ঢাকা,  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

পোশাক খাতে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে ১২ লাখ শ্রমিক

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৪৫, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
পোশাক খাতে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে ১২ লাখ শ্রমিক
সংগৃহীত ছবি

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অটোমেশনের প্রভাবে ২০৪১ সালের মধ্যে এ খাতে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় ‘এআইয়ের যুগে এশিয়ার শ্রমবাজার: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তারে এশিয়ার শ্রমবাজারে সম্ভাব্য পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের ঝুঁকি এবং নতুন দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের অর্থনীতিবিদ দিব্যা কীর্তি গবেষণাটি উপস্থাপন করেন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশায় প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট দক্ষতার চাহিদা তুলনামূলক কম প্রভাবিত পেশার প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে কিছু পেশায় নতুন কর্মী নিয়োগের চাহিদা প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। তবে এর অর্থ সামগ্রিক কর্মসংস্থান একই হারে কমে যাওয়া নয়। বরং নিয়োগদাতাদের চাহিদা ও কাজের ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় শিল্পকারখানায় প্রচলিত উৎপাদনব্যবস্থাও বদলে যাচ্ছে। আগে যে কাজ সম্পন্ন করতে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সাহায্যে এখন তা তুলনামূলক কম কর্মী দিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও দক্ষতার ঘাটতিতে থাকা শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কাজ করছেন। তবে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কায় পড়তে পারেন।

সিপিডির গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, তৌফিকুল ইসলাম খান, মামতাজুল জান্নাত ও মালিহা রহমান। এতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণের পাশাপাশি দক্ষতার ঘাটতি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সুরক্ষার দুর্বলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় নারী শ্রমিকদের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকার কারণও তুলে ধরা হয়েছে। পোশাকশিল্পে অনেক নারী এমন কাজে নিয়োজিত, যেগুলো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে সহজেই সম্পন্ন করা সম্ভব। অন্যদিকে আধুনিক যন্ত্র পরিচালনা, উৎপাদন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্ট পদে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির সুযোগ সবার সমান নয়।

ফলে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়তে পারেন।

এদিকে আইএমএফের গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রাথমিক জ্ঞান, বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমে এআই যুক্ত করার সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে অটোমেশনের বিস্তার ঘটলে যন্ত্র পরিচালনা, উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন পরিকল্পনায় দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়বে। তাই শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষায় সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

পাশাপাশি সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে যারা চাকরি হারাবেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, আগামী এক দশকে বাংলাদেশসহ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রায় ১৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মবাজারে প্রবেশের এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও তৈরি করছে।

একদিকে আধুনিক প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকলে তরুণদের একটি অংশ চাকরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ হারাতে পারেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের শিল্প খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে প্রযুক্তির সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে এর সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!