথা সামনে আসে। কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর ঝিমিয়ে পড়ে। পরের অগ্নিকাণ্ডে একই চিত্র প্রতিভাত হয়। 

সম্প্রতি গুলশানের একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। মারা গেছেন দুজন। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন আরো কয়েকজন। অভিজাত এলাকার এই ভবনটি নির্মাণেও অভিজাত। প্রশস্ত, খোলামেলা, কাচমোড়া। সাধারণ মানুষ সন্তর্পণে এসব ভবনের দিকে তাকায়। কারণ এ জাতীয় ভবনে বসবাসের সামর্থ্য তাদের কোনোদিনই হবে না। কিন্তু এই ভবনে যখন আগুন লাগে তখন বস্তিবাসীও ভাবে, এদের সঙ্গে আমাদের তফাৎ কী! এরাও যা আমরাও তাই! আগুন লাগে ভবনটির সাততলা থেকে। উপরের তলাগুলো সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। কীভাবে আগুন লাগলো সেই সন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে কিছু কথা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এমন অভিজাত এলাকার অভিজাত ভবনে ছিল না কোন জরুরি নির্গমণ ব্যবস্থা, ছিল না অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা। ভবনটির ছিল না ফায়ার সেফটি লাইসেন্স।  অন্যদিকে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার বলছেন, সেন্ট্রাল এসি থেকে আগুন লেগেছে। অর্থাৎ তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। আশপাশের লোকজন আগুন দেখে ছুটে গিয়েছিলেন উদ্ধারকাজে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। কিন্তু ভবনের দারোয়ানরা তাদের ঢুকতে দেয়নি।  আশপাশের লোকের দাবি, ঢুকতে দিলে একটা প্রাণও হানি হতো না। আগুন থেকে বাঁচতে কেউ দিয়েছেন ছাদ থেকে নিচে লাফ, কেউ দিয়েছেন ছাদ থেকে সুইমিং পুলে ঝাপ। ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট সেখানে কাজ করেছে, ক্রেনের মাধ্যমে পানি ছিটানো হয়েছে। এমনকি শেষাবধি হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়েছে। তারপরেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে  বেশ কয়েক ঘণ্টা লেগেছে। 

Advertisement

এই একটি ঘটনাই কেবল নয়, গত এক সপ্তাহে আগুন লেগেছে নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জ স্পিনিং মিলে, রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে, রাজধানীর মৌচাক টাওয়ারে, গাজীপুরের কোনাবাড়ির নছের মার্কেটের ঝুটের গোডাউনে। এ আগুন ছড়িয়ে পড়ে ছয়টি গোডাউনে। এমনকি রংপুর মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে। যে বার্ন ইউনিট আগ্নিদগ্ধদের সারিয়ে তোলার কাজ করে সেখানেই যদি আগুন লাগে তাহলে মানুষ কোথায় নিরাপদ! জানা গেছে এসিড থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। হতে পারে । শোনা যাচ্ছে এই আগুনে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। হয়নি ভাল কথা, কিন্তু হতে তো পারতো। এসিড নিয়ে যারা কাজ করে তাদের তো আরো সতর্ক থাকা দরকার। এরপর এই ইউনিটে যদি আর কোন রোগী ভর্তি হতে না চায় তাহলে তাদের দোষ দেয়া যাবে কী? এসিড এবং কেমিক্যালে আগুন লাগা নতুন কিছু নয়। স্মরণকালে ঘটে যাওয়া চকবাজারে বহুতল ভবনে কেমিক্যালের মাধ্যমে সৃষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। ঐ ভবনটিতে প্রচুর প্লাস্টিক আর কেমিক্যাল রাখা ছিল। সেখান থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। প্রথমে একটি ভবনে তারপর দ্রুত সে আগুন ছড়িয়ে যায় আশপাশের ভবনে। মারা যান কমপক্ষে ৫৬ জন, আহত হন ৫০ এর বেশি। আর সীতাকুণ্ডে কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মনে পড়লে এখনো শিউরে উঠি। ডিপোতে বড় বড় ড্রাম ভর্তি ছিল কেমিক্যালে । সেই ড্রাম ব্লাস্ট হয়ে কেমিক্যাল ছড়িয়ে পড়ে। বিকট শব্দে আগুন লাগে। কেঁপে ওঠে আশপাশের বহুদূর। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় পুরো এলাকা। কেমিক্যাল বহনকারী কন্টেইনার আর কাভার্ড ভ্যানগুলো দুমড়ে মুচড়ে পুড়ে যায়। প্রবল বিস্ফোরণে খসে খসে পড়ে প্লাস্টার, ইলেকট্রিক তারসহ অনেক কিছু। কারো কারো হাত পা কেটে ফেলতে হয়। ফায়ার বিগ্রেডসহ আশপাশের লোকজন উদ্ধারকাজে জীবনপাত করে। যাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় তাদের অধিকাংশেরই শ্বাসনালির ৭০% ভস্মীভূত হয়েছিল। মারা যান কমপক্ষে ৩৯ জন। আহত নিহতদের অধিকাংশ ছিলেন কন্টেইনার বহনকারী গাড়ির চালক, হেলপার, শ্রমিক। মৃতদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন দমকল বাহিনীর সদস্য। দেশের ইতিহাসে একসঙ্গে এতজন দমকল কর্মীর নিহত হবার নজির আর নেই। এক ভদ্রলোক মোটামুটি নিরাপদ দূরত্বে থেকে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  মানুষকে জানাচ্ছিলেন। একসময় তিনিও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান।

ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান- ১০ নামে লঞ্চে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনাটি অনেকেই ভোলেননি। গভীররাতে বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে লঞ্চটি। বিকট শব্দে ঘুমিয়ে থাকা যাত্রীরা জেগে ওঠে।  ইঞ্জিনরুম থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারতলা লঞ্চটিতে। তখন রাত তিন টার কিছু বেশি। তীব্র শীতে গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল লঞ্চের  কেবিনের অধিকাংশ যাত্রী।  ঘুম ভেঙে পুরো লঞ্চে আগুনের  লেলিহান শিখা ও  ধোঁয়া দেখে হতচকিত হয়ে পড়ে যাত্রীরা। ডেকে হুড়াহুড়ি শুরু হয়। ধাক্কাধাক্কি ও পায়ে পিষে আহত হয় অনেকে। রিভার ভিউয়ের দিকে  কেবিনে  যেসব যাত্রী ছিল, তারা অনেকেই  বের হতে পারে। লঞ্চের মাঝখানের কেবিনের অনেক যাত্রীই ধোঁয়ার কারণে বের হতে পারেনি । লঞ্চ জুড়ে হাহাকার, আত্মচিৎকার! যে যেভাবে পারে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে। অনেকে স্বজনদের রেখেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে। কেউ কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই অগ্নিদগ্ধ হয়। সন্তানের কথা চিন্তা করে কেউ কেউ নদীতে লাফ দেয়নি। সন্তান সাঁতার জানে না। ওদের রেখে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য ঝাঁপ দেবে কীভাবে! অনেক স্বামী-স্ত্রীও এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। বাচ্চাকে বাঁচাবে, স্ত্রীকে বাঁচাবে, নাকি নিজে বাঁচবে? আগুনের তীব্রতা  বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই ভিড় ঠেলে সামনে আসতে পারেনি। যেখানে ছিল সেখানেই আগুনে দগ্ধ হয়। ধোঁয়ায় জ্ঞান হারিয়ে  ফেলে। অজ্ঞান অবস্থায় আগুনে পুড়ে অনেকেই মারা যায়।  একদিকে আগুন, অন্যদিকে পানি। দুইদিকেই হা করে আছে মরণ! 

তারপরও শক্ত সামর্থ্য লোকেরা লাফ দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে পাড়ে ওঠার  চেষ্টা করে।  কেউ  কেউ বেঁচেছে, অনেকেই বাঁচেনি। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ৫০ জনের অধিক। আহত শতাধিক। 

এমন ঘটনা অসংখ্য । কথা একটাই। সরকারি পর্যায়ে যেমন আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং আগুন সচেতনতার বিষয়ে অধিক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা দরকার, দরকার পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট, তেমনি জনগণেরও দরকার সতর্কতা। কারণ ঘটনা ঘটে গেলে অন্যকে দায়ি করে কারো লাভ হয় না। ক্ষতি হয় নিজেরই। তাই প্রয়োজন আগুন বিষয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সচেতন হওয়া। তিন চার বছর আগে জয়পুরহাটের একটি বাসায় আগুন লেগে একই পরিবারের আটজন সদস্য মারা যান।  বৈদ্যতিক চুলার বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে শর্ট সার্কিট হয়ে সূত্রপাত হয়েছিল এ আগুনের। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে  একই কারণে পুড়ে যায় ৩৮টি ঘর। অবৈধ গ্যাস লাইন বিস্ফোরণ হয়েও মাঝে মাঝে আগুন লাগে। আশুলিয়ায় এই জাতীয় বিস্ফোরণে আহতদের পাঁচ জনের মধ্যে মারা যান তিনজন। বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী এর আগের ছয় বছরে সারাদেশে ৮৮ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।  এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রাণহানি হয়েছে ১৪০০ জন আহত হয়েছে ৫০০০ জন। এটা ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান। এরপর ঘটেছে বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। কাজেই বর্তমার পরিসংখ্যান এর চেয়ে অনেক বড়। 

বড় বড় ভবন, বস্তি, গোডাউন, মিল কারখানায় আগুন লাগার ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হয়ত ব্যক্তিবিশেষের নেই, কিন্তু নিজস্ব বাড়ির সতর্কতাটুকু আমরা নিতে পারি । নিয়মিত বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, গ্যাস সিলিন্ডারের সুষ্ঠু ব্যবহার, দাহ্য পদার্থ রান্নাঘর থেকে দূরে রাখা, বাড়িতে একটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা, বাড়িতে বালি, পানি, দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি ফায়ার বিটার তো আমরা রাখতে পারি। বেঘোরে জীবন দেয়ার চেয়ে একটু কষ্ট হলেও এগুলো তো করাই যায়। আর আগুন যদি লেগেই যায় মনোবল না হারিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়া, আশপাশের লোকের সাহায্য চাওয়া, ভেঙে না পড়ে আগুন থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজা প্রয়োজন।

ঘটনা বা দুর্ঘটনা সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত প্রয়াস জরুরি।  আগুন থেকে বাঁচার জন্যও সরকার এবং জনগণকে একযোগে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।


 লেখক: কথাশিল্পী, গবেষক, প্রাবন্ধিক 
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!