প্রবীণদের পরিচর্যা এবং ওষুধ ব্যবহারে সতর্কতা
আপনার পরিবারের প্রবীণ সদস্য কখনো আপনার বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদী, নানা-নানি অথবা অন্য সম্পর্কেরও হতে পারে। বাড়ির বয়স্ক ব্যক্তিরা যদি বুঝতে পারেন তারা পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এটি তাদের নিজেকে সুস্থ রাখার অন্যতম নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। একটি শিশুকে বড় করতে যতটা স্নেহ প্রয়োজন হয়, বৃদ্ধ বা বয়স্ক ব্যক্তিরাও ততটা স্নেহ আর মনযোগের দাবিদার।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মানসিক পরিবর্তন আসে। তাছাড়া জেনারেশন গ্যাপের কারণে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি না-ই মিলতে পারে। এজন্য বৃদ্ধরা যে কোনো সময় যে কোনো মন্তব্য করে ফেললে সে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ক্ষমাশীল হোন। তার অনেক আচরণ হয়তো আপনার পছন্দ হবে না, তবুও তার সঙ্গে রাগ করবেন না বা বাজে আচরণ করবেন না। কারণ এক সময় প্রবীণরাও শিশুর মতোই হয়ে যান।
আপনার পরিবারের প্রবীণ সদস্য কী খাচ্ছেন, প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছেন কি না কিংবা শরীরের ক্ষতি হয় এমন খাবার গ্রহণ করছেন কি না সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরে দানা বাঁধতে থাকে নানা ধরনের রোগবালাই। এসব রোগের সঙ্গে খাবার গ্রহণেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়ে যায়। এই সীমাবদ্ধতা মেনে তার পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন।
.png)
প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসব বিষয় মনে রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এ বয়সে অনেকেই একাকিত্ব, অসহায়ত্ব ও বিষণ্নতায় ভোগেন। শারীরিক নানা জটিলতার কারণে মনের ওপর এর প্রভাব পড়ে। তাই তাঁদের সমস্যাগুলো সহৃদয় দেখতে হবে।
একজন ব্যক্তি যখন বার্ধক্যে পা দেয়, তখন তার নিজের মধ্যেই কিছু বিষয় দানা বাঁধে। শারীরিকভাবে অসমর্থ, পরনির্ভরশীলতা, অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, অসহায়ত্ব- এগুলোর কারণে মানসিক যন্ত্রণা থেকে শুরু করে সে নিজেকে পরিবারের বা সমাজের বোঝা মনে করে। অনেক প্রবীণই এ সময় এমন শিশুসুলভ আচরণ করেন; যা হয়তো পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে।
বার্ধক্যে দেহ ও মনে আসে নানা পরিবর্তন, ভর করে জরাব্যাধি। যেমন:
দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা কমে আসে।
বেশির ভাগ বয়স্ক ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের ঘাটতি ও স্মৃতিভ্রমের জন্য এ রোগগুলো অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।
পুরুষদের প্রোস্টেটগ্রন্থি বড় হয়ে প্রস্রাব আটকে রাখতে না পারা, ফোঁটায় ফোঁটায় প্রসাব হওয়া, ঘন ঘন প্রসাব লাগা প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়।
নারীদের মেনোপজ–পরবর্তী নানা জটিলতা দেখা দেয়।
বয়সের সঙ্গে হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপরোসিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিসসহ হাড় ও অস্থিসন্ধির নানা জটিলতা দেখা দেয়। মাথা ঘোরানো, হাত–পা কাঁপা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, ঘুম কমে যাওয়া, আলঝেইমারস বা ডিমনেশিয়া প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে।
দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
প্রবীণদের জন্য কিছু সাধারণ পরামর্শ
স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করুন ও নিয়মিত শরীরচর্চা করুন। সচল ও কর্মক্ষম থাকতে চেষ্টা করুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ খাবেন না।
নির্দিষ্ট সময় পরপর চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো করান।
স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলুন। কোনো অবস্থাতেই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকবেন না।
হাসিখুশি থাকুন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার চেষ্টা করুন।
পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য পরামর্শ- ঘরের প্রবীণ ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সময় দিন।
তাঁদের কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যাকে অবহেলা করবেন না।
নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নিয়ম মেনে খাদ্য ও ওষুধ দিন।
