ঢাকা,  বুধবার   ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ স্বাস্থ্যকথা ]

স্ক্যাবিস বা খোস-পাঁচড়ার প্রাদুর্ভাব : প্রতিরোধে করণীয়

ডাঃ অমৃত লাল হালদার
প্রকাশিত: ১০:১৩, ৭ অক্টোবর ২০২৬
স্ক্যাবিস বা খোস-পাঁচড়ার প্রাদুর্ভাব : প্রতিরোধে করণীয়
ব্যক্তিগত চিকিৎসায় এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। স্কুল, মাদ্রাসা ও আবাসিক হোস্টেলে স্ক্রিনিং, ফার্মেসিতে স্টেরয়েড মলমের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ এবং উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম জরুরি। সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে অল্প সময়ে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা

দেশে স্ক্যাবিস বা খোস-পাঁচড়ার প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ একাডেমি অব ডার্মাটোলজি এটিকে বর্তমানে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সিলেট, কুমিল্লা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ প্রায় সব জেলা থেকে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

স্ক্যাবিস Sarcoptes scabiei নামক অতি ক্ষুদ্র পরজীবী দ্বারা হয়। এই পরজীবী ত্বকের নিচে সুড়ঙ্গ করে ডিম পাড়ে। ফলে তীব্র প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়ায় চুলকানি হয়।

  • সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আবাসিক হোস্টেল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আক্রান্তের হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। সিলেট অঞ্চলে আড়াই মাসে ১৫ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সমন্বিত চিকিৎসা কর্মসূচি নিতে হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়।

কেন বাড়ছে?

১. ঘনবসতি ও সংস্পর্শ: একটি ঘরে একাধিক মানুষ, একই বিছানা, তোয়ালে ও পোশাক ভাগাভাগি করে ব্যবহারের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়।

২. ভুল ও অসম্পূর্ণ চিকিৎসা: স্টেরয়েড মিশ্রিত মলমের অবাধ ব্যবহার প্রধান কারণ। Betnovate, Dermovate জাতীয় মলম সাময়িক চুলকানি কমায় কিন্তু পরজীবী ধ্বংস করে না। ফলে রোগ চাপা পড়ে এবং বিস্তার লাভ করে।

৩. পারিবারিক চিকিৎসার অভাব: পরিবারে একজন চিকিৎসা নিলে বাকিরা নেন না। ফলে সুস্থ ব্যক্তি পুনরায় সংক্রমিত হন এবং সংক্রমণের চক্র চলতে থাকে।

৪. সচেতনতার ঘাটতি: অনেকে একে অ্যালার্জি মনে করে দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন।

লক্ষণ কি ?

প্রধান লক্ষণ হলো রাতে তীব্র চুলকানি বৃদ্ধি। আঙুলের ফাঁকে, কব্জিতে, বগলে, কোমরে, নাভির চারপাশে ও যৌনাঙ্গের আশেপাশে ছোট ছোট লাল দানা ও পানিযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে মাথা ও পায়ের তলাতেও হতে পারে। পরিবারে একাধিক সদস্যের একই স্থানে চুলকানি থাকলে স্ক্যাবিসের সম্ভাবনা বেশি।

অবহেলিত সংক্রমণ থেকে চামড়ায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, পুঁজযুক্ত ঘা এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনির প্রদাহের ঝুঁকি থাকে।

প্রতিরোধ ও করণীয় কি ?

ক. পরিবারের সকল সদস্যকে একই দিনে চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিতে হবে, লক্ষণ না থাকলেও।

খ. প্রমাণিত চিকিৎসা হলো ৫% পারমেথ্রিন ক্রিম, সঠিক নিয়মে গলা থেকে পা পর্যন্ত ব্যবহার। চিকিৎসকের পরামর্শে এক সপ্তাহ পর দ্বিতীয়বার প্রয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। বিকল্প হিসেবে বেনজাইল বেনজোয়েট লোশন ও বিশেষ ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার ওষুধ ব্যবহার করা হয়। সব ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে গ্রহণ করতে হবে।

গ. গত তিন দিনে ব্যবহৃত জামা-কাপড়, বিছানার চাদর, তোয়ালে ৬০ ডিগ্রির বেশি গরম পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে ইস্ত্রি করতে হবে। যা ধোয়া সম্ভব নয়, তা ৪ দিন পলিথিন ব্যাগে বেঁধে রাখলে পরজীবী মারা যায়।

ঘ. নখ ছোট রাখা, প্রতিদিন গোসল করা এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ভাগাভাগি না করা।

ঙ. ওষুধ প্রয়োগের পরও ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত চুলকানি থাকতে পারে, এটি স্বাভাবিক। বারবার ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। পুঁজ, জ্বর বা প্রস্রাব কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

ব্যক্তিগত চিকিৎসায় এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। স্কুল, মাদ্রাসা ও আবাসিক হোস্টেলে স্ক্রিনিং, ফার্মেসিতে স্টেরয়েড মলমের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ এবং উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম জরুরি। সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে অল্প সময়ে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

লেখক : ডাঃ অমৃত লাল হালদার 
নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক, বারডেম মহিলা ও শিশু হাসপাতাল, সেগুনবাগিচা, ঢাকা, ০১৬৩৬৬৯২২৯৮

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!