রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের লোমহর্ষক কিছু ঘটনা
মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের ভয়াল চিত্র উঠে এসেছিলো জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশনের রিপোর্টে।
রিপোর্টটিতে রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রহীন সম্প্রদায় বলে বর্ণনা করে তাদের নাগরিকত্বের পথ সুগম করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছিলো ওই কমিশন।
মিয়ানমারের সেনাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর জাতিসংঘের কর্মকর্তারা একে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর জের ধরেই ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের ঢল শুরু হয় টেকনাফ সীমান্তে।
বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মুখে উঠে আসে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অত্যাচারের নির্মম চিত্র। রাখাইনে সাংবাদিক ও এনজিও কর্মীদের যাতায়াতে বিধি নিষেধ থাকায় ভয়াবহ নির্যাতনের কম অংশই উঠে এসেছে গণমাধ্যমে ।
রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্যাতনের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ হয়ে গেলে তীব্র শোরগোল তৈরি হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে। ভিডিওটিতে প্রথমেই দেখা যায়, রাস্তায় দু’জন কিশোরকে লাথি মারতে-মারতে এগিয়ে নিচ্ছেন একজন পুলিশ সদস্য। বহু পুরুষকে সারিবদ্ধভাবে মাটিতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এদের সবার হাত মাথার পেছন দিকে উঠানো । তারপর এক ব্যক্তিকে মাটিতে বসিয়ে ক্রমাগত লাথি মারছে তিনজন পুলিশ সদস্য। একই সাথে সে ব্যক্তিকে লাঠি দিয়েও পেটানো হচ্ছিল।
ভিডিওটি প্রকাশ হবার পর মিয়ানমারের কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আটক করা হয় এবং পরে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির অফিস থেকে জানানো হয় রোহিঙ্গা নির্যাতনে সে ঘটনাটির সঙ্গে চারজন পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত।
অং সান সু চির অফিস থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের আটক করা হয়েছে।
এছাড়া স্যাটেলাইটে তোলা ছবি বিশ্লেষণের করে নিশ্চিত করা হয় যে, রাখাইনে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ৪০টি গ্রামের ভবনসহ বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। এ নিয়ে ৩৫৪টি গ্রাম আংশিক বা পুরোপুরি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করে সংস্থাটি। পরের এক সপ্তাহের মধ্যে চারটি গ্রামে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। রোহিঙ্গাদের উপর বৃষ্টির মতো গুলি চালিয়েছিল মিয়ানমারের সেনারা। ২০১৭ সালের অগাস্ট মাসে সেনাবাহিনীর অভিযানে রাখাইন রাজ্যের গু দার পিন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্যাটেলাইটের চিত্র এবং রোহিঙ্গাদের ভাষ্য অনুযায়ী অন্তত পাঁচটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায় তখন। এসব গণকবরে ৪০০'র মতো মানুষকে চাপা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিলো তখন বার্তা সংস্থা এপি।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ জন বন্দী মুসলিম পুরুষকে হত্যাকাণ্ডের জন্য আলোচিত হয় ইনদিন নামের গ্রামটি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অল্প যে কয়টি নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করেছে এটি তার একটি। ইন দিন গ্রামের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই ছিলো মুসলিম, বাকিরা রাখাইন বৌদ্ধ। এখন, মুসলিমদের কোন চিহ্ন নেই। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ওই এলাকা ঘুরে এসে বিবিসির জনাথন হেড লিখেছিলেন , "যেখানে রোহিঙ্গারা থাকতো সেখানে গিয়ে দেখা গেলো যে, কোন গাছপালা নেই। তার পরিবর্তে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া আর বিশাল সীমান্ত রক্ষী পুলিশের ব্যারাক"। রাখাইনের বৌদ্ধ বাসিন্দারা বলছে যে, প্রতিবেশী হিসেবে মুসলিমদের আর কখনোই মেনে নেবে না তারা।
সূত্র: বিবিসি