হাইপারঅ্যাকটিভ শিশুকে সামলাবেন কীভাবে
প্রতিটি শ্রেণিকক্ষেই এমন একজন শিশুকে দেখা যায়, যে এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না। শিক্ষক পড়াচ্ছেন, কিন্তু সে কখনো পেন্সিল নিয়ে খেলছে, কখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কখনো হঠাৎ বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে। বাড়িতেও একই অবস্থা। পড়তে বসলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মন অন্যদিকে চলে যায়।
কথার মাঝখানে কথা বলে ফেলে, না ভেবেই কাজ করে বসে, কোনো কিছু শেষ করার আগেই আরেকটি কাজে হাত দেয়। চারপাশের মানুষ খুব দ্রুত তার পরিচয় ঠিক করে দেয়- "দুষ্ট ছেলে", "অবাধ্য মেয়ে", "শাসনের অভাব", "ইচ্ছা করেই এমন করে।"
কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখি, সেই শিশু সত্যিই কি ইচ্ছা করে এমন করছে?
.png)
- অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরটি 'না'। এমন অনেক শিশু ADHD (Attention-Deficit/Hyperactivity Disorder) বা মনোযোগের ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তার সমস্যার সঙ্গে বেড়ে ওঠে।
এটা কোনো বদঅভ্যাস নয়, আদরের ফল নয়, আবার কঠোর শাসনের অভাবও নয়। এটা একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা, যেখানে শিশুর মস্তিষ্ক তথ্য গ্রহণ, মনোযোগ ধরে রাখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং আচরণ পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নভাবে কাজ করে। তাই যে আচরণ আমরা বাইরে থেকে দেখি, তার পেছনে থাকে এক অদৃশ্য সংগ্রাম।
আমাদের সমাজে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে একটি কারণে। আমরা আচরণের বিচার করি, কিন্তু কারণের অনুসন্ধান করি না। একজন হাইপারঅ্যাকটিভ শিশু প্রতিদিন অসংখ্য নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে শুনতে বড় হয়।
"চুপ করে বসো", "তুমি কোনো দিন মানুষ হবে না", "সব সময় ঝামেলা করো", "অন্যদের মতো হতে পারো না?"- এই কথাগুলো শুধু তার কানে পৌঁছায় না, ধীরে ধীরে তার বিশ্বাসেও পরিণত হয়। একসময় সে নিজেই ভাবতে শুরু করে, তার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো বড় সমস্যা আছে।
শৈশবে এই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ একজন শিশু তখন আর নতুন কিছু শেখার সাহস পায় না। ভুল করার ভয় তাকে ঘিরে ধরে। সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে, অথবা আরও বেশি অস্থির হয়ে ওঠে। অনেক সময় যে শিশুকে আমরা 'দুষ্ট' বলে এড়িয়ে যাই, সে আসলে নীরবে সাহায্যের অপেক্ষায় থাকে।
মনে রাখতে হবে, হাইপারঅ্যাকটিভ মানেই কম মেধাবী নয়। বরং অনেক ADHD-সম্পন্ন শিশু অসাধারণ সৃজনশীল, কল্পনাপ্রবণ, উদ্ভাবনী এবং কৌতূহলী হয়। তাদের মধ্যে প্রশ্ন করার প্রবণতা বেশি থাকে, নতুন কিছু জানার আগ্রহও প্রবল থাকে।
ইতিহাসে এমন বহু সফল মানুষের কথা বলা হয়, যাদের মধ্যে ADHD-এর বৈশিষ্ট্য ছিল। অর্থাৎ সমস্যাটি সম্ভাবনাকে শেষ করে দেয় না; বরং সঠিক পরিবেশ না পেলে সেই সম্ভাবনা বিকশিত হতে পারে না।
তাহলে একজন হাইপারঅ্যাকটিভ শিশুকে সামলাবেন কীভাবে?
সবার আগে বদলাতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। শিশুকে সমস্যার উৎস হিসেবে নয়, সহায়তার প্রয়োজন আছে- এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। সে যখন কোনো ভুল করবে, তখন রাগারাগি বা অপমান না করে বুঝিয়ে বলুন।
সে যখন ছোট একটি কাজও ভালোভাবে সম্পন্ন করবে, তখন আন্তরিকভাবে প্রশংসা করুন। ইতিবাচক উৎসাহ একজন শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, আর অপমান সেটিকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়।
তার দৈনন্দিন জীবনে একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন। একই সময়ে ঘুম, খাওয়া, পড়াশোনা এবং খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দীর্ঘ সময় একটানা পড়তে বসিয়ে না রেখে অল্প সময়ের জন্য মনোযোগ ধরে রাখার সুযোগ দিন।
বড় কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে দিন। একবারে একটি নির্দেশ দিন এবং সে কাজটি শেষ করার জন্য তাকে পর্যাপ্ত সময় দিন।
শিশুকে সারাক্ষণ "চুপ করে বসে থাকো" বলার পরিবর্তে তাকে নড়াচড়ার সুযোগ দিন। নিয়মিত খেলাধুলা, হাঁটা, দৌড়ানো বা অন্য কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ড তার অতিরিক্ত শক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্লান্ত মস্তিষ্কের পক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিদ্যালয়ের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক যদি বুঝতে পারেন যে শিশু ইচ্ছাকৃতভাবে নয়, একটি স্নায়ুবিক বিকাশগত সমস্যার কারণে অস্থির, তাহলে তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যাবে। সবার সামনে অপমান করার বদলে আলাদা করে কথা বলা, ছোট ছোট দায়িত্ব দেওয়া, প্রয়োজনে পড়াশোনার পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনা- এসব উদ্যোগ শিশুর শেখার আগ্রহকে টিকিয়ে রাখতে পারে।
শ্রেণিকক্ষ তখনই সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে, যখন সেখানে শুধু মেধাবী নয়, ভিন্নভাবে শেখা শিশুরও সমান জায়গা থাকে।
অভিভাবকদেরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করবেন না। "দেখো, তোমার ভাই কত শান্ত", "পাশের বাসার মেয়েটা কত ভালো"- এ ধরনের তুলনা কোনো শিশুকে ভালো করে না। বরং সে নিজেকে আরও ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে। প্রতিটি শিশুর বেড়ে ওঠার গতি আলাদা, শেখার ধরনও আলাদা।
যদি অস্থিরতা, মনোযোগের ঘাটতি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে শিশুর পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক বা সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আচরণগত থেরাপি, অভিভাবক প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনে ওষুধ-;এসবের সমন্বয়ে অধিকাংশ শিশুই অনেক ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে।
আমরা প্রায়ই বলি, প্রত্যেক শিশুই বিশেষ। কিন্তু সেই কথাটি সত্যি প্রমাণ করার সময় আসে তখনই, যখন একজন ভিন্ন চাহিদাসম্পন্ন শিশুর পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ আমাদের সামনে আসে। একজন হাইপারঅ্যাকটিভ শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিখুঁত হয়ে ওঠা নয়; তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এমন কিছু মানুষ, যারা তার অস্থিরতার ভেতর লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে দেখতে পারবেন।
একজন শিশুকে বারবার বলা যায়, "তুমি সমস্যা।" আবার একই শিশুকে বলা যায়, "আমি তোমার পাশে আছি, আমরা একসঙ্গে শিখব।" এই দুটি বাক্যের পার্থক্যই তার পুরো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
লেখক : দীপু মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক ও সমাজ চিন্তক