এয়ারবাস কেনাকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে দেখছে ফ্রান্স
বর্তমান বিএনপি সরকার ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব কীভাবে এগিয়ে নিতে চায়, এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিকে তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চান ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’ অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
.png)
সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও দরকষাকষি চলমান থাকায় এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিক্রি নিয়ে এখনো ‘চিন্তিত’ নন বলে জানান ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ‘আমি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ওপর জোর দিচ্ছি এবং এটি এমন একটি বার্তা, যা আমরা বর্তমান সরকারের কাছেও দিচ্ছি। কেননা, আমরা মনে করি এটি অত্যাবশ্যকীয়। আমি মনে করি, এটি বর্তমান সরকারের জন্য ভালো পরীক্ষা এবং এই সরকার ও বিমানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।’
এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনাকে ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘অবশ্যই ১০টি উড়োজাহাজ বড় কোনো চুক্তি নয়, কিন্তু এটি আমাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু। বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যাওয়ার জন্য আলোচনায় যুক্ত হতে বাংলাদেশ ইচ্ছুক—এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘আমরা অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। আপনি একটি চুক্তি করবেন এবং এরপর সরে পড়বেন—এমনটাতে আমরা বিশ্বাস করি না, এভাবে আমরা কাজও করি না। আমরা সত্যিকারের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়তে চাই, যেভাবে অনেক ফরাসি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব রয়েছে।’
ভবিষ্যতে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব আরও এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা এমন নয় যে শুধু এয়ারবাস বিক্রি করলাম, এরপর শেষ; এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়া।’
এয়ারবাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আলোচনা শুরুর প্রসঙ্গ তুলে ধরে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, মিশ্র বহরের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভালো ‘কারিগরি কারণে’ বিমান বাংলাদেশ এয়ারবাসকে বেছে নিয়েছিল, ‘রাজনৈতিক কারণে নয়’।
তিনি বলেন, বিশ্বের বহু বিমান সংস্থা এয়ারবাসকে গ্রহণ করেছে। বিমানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা চলার মধ্যে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, এয়ারবাসের প্রতিও বিমানের আগ্রহ বজায় রয়েছে এবং আলোচনা ও দরকষাকষি এখনো চলমান।
‘সুতরাং এতে সময় লাগতে পারে। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, দরকষাকষি এখনো ভালোভাবে চলছে এবং ভালো ফলও আসছে,’ বলেন তিনি।
আগামী বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শুরু হতে যাওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) দরকষাকষির সঙ্গেও এয়ারবাস কেনার বিষয়টিকে মিলিয়ে দেখেছেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত।
ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশের মধ্যে মাত্র সাতটির দূতাবাস রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এফটিএ রয়েছে। কিন্তু সেই মানচিত্রে বাংলাদেশ নেই বা যথেষ্ট পরিমাণে নেই।
‘সুতরাং আপনি যদি ওই মানচিত্রে আরও বেশি পরিসরে থাকতে চান, তাহলে আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতে হবে। সেই বিবেচনায় এয়ারবাস গুরুত্ব বহন করে,’ বলেন তিনি।
রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য, বিষয়টি কেবল ইউরোপকে একটি বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা নয়; বরং সহযোগী হিসেবে ইউরোপকে বেছে নেওয়ার বার্তা। ‘আমরা ইউরোপে যাচ্ছি, আমরা জানি আপনারা আমাদের শ্রদ্ধা করবেন, আমাদের আপনাদের সঙ্গে স্বার্থ আছে’—এমন একটি বার্তাই এর মাধ্যমে দেওয়া হয় বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স এবং ইউরোপ কখনো বলে না, “আমাদের” এবং “তাদের” মধ্যে একজনকে বেছে নাও। “তাদের” বলতে যারাই হোক না কেন। আমি শুরুতেই যেভাবে বলেছি, আমরা অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। অংশীদারত্ব মানে বাদ দেওয়া নয়, অন্তর্ভুক্তি।’
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘আপনি যদি না চান, আপনার যদি মনে হয় এফটিএ নিয়ে এগোনো ভালো কিছু হবে না, এটা আপনার সিদ্ধান্ত। হয়তো ইউরোপীয় দেশগুলোও সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে তারা এফটিএ চায় না—এটা তাদের সিদ্ধান্ত। সুতরাং ঢাকা ইউরোপকে কী বার্তা পাঠাচ্ছে, সেটি গুরুত্ব বহন করে।’
বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার হিসেবে ইউরোপের গুরুত্ব তুলে ধরে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় ১৭ শতাংশ, বিপরীতে ইউরোপে যায় ৪৮ শতাংশ। যুক্তরাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করলে এই হার আরও বেশি। ‘সুতরাং ইউরোপ হচ্ছে প্রধান অংশীদার,’ বলেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘যখন আমরা বাংলাদেশি বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করি, তখন কেবল একটি বিষয়ই স্মরণ করিয়ে দিই—আমাদের অভিন্ন স্বার্থ হচ্ছে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। কেননা, আপনার এমন একজন নির্ভরযোগ্য, প্রাসঙ্গিক ও আগ্রহী অংশীদার রয়েছে, যে আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়।’