যাঁরা স্মৃতিভ্রমে ভুগছেন, তাঁদের ওষুধপত্র খাওয়া বা ইনসুলিন ব্যবহার করায় অন্যের সাহায্য দরকার। সে অনুযায়ী তাঁদের সাহায্য করুন।
পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিন।
বয়স্কদের একাধিক ওষুধ সেবনে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
- বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বাতসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ দেখা দিতে পারে।
- ফলে অনেক বয়স্ক মানুষকে একসঙ্গে একাধিক ওষুধ সেবন করতে হয়। তবে একাধিক ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ওষুধ ব্যবহারে কিছু বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি।
কেন বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে কিছু ওষুধ শরীর থেকে ধীরে বের হয়। ফলে শরীরে ওষুধ জমে গিয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া শরীরে পানি ও চর্বির পরিমাণের পরিবর্তনও কিছু ওষুধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। স্মৃতিশক্তি বা দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে ওষুধের সময় ও মাত্রা ভুল হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
যেসব ভুল এড়ানো জরুরি
নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করবেন না। উপসর্গ কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা বা মাত্রা কমানো ঠিক নয়। এতে রোগ আবার বেড়ে যেতে পারে।
অন্যের ওষুধ নিজে থেকে খাবেন না। একই ধরনের উপসর্গ থাকলেও সবার জন্য একই ওষুধ নিরাপদ নয়। ব্যক্তির রোগ, বয়স ও অন্যান্য ওষুধের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।
নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট বা ভেষজ ওষুধ শুরু করবেন না। কিছু ভেষজ পণ্য বা খাদ্য সম্পূরক চলমান ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।
ইচ্ছামতো ওষুধের মাত্রা বাড়াবেন না। ব্যথা বা অন্য কোনো উপসর্গ বেড়ে গেলে নিজের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
ওষুধ নিরাপদে খাওয়ার উপায়
প্রথমে সব ওষুধের একটি তালিকা তৈরি করুন। তালিকায় ওষুধের নাম, মাত্রা, কখন খেতে হবে এবং কেন খেতে হবে—এসব লিখে রাখুন। প্রেসক্রিপশনের ওষুধের পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা ওষুধ, ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্টের নামও এতে রাখুন।
প্রতিবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় এই তালিকা সঙ্গে নিন। এতে চিকিৎসক একই ধরনের একাধিক ওষুধ বা সম্ভাব্য পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া শনাক্ত করতে পারবেন।
ওষুধ খাওয়ার সময় মনে রাখার জন্য ফোনে অ্যালার্ম, ক্যালেন্ডার বা ওষুধ রাখার বিশেষ বক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যরাও প্রয়োজনে ওষুধ সাজিয়ে দিতে পারেন।
ওষুধ খাবারের আগে, খাবারের সঙ্গে নাকি পরে—চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের নির্দেশনা মেনে চলুন। একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খাওয়ার আগে সেগুলো একসঙ্গে খাওয়া নিরাপদ কি না, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নিন।
কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান প্রয়োজন হতে পারে। তাই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের সময় পরিবর্তন না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
ট্যাবলেট ভাঙা, গুঁড়ো করা বা ক্যাপসুল খুলে খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে ওষুধ ছাড়ে এমন ট্যাবলেট ভাঙা বা গুঁড়ো করা বিপজ্জনক হতে পারে।
সাধারণত ওষুধ পর্যাপ্ত পানি দিয়ে খাওয়া উচিত, যদি চিকিৎসক অন্য কোনো নির্দেশনা না দেন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে কী করবেন?
ওষুধ খাওয়ার পর অস্বাভাবিক মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, ত্বকে ফুসকুড়ি, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসককে জানান। গুরুতর উপসর্গ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
এ ছাড়া নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে চিকিৎসক কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বয়স্ক ব্যক্তিরা যত বেশি ওষুধ সেবন করবেন, তত বেশি সতর্কভাবে ওষুধের তালিকা, মাত্রা ও সময় মেনে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ শুরু, বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
লেখক : পুষ্টিবিদ লিনা আকতার
রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর